‘নখদন্তহীন’ আর্জেন্টিনা, তারুণ্যের ডানায় ১৬ বছর পর স্পেনের বিশ্বজয়

ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ফুটবলের নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। ছবি: সংগৃহীত

পরপর দুইবার বিশ্বকাপ জয়? ইতিহাস বিপক্ষে ছিল আর্জেন্টিনার। নকআউটে একের পর এক ম্যাচে কোণঠাসা হয়ে ফিরে আসা ইঙ্গিত দিচ্ছিল— সুসংগঠিত শক্তির বিপক্ষে এভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবু আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন একজন— লিওনেল মেসি, ৩৯ বছর বয়সে যিনি গতিতে পরাস্ত হলেও ফুটবল বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে বারবারই ছিনিয়ে আনছিলেন জয়ের লাগাম।

শেষ পর্যন্ত মেসি আর পারলেন না। কোচ লিওনেল স্কালোনি কোন কৌশল নিয়েছিলেন ফাইনালের জন্য, ঠিক আঁচ করাই গেল না। ১০৬ মিনিটে গোল খাওয়ার আগ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা বলতে গেলে গোলের কোনো চেষ্টাই করল না। এর মধ্যে ৯০ মিনিটের পরে ইনজুরি টাইমে এনজো ফের্নান্দেসের লাল কার্ড আর্জেন্টিনাকে আরও কোণঠাসা করে ফেলল।

শেষ পর্যন্ত সে পরিস্থিতি থেকে আর মুক্তি মেলেনি। কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থকের ‘ওয়ান লাস্ট ড্যান্সে’র প্রত্যাশা পূর হয়নি। একদম শেষভাগের কয়েক মিনিটের মরিয়া চেষ্টার বাইরে ‘নখদন্তহীন’ আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপযাত্রা শেষ হলো হতাশায়। গোটা ম্যাচে নিজের ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়ানো মেসিরও সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপযাত্রা শেষ হলো এই হতাশার মধ্য দিয়েই।

গোলের পর ফেরান তোরেসের বাঁধভাঙা উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত
গোলের পর ফেরান তোরেসের বাঁধভাঙা উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

বিপরীতে ১৬ বছর পর শিরোপার আক্ষেপ ঘুচাল স্পেন। ২০১০ সালে জাভি-ইনিয়েস্তার স্পেন প্রথম শিরোপা এনে দিয়েছিল ম্যাটাডোরদের। ১৬ বছর পর দ্বিতীয় শিরোপা এনে দিলেন ইয়ামাল-রদ্রিরা। তারুণ্যের ডানায় ভর করে এলো এই শিরোপা। মজার বিষয় হলো— এই জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেন শতভাগ সাফল্য ধরে রাখল! দুবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার বাইরে তাদের আর কোনো রানার-আপ ট্রফি বা ফাইনাল খেলা হয়নি যে! অর্থাৎ দুটি ফাইনাল খেলে দুবারই চ্যাম্পিয়ন স্পেন।

এই ফাইনাল যেন বিশ্ব ফুটবলের পালাবদলেরও এক প্রতীকী রূপ। একদিকে ছিলেন দুই দশক ধরে গোটা ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করে আসা লিওনেল মেসি। অন্যদিকে ছিলেন ১৯ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল, মেসির সঙ্গে যার শৈশবের ছবি বহুদিন ধরেই অনলাইনে ভাইরাল। মেসি যে লা মাসিয়া একাডেমির পরে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে আলো ছড়িয়েছেন নক্ষত্রের মতো, সেই মাসিয়া একাডেমির আরেক ছাত্র ইয়ামালের হাতেই যে এখন সেই বার্সেলোনারও ব্যাটন। ক্লাব ফুটবলের মতো বিশ্ব ফুটবলের ব্যাটনটাও যেন মেসিরই উপস্থিতিতে তার কাছ থেকে নিজ হাতে তুলে নিলেন ইয়ামাল।

বিশ্বকাপের উদীয়মান তারকা পাও কুবার্সি। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের উদীয়মান তারকা পাও কুবার্সি। ছবি: সংগৃহীত

ফাইনাল ম্যাচে আর্জেন্টিনার ‘অদ্ভুতুড়ে রণকৌশলে’র পরও স্পেনের এ জয় আসেনি সহজে। গোটা ৯০ মিনিটে ১৫ বার গোলের চেষ্টা চালাল স্পেন। এর মধ্যে ৯ বার বল লক্ষ্যেও রাখল। কয়েকটি সুযোগ ছিল গোল হওয়ার মতোই। কিন্তু আর্জেন্টিনার রক্ষণ ছিল জমাট, সেই সঙ্গে বিশ্বকাপে প্রথমবার যেন ছন্দ খুঁজে পেলেন গোলরক্ষক এমি মার্টিনেজ। তাতে ৯০ মিনিটে লক্ষ্যভেদ করা সম্ভব হয়নি স্পেনের।

৯০ মিনিটের পর ইনজুরি টাইমে রদ্রিকে ফাউল করে ম্যাচে দ্বিতীয় লাল কার্ড দেখলেন এনজো ফের্নান্দেস। এরপর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গড়াল খেলা। ১০ জন নিয়ে সে অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধও উৎরে গেল আর্জেন্টিনা, অর্থাৎ ঠেকিয়ে রাখল স্পেনকে। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের বিরতির পর আর শেষ রক্ষা হয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল নেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। ছবি: সংগৃহীত
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল নেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। ছবি: সংগৃহীত

১০৬ মিনিটের মাথায় ডান দিক থেকে পেদ্রো পোরোর উঁচু ক্রস পেছনের পোস্টের পাশ দিয়ে মনে হচ্ছিল বেরিয়েই যাবে। সেখান থেকে দারুণ দক্ষতায় বল ডি-বক্সের মধ্যে ফিরিয়ে আনেন নিকো উইলিয়ামস। ফিরতি বল পেয়ে কাছ থেকে জোরালো শটে জাল কাঁপান ফেরান তোরেস। সেই গোলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে স্পেন শিবির। শেষ পর্যন্ত সেই লিড ধরে রেখে দ্বিতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের শিরোপা জিতল স্পেন।

নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ফাইনালের শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল বল দখল, আক্রমণ তৈরি ও সুযোগ তৈরির প্রতিটি বিভাগে সুস্পষ্টভাবে ছিল এগিয়ে। সব মিলিয়ে পুরো ম্যাচে ১১টি লক্ষ্যেসহ গোলের উদ্দেশে ২০টি শট, বিপরীতে ছন্নছাড়া আর্জেন্টিনার লক্ষ্যবিহীন মাত্র তিনটি শটই বলে দেয়, ম্যাচে স্পেন কতটা আধিপত্য বিস্তার করেছে।

শিরোপা জয়ের উল্লাসে মেতেছে স্পেন। ছবি: সংগৃহীত
শিরোপা জয়ের উল্লাসে মেতেছে স্পেন। ছবি: সংগৃহীত

আর্জেন্টিনার এই শেষ চেষ্টাও গোল খাওয়ার পর ফিরে আসার মরিয়া চেষ্টায়। গোল হজমের পরই প্রথমবারের মতো আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে তারা। ম্যাচের ১১৫তম মিনিটে প্রথমবার গোলমুখে শট নেয় আর্জেন্টিনা।

সম্ভবত নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে নামা লিওনেল মেসির শট স্পেনের ডিফেন্ডার মিকেল মেরিনোর গায়ে লেগে প্রতিহত হয়। এরপর কর্নার, ফ্রি-কিক, ক্রসে আরও দুয়েকবার চেষ্টা করলেন মেসি, কিন্তু কাজ হয়নি। শেষ মুহূর্তে সিমিওনে লক্ষ্যে বল রাখতে পারলে হয়তো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত স্পেন। কিন্তু বল গোলবারের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে গেলে স্প্যানিশ গোলরক্ষক সিমনকে কার্যত কোনো পরীক্ষার মুখেই পড়তে হয়নি গোটা ম্যাচে।

শিরোপা জয়ের উল্লাস স্পেনের মাদ্রিদে। ছবি: সংগৃহীত
শিরোপা জয়ের উল্লাস স্পেনের মাদ্রিদে। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে গোটা ম্যাচে আর্জেন্টিনা ফাউল করেছে ২৪টি, স্পেন ২১টি। তবে আর্জেন্টিনা ৫টি হলুদ কার্ড পেলেও স্পেন পায়নি একটিও। ফাইনাল ম্যাচে তাই শারীরি উত্তাপও ছড়িয়েছিল। শেষ বাঁশি বাজার পর পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্তও হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনার নাহুয়েল মোলিনা ও লিয়ান্দ্রো পারেদেস ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। একপর্যায়ে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। গাভিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেই দেন পারদেস। তার জন্য ম্যাচের পরেও পেয়েছেন লাল কার্ড।

ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচসহ ম্যাচ অফিশিয়ালদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেরা খেলোয়াড়দের হাতেও পুরস্কার তুলে দেন।

শিরোপা জয়ের উল্লাস বার্সেলোনায়। ছবি: সংগৃহীত
শিরোপা জয়ের উল্লাস বার্সেলোনায়। ছবি: সংগৃহীত

এ সময় সেরা উদীয়মান তারকার পুরস্কার পেয়েছেন স্পেনের পাও কুবার্সি। সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার পেয়েছেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন। টুর্নামেন্টসেরা হিসেবে গোল্ডেন বল পেয়েছেন রদ্রি।

স্পেনের আগের বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় সার্জিও রামোস বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে এসেছিলেন পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে। স্প্যানিশ ক্যপ্টেন রদ্রির হাতে সেটি তুলে দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শিরোপার উল্লাসে মেতে ওঠে স্পেন।

বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল, উল্লাসটা তাই বেশিই। সামনে গোলদাতা তোরেস, পেছনে অ্যাসিস্ট যার সেই নিকো উইলিয়ামস। এই একমাত্র গোলেই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয় করেছে স্পেন। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল, উল্লাসটা তাই বেশিই। সামনে গোলদাতা তোরেস, পেছনে অ্যাসিস্ট যার সেই নিকো উইলিয়ামস। এই একমাত্র গোলেই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয় করেছে স্পেন। ছবি: সংগৃহীত

ম্যাচ বলছে, ধারাবাহিক আক্রমণ, দৃষ্টিনন্দন পজেশনভিত্তিক ফুটবল আর ধৈর্যের পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত সফল হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরল ইউরোপের এই পরাশক্তি। শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত শেষ হলো আর্জেন্টিনার রোজারিও থেকে উঠে আসা ‘লিটল বয়’ লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ও, যে রাজত্ব আগামী চার বছর সামলাবেন ইয়ামাল-পেদ্রি-নিকোরা।

কবিগুরুর ভাষা ধার করে বলা যায়— ইয়ামালের হলো শুরু, মেসির হলো সারা।

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

জানি না এত বড় কিছু করা আর সম্ভব হবে কি না: স্কালোনি

স্বীকার করে নিলেন, যোগ্য দল হিসেবে ভালো খেলেই বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন। আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়েও স্কালোনি জানালেন অনিশ্চয়তার কথা। বললেন, আবার এমন একটি দল আবার গঠন করা কঠিন কাজ। নিজের মেয়াদ পূর্ণ করার কথা জানালেও দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বলেই জানালেন তিনি।

১২ ঘণ্টা আগে

বিশ্বকাপের ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোতে স্প্যানিশদের দখল, গোল্ডেন বুট এমবাপ্পের

টুর্নামেন্টে রেকর্ড ১০টি গোল করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট নিজের করে নিলেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। অন্যদিকে, লিওনেল মেসিকে এবারও সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে ৮ গোল নিয়ে সিলভার বুটেই।

১৩ ঘণ্টা আগে

পাঁচ বছরে ১৬টি শিরোপা, কেন স্পেন এখন ফুটবলের সবচেয়ে অদম্য শক্তি

এর আগে ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের দুই বছর পর ২০১০ সালেও তারা বিশ্বকাপ জিতে একই কীর্তি গড়েছিল।

১৬ ঘণ্টা আগে

একক নৈপুণ্যে সেরা রদ্রি-কুবারসি-সিমন-এমবাপ্পে

বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল পেয়েছেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। সেই সঙ্গে স্পেনে গেছে সেরা গোলরক্ষক আর সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়েরর আরও দুই ব্যক্তিগত পুরস্কার। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে।

২০ ঘণ্টা আগে