সোস্যাল মিডিয়া

ইউটিউবে ইতিহাস গড়েছেন মিস্টার বিস্ট

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ছবি: সংগৃহীত

ইউটিউব দুনিয়ায় প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ ভাইরাল হয়, কেউ কেউ কিছুদিনের জন্য আলোচনায় থাকেন, আবার হারিয়ে যান। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শুধু ভাইরাল হন না—তাঁরা ইতিহাস গড়েন। তাঁদেরই একজন হলেন মিস্টার বিস্ট—যাঁর প্রকৃত নাম জিমি ডোনাল্ডসন। বয়স মাত্র সাতাশ। অথচ এর মধ্যেই তিনি ইউটিউবের ইতিহাসে এমন এক মাইলফলক ছুঁয়েছেন, যা আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে ইউটিউবের সবচেয়ে সাবস্ক্রাইবড ব্যক্তি এখন আর কোনো গায়ক, অভিনেতা বা মেকআপ টিউটোরিয়ালিস্ট নন। এই জায়গাটা দখল করেছেন একজন তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তিনি কোনো ফিল্মি নায়ক নন বরং একেবারে পাশের বাড়ির ছেলের মতো সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ চেহারার আড়ালে রয়েছে অসাধারণ মস্তিষ্ক, বিশাল এক টিম এবং সবচেয়ে বড় কথা বিশ্বাস—ভালো কাজের মধ্য দিয়েও জনপ্রিয়তা পাওয়া সম্ভব।

মিস্টার বিস্টের ইউটিউব চ্যানেল ২০২৫ সালের আগস্টে এসে ৩০ কোটিরও বেশি সাবস্ক্রাইবার পেয়েছে। এই সংখ্যাটা শুধু ইউটিউবের নয়, গোটা ইন্টারনেট ইতিহাসের এক অনন্য নজির। এর আগে সবচেয়ে বেশি সাবস্ক্রাইবার ছিল টি-সিরিজ নামে ভারতের বিখ্যাত মিউজিক জায়ান্টের। বহুদিন ধরেই এই দুই চ্যানেলের মধ্যে চলছিল প্রতিযোগিতা। তবে ২০২৫ সালের ২ আগস্ট মিস্টার বিস্ট টি-সিরিজকে সরিয়ে ইউটিউবের সিংহাসনে বসে পড়লেন। আর সেটা করলেন উদারতা আর দুঃসাহসিক কন্টেন্টের মাধ্যমে।

এই তরুণের ইউটিউব যাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারে সাদামাটা একটি চিন্তা থেকে। কিভাবে মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া যায় এমন কিছু করে, যেটা আগে কেউ করেনি? প্রথম দিকে তিনি ভিডিও বানাতেন গেম খেলার রেকর্ডিংয়ের। তারপর চেষ্টা করতেন অদ্ভুত সব চ্যালেঞ্জ। যেমন, এক জায়গায় ২৪ ঘণ্টা বসে থাকা, হাজারবার একটি কথা বলা, কিংবা ১০ লক্ষ বার কাউন্ট করা। এগুলো শুধু মজা নয়, বরং ধৈর্য, পাগলামি আর কল্পনার অনন্য উদাহরণ।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝলেন, শুধু পাগলামিতে নয়, মানুষের মন জয় করতে হলে তাদের জন্য কিছু করতে হয়। তখন থেকেই শুরু হলো তাঁর দান-সাধনার অধ্যায়। তিনি ভিডিও বানাতে শুরু করলেন যেখানে কারো শিক্ষার খরচ দিয়ে দিচ্ছেন, কারো অপারেশনের খরচ দিচ্ছেন, গৃহহীন মানুষকে বাড়ি কিনে দিচ্ছেন, অথবা অচেনা কারো হাতে লাখ লাখ ডলার তুলে দিচ্ছেন। এসব কাজ শুধু যে ভাইরাল হয়েছে তা নয়, বরং মানুষ মিস্টার বিস্টকে এক অনন্য মানবিক মানুষ হিসেবেও গ্রহণ করেছে।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত এক্সপেরিমেন্ট হলো “স্কুইড গেইম ইন রিয়েল লাইফ।” কোরিয়ান ওয়েবসিরিজ স্কুইড গেইম অবলম্বনে বানানো এই ভিডিওতে অংশ নেন শতাধিক প্রতিযোগী।পুরস্কার হিসেবে থাকে বিপুল অর্থ। গোটা সেট বানাতে খরচ হয় প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার।যা ইউটিউবের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভিডিওর একটি।

তাঁর কনটেন্ট কেবল বিনোদন নয়, বরং একধরনের সামাজিক উদ্যোগ। যেমন, ২০২১ সালে তিনি “#TeamTrees” নামে একটি প্রজেক্ট চালু করেন, যেখানে প্রতিটি দানের মাধ্যমে একটি করে গাছ লাগানো হয়। এ উদ্যোগে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ হয় এবং বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ গাছ রোপণ করা হয়। এরপর আসে আরেক বড় প্রজেক্ট—TeamSeas—যার লক্ষ্য ছিল সাগর পরিষ্কার করা।

এই অভাবনীয় সফলতার পেছনে শুধু টাকা বা টেকনোলজির কথা বললে ভুল হবে। কারণ, মিস্টার বিস্ট দেখিয়ে দিয়েছেন, ইউটিউব এখন আর শুধুই বিনোদনের জায়গা নয়—এটা সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মও হতে পারে।

বিশ্বখ্যাত মিডিয়া গবেষক যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টমিনস্টার-এ মিডিয়া অ্যান্ড কালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. কেটি স্টিলম্যান মিস্টার বিস্ট প্রসঙ্গে বলেন, ‘মিস্টার বিস্ট যিনি বুঝেছেন মানুষ সোস্যাল মিডিয়ায় এখন আর শুধু হাসি খোঁজে না, আশাও খোঁজে। তাঁর প্রতিটি কনটেন্ট একধরনের হিউম্যান কনেকশন তৈরি করে। এটাই তাকে অনন্য করে তুলেছে।’

তবে এত খ্যাতি ও সফলতার পেছনে যে ত্যাগ রয়েছে, সেটাও মিস্টার বিস্ট খোলাখুলি জানিয়েছেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে। তিনি জানিয়েছেন, ছোটবেলায় তাঁর লার্নিং ডিসঅর্ডার ছিল। একসময় তিনি একা ঘরে বসে ইউটিউব ভিডিও বানাতেন, কেউ জানত না। দিনের পর দিন চেষ্টা করেও তাঁর চ্যানেল বড় হয়নি, অনেকেই তাঁকে বলেছে, “তুই পারবি না।” কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। প্রতি ভিডিওতে উন্নতির চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

আজ মিস্টার বিস্ট এখন একাধারে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, সফল উদ্যোক্তা, সমাজসেবক এবং ভবিষ্যতের মিডিয়া গেমচেঞ্জার। তাঁর নামে এখন রেস্টুরেন্ট চেইন আছে—MrBeast Burger।তিনি চকলেট ব্র্যান্ড চালু করেছেন—Feastables, এবং তিনি একটা বিশাল টিম নিয়ে কাজ করেন, যাতে শতাধিক লোক কাজ করছে।

তার কাজ বলে দেয়, সময়া বদলে গেছে। এখন কেউ চাইলে ঘরের কোণ থেকে বিশ্ব জয় করতে পারেন—শুধু প্রয়োজন একটুখানি সাহস, অদম্যতা, আর মানুষের জন্য কিছু করার মন।

মিস্টার বিস্ট কেবল ইউটিউবের সিংহাসনে বসেননি, তিনি আমাদের ভাবনার ধরণটাই বদলে দিয়েছেন। তাঁর কনটেন্ট দেখলে মনে হয়—দুনিয়াটা এতটা খারাপ নয়, এখানেও কিছু ভালো মানুষ এখনো আছেন, যারা শুধু বিনোদন দেন না, বরং স্বপ্ন দেখান, স্বপ্ন দেখাতে শেখান।

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার আর নেই

লিভার-সংক্রান্ত জটিলতায় গত কয়েক দিন ধরে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন কারিনা। প্রথমে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স যোগে তাকে ভারতের চেন্নাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

১১ দিন আগে

সেবা প্রকাশনীতে অনিয়ম-দুর্নীতি, কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা

১৪ দিন আগে

নায়িকার অভিযোগ, মুক্তি পাচ্ছে না ‘কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ’

নানা সমালোচনার পর মুক্তির দুই দিন আগেই স্থগিত করা হলো চিত্রনায়িকা মৌসুমী অভিনীত সিনেমা ‘কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ’-এর সেন্সর সনদপত্র। অভিনেত্রী জেবা জান্নাতের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিনেমার সেন্সর সনদপত্রটি বাতিল করা হয়।

১৪ দিন আগে

যুদ্ধ-ক্ষুধা-অবিনাশী সৌন্দর্য— মারাহ খালেদের ক্যানভাসে গাজার দিনলিপি

মারাহর কাজগুলো নিয়ে আমি যখন পড়ালেখা করছিলাম, আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল তার সেই ছোট্ট তাঁবুর গল্প। এক শরণার্থী শিবিরের ভেতরে, যেখানে মানুষের নিজের জন্য জায়গা নেই, সেখানে একটি তাঁবুকে গ্যালারি বানিয়ে ফেলল সে। এ যেন সেই প্রবল ধ্বংসযজ্ঞ ও অসহায়ত্বের মধ্যেও এক নীরব বিদ্রোহ।

১৪ দিন আগে