ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তির পর ডিজেল রপ্তানি শুরু রাশিয়ার, বিশ্ববাজারে কতটা প্রভাব পড়বে?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সমঝোতার পর আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও ডিজেল রপ্তানি শুরু করেছে রাশিয়া। মস্কোর দাবি, রুশ ডিজেল তেলের বৈশ্বিক বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। তবে শুধু এই সরবরাহ দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে না বলেও স্বীকার করেছে ক্রেমলিন।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়ার ডিজেল এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে শুরু করেছে। তার মতে, এই সরবরাহ তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সহায়ক হবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়ার এই পদক্ষেপ এসেছে ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক সমঝোতার পর। গত সপ্তাহে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, জ্বালানির দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাশিয়া বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। এরপর ১০ অক্টোবর থেকে মস্কো ডিজেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করে।
রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি ফের শুরু হওয়ার বাস্তব প্রমাণও মিলেছে। লন্ডনভিত্তিক পণ্যবাজার ও জ্বালানি তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলএসইজির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাশিয়া বাল্টিক সাগরের প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে ডিজেল রপ্তানি লোডিং আবার শুরু করেছে।
শিপিং তথ্য বলছে, ১৩ অক্টোবর একটি ট্যাংকারে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন অতি-নিম্ন সালফারযুক্ত ডিজেল তোলা হয়েছে। জাহাজটি এরপর মরক্কোর উদ্দেশে রওনা হয়েছে। অর্থাৎ ট্রাম্পের সঙ্গে সমঝোতার পর রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ যে শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই, বাস্তবে তা আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করছে।
তবে রাশিয়ার এই অতিরিক্ত সরবরাহের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। ট্রাম্প শুক্রবার জানিয়েছিলেন, রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারের জন্য তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং তার পরপরই আরও ১০ লাখ টন সরবরাহের কথা বলেন তিনি।

সংখ্যাগুলো বড় মনে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ব্যবহারের তুলনায় এগুলো খুব বেশি নয়। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন খাতেই প্রতিদিন প্রায় ২৯ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। সেই হিসাবে ট্রাম্প ঘোষিত প্রথম ধাপের তিন লাখ টন (২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল) সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন খাতের এক দিনের চাহিদাও পূরণ করতে সক্ষম না। নভেম্বরে অতিরিক্ত পাঁচ লাখ টন ও পরবর্তী ১০ লাখ টন মিলিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন খাতের চার দিনের চাহিদার চেয়ে কম।
অর্থাৎ রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি পুনরায় চালু হওয়া বাজারে মনস্তাত্ত্বিক ও সরবরাহগত প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু একে একাই জ্বালানির দাম বড় মাত্রায় কমিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ হিসেবে দেখা কঠিন।
ট্রাম্পের জন্য ডিজেলের দাম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
রাশিয়ার সঙ্গে এই সমঝোতার পেছনে ট্রাম্পের একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে— যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানো।
আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি ও বিশেষ করে ডিজেলের দাম কম রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেল শুধু গাড়ি বা ট্রাকে ব্যবহৃত হয় না; কৃষি, পণ্য পরিবহন, নির্মাণ, শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে ডিজেলের দাম বেড়ে গেলে শুধু গাড়ি চালানোর খরচ বাড়ে না, পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে ভোক্তা পর্যায়ের বিভিন্ন পণ্যের দামেও।
এই বাস্তবতায় ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর থাকা বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও জ্বালানি বাণিজ্যসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করে বাজারে রুশ সরবরাহ বাড়াতে আগ্রহী হয়েছেন।
কিন্তু এই নীতির কারণে ট্রাম্প ইউক্রেন, ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের এবং এমনকি নিজ দলের কিছু রিপাবলিকান রাজনীতিকের সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
ইউক্রেনে ক্ষোভ
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার সঙ্গে এই ডিজেল চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। কিয়েভের দৃষ্টিতে, রাশিয়ার জ্বালানি খাত থেকে অর্থ ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে দেওয়া মানে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কোর যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতাকে পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করা।
এই বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে কারণ একই সময়ে ট্রাম্প ইউক্রেনকে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। ইউক্রেন গত কয়েক মাস ধরে দীর্ঘপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে। কিয়েভের যুক্তি, রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালালে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত চালানোই তাদের অন্যতম প্রধান প্রতিরোধ কৌশল।
ফলে একদিকে ওয়াশিংটন রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বাড়িয়ে জ্বালানির দাম কমাতে চাইছে, অন্যদিকে কিয়েভ রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে মস্কোর যুদ্ধ অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে চাইছে। দুই নীতির মধ্যে সংঘাত এখন প্রকাশ্য।
ইউরোপের সমালোচনা, মস্কোর পালটা যুক্তি
ইউরোপীয় কর্মকর্তারাও রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের ডিজেল সমঝোতার সমালোচনা করেছেন। তাদের যুক্তি, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সুবিধা দেওয়া ইউরোপের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মস্কো অবশ্য এই সমালোচনাকে ‘কপট’ বা ‘সিনিক্যাল’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্রেমলিনের যুক্তি, ইউরোপ নিজেও এখনো কিছু রুশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনছে। তাই রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিয়ে ইউরোপের আপত্তিকে তারা দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছে।
এখানে মূল বিষয়টি হলো— রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হচ্ছে না, বরং নির্দিষ্ট কিছু জ্বালানি সরবরাহকে বাজারে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মূল্য কমানোর লক্ষ্য এবং রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার পশ্চিমা নীতির মধ্যে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার জন্যও বড় সুযোগ
মস্কোর দিক থেকেও এই চুক্তির গুরুত্ব কম নয়। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রুশ জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও ডিজেল সরবরাহ বাড়াতে পারলে রাশিয়া একদিকে অতিরিক্ত জ্বালানি বিক্রির সুযোগ পাবে, অন্যদিকে তার তেল পরিশোধন ও রপ্তানি অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক আয় ধরে রাখতে পারবে।
তবে বাজারে এর প্রভাব নির্ভর করবে শুধু রাশিয়া কত ডিজেল রপ্তানি করছে তার ওপর নয়। বৈশ্বিক তেলের দাম, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, পরিবহন ব্যয়, নিষেধাজ্ঞা, শোধনাগারের উৎপাদন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাহিদা— সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করবে।
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন অবশ্য অন্য জায়গায়। ট্রাম্পের জ্বালানি মূল্য কমানোর উদ্যোগ যদি রাশিয়াকে আবার বড় আকারে জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ করে দেয়, তাহলে সেটি ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিকে আরও বিতর্কিত করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে যখন ট্রাম্প ইউক্রেনকে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন এবং একই সময়ে রাশিয়া বিশ্ববাজারে ডিজেল বিক্রি বাড়াচ্ছে, তখন কিয়েভে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করার জন্য রাশিয়ার ওপর চাপ কমানো হলে, সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত কার কাজে লাগছে— যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তার, নাকি যুদ্ধরত রাশিয়ার?
এই দ্বন্দ্বই সামনে দিনগুলোতে ট্রাম্পের রাশিয়া-ইউক্রেন নীতির অন্যতম বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।






















-478c5b-256x144.webp)