পুলিশের গ্রেনেডে হাত উড়ে গেল কিশোরের, ফ্রান্সে আরও উত্তাল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ফ্রান্সে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রান্সে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সে স্কুলের বেহাল দশা, শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত ক্লাস ও শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ তৃতীয় সপ্তাহে গড়াতেই ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় শহর লঁসে পুলিশের একটি স্টান গ্রেনেড হাতে তুলে নেওয়ার পর বিস্ফোরণে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর হাত উড়ে গেছে। ঘটনাটি তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ। এর মাত্র কয়েক দিন আগে আরেক ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটের মতো আঘাতে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল।

লঁসের ঘটনা ঘটে স্থানীয় সময় সোমবার (৫ অক্টোবর) সকালে অগুস্ত বেহাল উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে।

স্থানীয় প্রিফেক্ট ফ্রাঁসোয়া-জাভিয়ের লশ জানান, ১৫ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছে। আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম লা ভোয়া দ্যু নোর জানিয়েছে, বিক্ষোভের সময় পুলিশের ব্যবহৃত একটি গ্রেনেড সে তুলে নেওয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হয়।

লা প্যারিসিয়াঁর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পুলিশের ছোড়া একটি গ্রেনেড সে হাতে তুলে নিয়েছিল এবং সেটিই বিস্ফোরিত হয়ে তার বাঁ হাত বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তাকে জরুরি ভিত্তিতে লিলের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ফ্রান্স জুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আরও বড় আকার নিচ্ছে। সোমবার দেশটির প্রায় তিন হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০০ থেকে ৫০০টি পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ ছিল।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সোমবার সকাল পর্যন্ত ৪১৩টি বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ বা অবরোধের প্রভাব ছিল, শুক্রবার একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫৬৪। ২৪টি বিদ্যালয়ে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে এবং ৭৮ জন শিক্ষা কর্মকর্তা ও কর্মী আহত হয়েছেন।

ক্ষোভের কেন্দ্রে শিক্ষা ব্যবস্থা

বিক্ষোভের সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি স্কুলে শিক্ষক সংকট নিয়ে। পরে তা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে তাদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষক দেওয়া হয় না। ফলে বিশেষ করে পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বছরেও শিক্ষার্থীদের কয়েক মাস পর্যন্ত ক্লাস হারাতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে রয়েছে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, দীর্ঘ স্কুল সময়, জরাজীর্ণ ভবন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য। বিক্ষোভকারীরা এমন স্কুলের কথা বলেছে যেখানে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে, ছাদ ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, গরমের সময় অসহনীয় তাপ থাকে, এমনকি তেলাপোকার উপদ্রবও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ব্যবহৃত পারকোর্সাপ ব্যবস্থাকেও অনেক শিক্ষার্থী বৈষম্য ও অতিরিক্ত চাপ তৈরির জন্য দায়ী করছে।

বামপন্থি সিজিটি ইউনিয়নের প্রধান সোফি বেনে বলেছেন, গত এক দশকে অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ার ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার মতে, কয়েকটি প্রতীকী পদক্ষেপ দিয়ে এই ক্ষোভ থামানো যাবে না, বরং শিক্ষা খাতে বাজেট কাটছাঁট বন্ধ করতে হবে।

সরকারের অবস্থানও বদলেছে

শুরুতে শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও সরকার এখন একসঙ্গে দুই ধরনের বার্তা দিচ্ছে— দাবিগুলো বৈধ, কিন্তু সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নো শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে ‘বৈধ’ বলে স্বীকার করে মন্ত্রীদের পাঁচটি বিষয়ে দ্রুত কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা, স্কুলের দীর্ঘ সময়ের পাঠসূচি পর্যালোচনা এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন মেরামত। চলতি মাসের শেষের মধ্যে এসব বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব চেয়েছেন তিনি।

কিন্তু একই সময়ে সরকার আন্দোলনের সহিংস অংশ নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারি মুখপাত্র মদ ব্রেজোঁ বলেছেন, সরকারের অগ্রাধিকার এখন ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা’। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, বিক্ষোভের মধ্যে বাইরের লোকজন ঢুকে সহিংসতা ও ভাঙচুর করছে। মন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অভিযোগ করেছেন, বিশেষ করে বামপন্থি কর্মীরা আন্দোলনে ঢুকে সেটিকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ৫ হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে, যাদের প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এ ছাড়া পুলিশ সদস্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন

তবে আন্দোলনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক এখন পুলিশের ভূমিকা। লঁসে ১৫ বছরের শিক্ষার্থীর হাত হারানোর ঘটনা সেই বিতর্ক আরও তীব্র করেছে।

এর আগে তুর শহরে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর ডান চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। তার পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, ওই কিশোরের আঘাত পুলিশের ব্যবহৃত এলবিডি বা রাবার বুলেটের আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঘটনাটি তদন্তাধীন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও পুলিশের শক্তি প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফ্রান্সের লিগ অব হিউম্যান রাইটস বলেছে, বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপে আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে পাঁচটি তদন্তও চলছে বলে এএফপি জানিয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশ ও সরকার বলছে, সব বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণ নয়। কিছু জায়গায় পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি নিক্ষেপ, ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া এবং স্কুলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার স্ট্রাসবুর্গে টিয়ার গ্যাস, মার্সেইয়ে পুলিশের দিকে আতশবাজি এবং রেনে শহরে জ্বলন্ত আবর্জনার স্তূপের মতো ঘটনা পরিস্থিতির অবনতি দেখিয়েছে।

মঙ্গলবার কী হতে যাচ্ছে?

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা মঙ্গলবার। শিক্ষার্থী ইউনিয়নগুলো দেশ জুড়ে জাতীয় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তাদের সঙ্গে শিক্ষক, সরকারি কর্মী, ট্রেড ইউনিয়ন ও অভিভাবকদেরও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয় ভবনও সোমবার অবরোধের মুখে ছিল। উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মঙ্গলবারের কর্মসূচির পর বিক্ষোভ আরও তীব্র হতে পারে।

সিজিটি নেতা সোফি বেনে বলেছেন, ইউনিয়নের কর্মীরা মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবেন এবং বিক্ষোভের আশপাশে সহিংসতা ঠেকানোর চেষ্টা করবেন। একই সঙ্গে তিনি পুলিশের ‘অভূতপূর্ব দমন-পীড়নের’ সমালোচনা করেছেন।

ফলে মঙ্গলবারের আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষার্থীদের স্কুলসংক্রান্ত দাবির কর্মসূচি নয়। এটি ফ্রান্সের সরকারের জন্য শিক্ষা বাজেট, সামাজিক বৈষম্য, পুলিশি শক্তি প্রয়োগ এবং তরুণদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক— সবকিছুর পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— সরকার যে পাঁচটি বিষয়ে পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়। কারণ লঁসে ১৫ বছরের এক শিক্ষার্থীর হাত হারানোর ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, আন্দোলন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি আর আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন— দুটিকে আলাদা করে দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement