নরওয়েজিয়ান সাগরে ডুবল ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্ন, হাল্যান্ডরা প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে

ক্রীড়া ডেস্ক
আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫: ৫৯
ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করে সতীর্থদের সঙ্গে আর্লিং হাল্যান্ডের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

যাকে নিয়ে ভয় ছিল সেই আর্লিং হাল্যান্ডই কফিনে শেষ পেরেক ঠুকলেন। তবে তার আগেই ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নিল্যান্ড। একটি পেনাল্টি ঠেকালেন, সেই সঙ্গে অবিশ্বাস্য কয়েকটি সেভ। আর ম্যাচের শেষ ১১ মিনিটে হাল্যান্ডের জোড়া গোল।

তাতেই বাজিমাত। পাঁচ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে নরওয়ে হারিয়ে দিলো ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালেও পৌঁছে গেলে হাল্যান্ড-ওডেগার্ডদের দল। অন্যদিকে ২-০ গোলে হেরে নরওয়েজিয়ান সাগরে সলিল সমাধিক ঘটল ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের। এ নিয়ে গত ছয় ছয়টি বিশ্বকাপের কোনোটিতেই কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পেরোতে পারল না ব্রাজিল।

বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত রাত ২টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল। লুকাস পাকেতা ইনজুরিতে পড়ায় তার জায়গায় গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে নামিয়ে জাপান ম্যাচের বাকি একাদশ অপরিবর্তিত রাখেন কার্লো আনচেলত্তি।

তবে ম্যাচের শুরুটা খুব ভালো করতে পারেনি ব্রাজিল। ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্সের দুর্বলতায় ৪ মিনিটের মাথায়ই বল জালে জড়িয়েছিল নরওয়ে। পরে অবশ্য গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায়। তবে ছন্দ ধরে রেখে খেলতে থাকে নরওয়ে। ব্রাজিল পালটা চেষ্টা চালালেও খুব গোছানো ছিল না তাদের খেলা।

ম্যাচের ধারার বিপরীতে অবশ্য ১১ মিনিটেই পেনাল্টি পেয়ে যায় ব্রাজিল। বক্সের ভেতর ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে যান মাতেউস কুনিয়া। স্লাইডিং ট্যাকলে তাকে থামিয়ে দেন ক্রিস্টোফার আয়ের, কুনিয়া মাটিতে পড়ে যান। রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে পেনাল্টির আবেদন তুললেও রেফারি নাকচ করে দেন। পরে ভিএআর যাচাইয়ের পর মনিটর দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।

পেনাল্টি পেয়েও অবশ্য লাভ হয়নি ব্রাজিলের। পেনাল্টিতে ম্যাচের ১৫ মিনিটের মধ্যেই যখন লিড নেওয়ার সুবাস বইছিল, তখনই সেই সুযোগ নষ্ট করলেন ব্রুনো গিমারাইস। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো তারকাকে রেখে তাদে পেনাল্টি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার শটটি দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন নরওয়েজিয়ান গোলরক্ষক নিল্যান্ড।

গত ৪০ বছরে গিমারাইসই প্রথম ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপের আসরে টাইব্রেকার বাদে গেমপ্লেতে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে জিকো ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেছিলেন।

পেনাল্টি থেকে বেঁচে গিয়ে লাইফলাইন পাওয়া নরওয়ে এরপর বলের দখল নিয়ে পুরো মাঝ মাঠ দাপিয়ে বেড়ায়। ব্রাজিলের ডি-বক্সের আশপাশে গিয়ে অবশ্য সুস্পষ্ট আক্রমণ করতে পারছিল না দলটি। তবে ব্রাজিলিয়ানদের যতটাসম্ভব বলের দখল থেকে দূরে রাখার কাজটি সফলভাবেই করে যাচ্ছিল। ব্রাজিলকেও মাঝ মাঠের দখল হারিয়ে নিজেদের অর্ধে নরওয়ের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার কৌশল নিতে বাধ্য হতে হয়।

এ কৌশলে ম্যাচের ৪০ মিনিটে গোলের বেশ কাছে চলে যায় ব্রাজিল। ডি-বক্সের মধ্যে ওডেগার্ড বল হারান ভিনিসিয়ুসের কাছে। ভিনি নিয়েছিলেন দারুণ এক শট। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন গোলরক্ষক নিল্যান্ড। পা দিয়ে ঠেকিয়ে দেন বল। গোল পাওয়া হয়নি ব্রাজিলের।

প্রথমার্ধের একদম শেষ দিকে আবার নরওয়ে লিড নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। বক্সের ঠিক বাইরে গ্যাব্রিয়েলকে পরাস্ত করে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন হাল্যান্ড। তার পা থেকে ছুটে গেলে বল পেয়ে যান ডি-বক্সের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মার্টিন ওডেগার্ড। নিচের কর্নার লক্ষ্য করে জোরালো শট নিলেও দারুণ ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তা ঠেকিয়ে দেন আলিসন। শেষ পর্যন্ত প্রথমার্ধ ০-০ গোলের সমতায় শেষ হয়।

বিরতির পর ৫৮ মিনিটের মাথায় মাতেউস কুনিয়ার বদলে মাঠে নামেন এন্ড্রিক। নেমেই দারুণ সুযোগ পেয়ে যান। ৬০ মিনিটের মাথায় ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের অসাধারণ পাস খুঁজে নেয় তাকে। কিন্তু গোলরক্ষককে এক পেয়েও বল জালে জড়াতে ব্যর্থ হন এন্ড্রিক।

দুই মিনিট পরেই আবারও সুযোগ। বেশ ভালো একটি কর্নার গোলরক্ষক নিল্যান্ড প্রথমে পাঞ্চ করে ক্লিয়ার করেন। প্রায় ২০ গজ দূরে বল পেয়ে আবার শট নেন রায়ান। এবারও দারুণভাবে বল বিপদমুক্ত করেন নিল্যান্ড।

দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেকের পর মার্টিনেলির জায়গায় নেইমারকে নামান আনচেলত্তি। তাতে ব্রাজিল মাঝ মাঠে শক্তি পায়। তবে নরওয়ে চেষ্টা করছিল আগের মতোই মাঝ মাঠ দখলে রেখে গোছানো আক্রমণের জন্য।

৭৯ মিনিটে এসে যায় সেই সুবর্ণ সুযোগ। শেলডেরাপ ডি-বক্সের বাঁ পাশে সামান্য বাইরে থেকে দারুণ এক ক্রস তোলেন। বক্সে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন হাল্যান্ড, যেন ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই। তার দুর্দান্ত হেড আলিসনকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়িয়ে গেলে উল্লাসে মেতে ওঠে নরওয়ে।

গোল পাওয়ার পর নরওয়ে ব্রাজিলকে যেন আর কোনো সুযোগ দিতে চাইছিল না। নিজেরাই বল দখলে রেখে খেলা এগিয়ে নিচ্ছি। এর মধ্যেই ৮৬ মিনিটে এক অদ্ভূত গোল পেয়ে যাচ্ছিল ব্রাজিল। ক্যাসেমিরোর অনেকটা চিপের মতো শটটি ধেয়ে যাচ্ছিল গোলবারের একদম ওপরের কোনার দিকে। নিল্যান্ড কিছুটা এগিয়ে থাকায় মনে হচ্ছিল গোলটা পেয়েই যাবে ব্রাজিল। কিন্তু দারুণ দক্ষতায় শরীরকে বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে নিল্যান্ড হাতের স্পর্শে বল ক্লিয়ার করলে লিড নেওয়া হয়নি ব্রাজিলের।

এর মধ্যে ৯০ মিনিটে আবার শেলডেরাপ-হাল্যান্ড জুটির ম্যাজিক। বাঁ দিকে ডি-বক্সের কিছুটা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাল্যান্ড। সাধারণত এমন জায়গা থেকে শট নেন না তিনি। কিন্তু এবারে বল পেয়েই ডান পায়ে জোরালো শট নেন। আলিসনকে ফাঁকি দিয়ে সেটি জড়িয়ে যায় জালে, ২-০ গোলে এগিয়ে যায় নরওয়ে। এই গোলের মাধ্যমে হাল্যান্ডের এই বিশ্বকাপে গোল হলো সাতটি, যার মাধ্যমে তিনি লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের সমান গোল নিয়ে শীর্ষে উঠে গেলেন।

৯০ মিনিটের খেলা শেষে ৭ মিনিট ইনজুরি টাইম দিয়েছিলেন রেফারি। যোগ করা এই সময়ে দুই দলের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে, শারীরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনাও দেখা দেয়। ৭ মিনিট পেরিয়ে গেলেও রেফারি খেলা চালিয়ে যান। যোগ করা সময়ের ৯ মিনিটের মাথায় নরওয়ের ডি-বক্সে লিও ওস্তিগার্ডের কনুইয়ের ধাক্কা খান ক্যাসেমিরো। পেনাল্টি দেন রেফারি। তা থেকে গোল করে ব্যবধান কমান নেইমার।

আরও মিনিট দুয়েক খেলা হলেও আর কোনো গোল পায়নি কোনো পক্ষই। ফলে ২-১ গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে নরওয়ে। পরে অবশ্য আগের মতোই আবার ‘ভাইকিং রো’তে মেঠে ওঠে তারা। আগের দুদিন ওডেগার্ড নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভাইকিংসদের অদৃশ্য লংশিপ চালনায়, এ দিন নেতৃত্ব দিলেন হাল্যান্ড।

শেষ পর্যন্ত হেক্সার স্বপ্ন নিয়ে এসে খালি হাতে ফিরতে হলো ব্রাজিলকে। ১৯৯০ সালের পর গত ৩৬ বছরে এই প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বাদ পড়তে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচেও তারা নানা দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। যেমন— গোটা ম্যাচে নরওয়েজিয়ানদের দখলে বল ছিল ৬৬ শতাংশ সময়, ব্রাজিলের মাত্র ৩৪ শতাংশ। এদিকে গোলমুখে ব্রাজিল ১২ শট নিলেও নরওয়ে নিয়েছিল ৯টি, তবে ব্রাজিলের লক্ষ্যে শট ছিল যেখানে ৪টি, নরওয়ের ছিল ৫টি।

পাসের সংখ্যা ও অ্যাকুরেসিতেও এগিয়ে ছিল নরওয়ে। তাদের ৬৫৩ পাসের বিপরীতে ব্রাজিলের পাস ছিল ৩১৩টি। আবার নরওয়ের পাস অ্যাকুরেসি ছিল ৯১ শতাংশ, যেখানের ব্রাজিলের ছিল ৮৮ শতাংশ। ফাউলও বেশি করেছে ব্রাজিলই, নরওয়ের ৪টির বিপরীতে তাদের ফাউল ৭টি।

সব মিলিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সুযোগ তৈরি হলেও মাঠের খেলায় ব্রাজিলকে রীতিমতো নাস্তানাবুদ করেছে নরওয়ে। বিস্মরণযোগ্য একটি ম্যাচের স্মৃতি নিয়েই ব্রাজিলের হেক্সার অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হলো আরও চার বছরের জন্য। সব মিলিয়ে টানা ছয়টি বিশ্বকাপ শিরোপাবঞ্চিত থাকতে হলো তাদের।

অন্যদিকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেই চমক দেখাল নরওয়ে। প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবে তারা। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ কে হবে, জানতে হলে তাকিয়ে থাকতে হবে ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচের দিকে।

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

টেস্টের ব্যর্থতা ভুলে ওয়ানডে সিরিজে ভালো করতে চায় বাংলাদেশ

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে জিম্বাবুয়ে সফরে স্পটভাবেই ফেভারিট ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু জিম্বাবুয়ের সফরের শুরুতেই হোঁচট খায় টাইগাররা। সিরিজের একমাত্র টেস্টে ইনিংস ও ৮৫ রানের বড় ব্যবধানে হেরে বড়সড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ।

১৮ ঘণ্টা আগে

ইউএস-বাংলাকে হারিয়ে এয়ারলাইন্স ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন বিমান বাংলাদেশ

ঢাকার গুলশান ইয়ুথ ক্লাব মাঠে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এই টুর্নামেন্টে দেশি-বিদেশি ১৬টি এয়ারলাইন্স অংশ নেয়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে কাতার এয়ারওয়েজকে ১-০ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় এয়ার ইন্ডিয়া। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জাহাঙ্গীর আলম।

২০ ঘণ্টা আগে

হালান্ডকে ঠেকানোর ছকে ব্যস্ত ব্রাজিল, লক্ষ্য কোয়ার্টার ফাইনাল

আনচেলত্তির ভাষায়, ‘হালান্ডকে সবাই চেনে। আমার ডিফেন্ডারদের তাকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তারা আমার চেয়েও ভালো জানে সে কীভাবে খেলে। তবে তার শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সে অত্যন্ত বিপজ্জনক একজন ফরোয়ার্ড।’

১ দিন আগে

এমবাপ্পের পেনাল্টিতে ভাঙল প্যারাগুয়ের প্রাচীর, উত্তাপের ম্যাচ জিতল ফ্রান্স

শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের পেনাল্টিতে খুলেছে গোলের মুখ। ১-০ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে ফ্রান্স। উঠে গেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। এমবাপ্পেও গোল্ডের বুটের লড়াইয়ে ফের উঠে এসেছেন মেসির কাতারে। আর জার্মানিকে হারিয়ে চমক দেখানো প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপযাত্রা থেমেছে শেষ ষোলোতেই।

১ দিন আগে