কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্যার গ্যারি সোবার্স আর নেই

ক্রীড়া ডেস্ক
আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১: ৫৭
১৯৬৬ সালের ২০ জুন লর্ডস টেস্টে অপরাজিত ১৬৩ রানের ইনিংস খেলার পথে পুল করছেন স্যার গ্যারি সোবার্স। ছবি: পিএ ফটো

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার ও ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার স্যার গারফিল্ড ‘গ্যারি’ সোবার্স মারা গেছেন। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং— তিন বিভাগেই অসামান্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন তিনি। ক্রিকেটপ্রেমী অনেকের কাছেই তিনি ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার ও সবচেয়ে প্রতিভাবান ক্রিকেটার।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) বার্বাডোজের নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্যার গ্যারি সোবার্স। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

গ্যারি সোবার্স টেস্ট ক্রিকেটে ছিলেন দুর্দান্ত ব্যাটার, বোলিংয়েও ছিলেন সমান দক্ষ। বাঁহাতি পেস, অর্থোডক্স স্পিন ও রিস্ট স্পিন— তিন ধরনের বোলিংয়েই পারদর্শী ছিলেন তিনি। পাশাপাশি ছিলেন অসাধারণ ফিল্ডার ও ক্লোজ-ইন ক্যাচার। তার এই বহুমাত্রিক দক্ষতার কারণেই অস্ট্রেলিয়ার আরেক কিংবদন্তি স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান তাকে বলেছিলেন, ‘ফাইভ-ইন-ওয়ান ক্রিকেটার।’

২০১৬ সালের ৩ জুন প্রয়াত হন কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলি। তার স্মরণে ওই বছরের ১০ জুন ক্রিকেটের মক্কা হিসেবে পরিচিত লর্ডসের ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজান স্যার গ্যারি সোবার্স। ছবি: সংগৃহীত
২০১৬ সালের ৩ জুন প্রয়াত হন কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলি। তার স্মরণে ওই বছরের ১০ জুন ক্রিকেটের মক্কা হিসেবে পরিচিত লর্ডসের ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজান স্যার গ্যারি সোবার্স। ছবি: সংগৃহীত

১৯৫৪ সালে অভিষেকের পর গ্যারি সোবার্সের ক্যারিয়ার থামে ১৯৭৪ সালে। এই দুই দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট খেলেছেন তিনি। ৫৭.৭৮ গড়ে করেছেন ৮ হাজার ৩২ রান, ৩৪.০৩ গড়ে নিয়েছেন ২৩৫ উইকেট। ৩৯টি টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) পুরুষদের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স অ্যাওয়ার্ড’ তার নামেই প্রবর্তিত, যা তিন সংস্করণ মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বছরের সেরা পারফর্মারকে দেওয়া হয়।

একনজরে স্যর গ্যারি সোবার্সের টেস্ট ক্রিকেট ক্যারিয়ার। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম
একনজরে স্যর গ্যারি সোবার্সের টেস্ট ক্রিকেট ক্যারিয়ার। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম

১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে সফরকারী ভারতের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় সোবার্সের। প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষকে ফলোঅন করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। এক বছর পর জ্যামাইকায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় তার। ৯ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে দুই ইনিংসে করেন যথাক্রমে ১৪ ও ২৬ রান, আর ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে নেন ৪ উইকেট।

ক্যারিয়ারের শুরুতে মূলত বোলার হিসেবে খেললেও ২১ বছর বয়সে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৫৮ সালে সাবিনা পার্কে তুলে নেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতক। সেই ইনিংসেই ৩৬৫ রান করে ভেঙে দেন ইংল্যান্ডের লেন হাটনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত টেস্ট ইনিংসের বিশ্বরেকর্ড। তার সেই রেকর্ড টিকে ছিল ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই আরেক কিংবদন্তি ব্যাটার ব্রায়ান লারা ৩৭৫ রান করে রেকর্ডটি ভেঙে দেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মাঠে উপস্থিত থেকে লারাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন সোবার্স।

১৯৬৮ সালে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামরগানের ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে টানা ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটার হিসেবে এই কীর্তি গড়েন গ্যারি সোবার্স। ছবি: বিবিসি
১৯৬৮ সালে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামরগানের ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে টানা ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটার হিসেবে এই কীর্তি গড়েন গ্যারি সোবার্স। ছবি: বিবিসি

এর এক দশক পর আবারও ইতিহাস গড়েন সোবার্স। ১৯৬৮ সালে কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামরগানের ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে টানা ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটার হিসেবে এই কীর্তি গড়েন।

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বার্বাডোজ, নটিংহ্যামশায়ার ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মোট ৩৮৩টি ম্যাচ খেলেছেন সোবার্স। ৫৪.৮৭ গড়ে করেছেন ২৮ হাজার ৩১৪ রান এবং ২৭.৭৪ গড়ে নিয়েছেন এক হাজার ৪৩ উইকেট।

লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে এই ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান অলরাউন্ডার খেলেছেন ৯৫টি ম্যাচ। তবে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালু হওয়ার সময় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার প্রায় শেষের দিকে থাকায় ওয়ানডেতে খেলেছেন মাত্র একটি ম্যাচ— ১৯৭৩ সালে হেডিংলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।

১৯৯৪ সালে কেনিংসটন ওভালে উদ্‌যাপন করা হয় স্যার গ্যারি সোবার্সের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ৪০ বছর পূর্তি। সেদিন মাঠে ব্রায়ান লারার সঙ্গে গ্যারি সোবার্স। ছবি: পিএ ফটোস
১৯৯৪ সালে কেনিংসটন ওভালে উদ্‌যাপন করা হয় স্যার গ্যারি সোবার্সের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ৪০ বছর পূর্তি। সেদিন মাঠে ব্রায়ান লারার সঙ্গে গ্যারি সোবার্স। ছবি: পিএ ফটোস

ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে নাইট উপাধি পান সোবার্স। ২০০০ সালে উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক তাকে ‘ফাইভ ক্রিকেটার্স অব দ্য সেঞ্চুরি’র একজন হিসেবে নির্বাচিত করে। সেই তালিকায় তার সঙ্গে ছিলেন স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান, স্যার জ্যাক হবস, স্যার ভিভ রিচার্ডস ও শেন ওয়ার্ন।

১৯৩৬ সালে বার্বাডোজে জন্ম নেওয়া সোবার্স ছিলেন ছয় ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালে তার মার্চেন্ট-সিম্যান বাবা মারা যাওয়ার পর মূলত মায়ের কাছেই বড় হন তিনি। ক্রিকেটের পাশাপাশি বাস্কেটবল, ফুটবল ও গলফেও সমান দক্ষ ছিলেন তিনি।

সোবার্সের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ (সিডব্লিউআই)। বোর্ড সভাপতি ড. কিশোর শ্যালো এক বিবৃতিতে তাকে ‘বিশ্বের দেখা সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার’ বলে উল্লেখ করেন এবং তার পরিবার, বার্বাডোজ সরকার ও জনগণ এবং বিশ্ব জুড়ে শোকাহত সবার প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

কেনিংসটন ওভালের বাইরে স্যার গ্যারি সোবার্সের ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত
কেনিংসটন ওভালের বাইরে স্যার গ্যারি সোবার্সের ভাস্কর্য। ছবি: সংগৃহীত

বিবৃতিতে শ্যালো বলেন, ‘কোনো জাতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একজন মানুষের জীবন পুরো একটি প্রজন্মের আশা, স্বপ্ন ও পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। আজ ক্যারিবীয় অঞ্চল এমনই একজন মানুষকে হারাল। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে তার দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। কিন্তু তার গুরুত্ব ক্রিকেট মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর বিস্তৃত ছিল।’

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান আরও বলেন, ‘ক্যারিবীয় অঞ্চল যখন বিশ্বের সামনে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছিল, ঠিক সেই সময় সোবার্স উঠে এসেছিলেন। নিজের অসাধারণ কৃতিত্বের মাধ্যমে তিনি আমাদের দ্বীপপুঞ্জ ও প্রবাসী ক্যারিবীয়দের লাখো মানুষকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন— অসম্ভব বলে কিছু নেই। তিনি দেখিয়েছেন, একটি দেশের আয়তন, দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা জন্মপরিস্থিতি কখনোই মহত্ত্ব অর্জনের পথে বাধা হতে পারে না।’

শ্যালোর ভাষায়, ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স শুধু একজন ক্রীড়া আইকন ছিলেন না। তিনি ছিলেন ক্যারিবীয় শ্রেষ্ঠত্ব, দৃঢ়তা এবং সম্ভাবনার প্রতীক। তার অর্জন বার্বাডোজকে গর্বিত করেছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং ক্রিকেটবিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছে।’

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

মেসির সাথে ছোট্ট লামিন—ভাইরাল সে ছবির পেছনের গল্প কী

সময়টা ২০০৭ সাল। তখন বার্সেলোনার হয়ে খেলছেন ২০ বছর বয়সী মেসি। ইউনিসেফের একটি ক্যালেন্ডারের ফটোশুটে অংশ নিতে ক্যাম্প ন্যুতে গিয়েছিলেন তিনি।

১০ ঘণ্টা আগে

স্প্যানিশ শিবিরে একটিই বার্তা— ‘আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই’

অধিনায়ক রদ্রি হার্নান্দেজ শুরু থেকেই বলে আসছেন, তার একমাত্র লক্ষ্য বিশ্বকাপ জেতা।

১১ ঘণ্টা আগে

ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল: গ্যালারিতে থাকছেন ট্রাম্প, তুলে দেবেন ট্রফি

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট জানান, ফাইনালের আগে আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই) নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ট্রাম্প টাওয়ারে আয়োজিত ফিফার এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর আগামী রোববার তিনি ফাইনাল ম্যাচের সাক্ষী হতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকবেন।

১২ ঘণ্টা আগে

‘আর্জেন্টিনাকে কেউ কিছু পাইয়ে দেয়নি’— সমালোচকদের মেসির কড়া জবাব

মেসি বলেন, ‘গত চার বছর ধরে আমরাই সেরা দল। সেটা কারও ভালো লাগতে পারে, নাও লাগতে পারে। কে কী বলল, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।

১৩ ঘণ্টা আগে