অস্কারজয়ী সত্যজিৎ: গর্বের এক অধ্যায়

ড. মিহির কুমার রায়
আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৯: ১০
সত্যজিৎ রায়। ছবি: সংগৃহীত

ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন গত শতক, ১৯৯২ সাল। দিনটি ছিল ৩০ মার্চ। মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে গর্বিত করলেন প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়। শতাব্দীর সেরা চলচ্চিত্রকার, যিনি ভারতকে অস্কার এনে দিয়েছিলেন। ১৯৯২ সালের ৩০ মার্চ টিভির পর্দায় দীর্ঘ রোগভোগে ক্লান্ত সত্যজিৎ রায়কে অস্কার পুরস্কারের স্মারক হাতে নিয়ে আধশোয়া অবস্থায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য পেশ করতে দেখে আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন সবাই। ওই দিন আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে লস অ্যাঞ্জেলেসে অস্কার দেওয়া হয়।

সত্যজিৎ অস্কার পেতে চলেছেন— খবরটি ১৯৯২ সালের প্রথমদিকে সবাই কমবেশি জেনে গিয়েছিলেন। ১৬ মার্চ ১৯৯২ বেলভিউ নার্সিং হোমে সত্যজিৎ লাভ করেন অস্কার সম্মানের স্মারক। সেদিন হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়, আল শেয়ার্জসহ আরও কয়েকজন।

সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে কিছু না বলার ধৃষ্টতা দেখিয়ে বলা যায়— নিজের প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’র মধ্য দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রপরিচালকের সদর্প আগমন। পরে ‘অপরাজিত’, ‘পরশপাথর’, ‘জলসাঘর’, ‘অপুর সংসার’, ‘দেবী’, ‘তিন কন্যা’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘আগন্তুক’, ‘মহানগর’, ‘চারুলতা’ ছবিগুলো বাংলা চলচ্চিত্রের গোত্রান্তর ঘটিয়ে দেয়। চলচ্চিত্রবোদ্ধা থেকে সিনেমাপ্রেমী— সবার মধ্যেই উচ্ছ্বাস দেখা যায়। শেষবেলায় ‘আগন্তুক’-এ নতুন রূপে উৎপল দত্তকে উপস্থিত করা তো প্রতিভাকে প্রতিভার দেওয়া উপহারই।

শুধু একটি কথা তার সম্পর্কে সাহস করে বলা যায় বোধহয়— সত্যজিৎ রায় তুলসী চক্রবর্তী ও রবি ঘোষকে আন্তর্জাতিক মানের অভিনেতা মনে করতেন এবং এই দুজনকেই যোগ্য চরিত্রে তুলে ধরেছেন। তুলসী চক্রবর্তীকে প্রধান চরিত্রে রেখে ‘পরশপাথর’ নির্মাণ করেন, আর রবি ঘোষ ‘বাঘা বাইন’ হিসেবে সারা বিশ্বে সমাদৃত। প্রতিভাকে সঠিকভাবে চিনতে ও ব্যবহার করতে পারেন আরেক প্রতিভাই।

প্রাথমিকভাবে কথা ছিল লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে মানিকবাবু আনুষ্ঠানিকভাবে অস্কার নেবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়, কারণ তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক সেই কারণেই চিরাচরিত প্রথা ভেঙে অস্কার কর্তৃপক্ষ কলকাতায় এসে সত্যজিৎ রায়কে পুরস্কার দিয়ে যান। অস্কার কমিটির প্রতিনিধি প্রযোজক আল শেয়ার্জ নিজে কলকাতায় আসেন।

১৯৯২ সালের ৩০ মার্চ টিভির পর্দায় দীর্ঘ রোগভোগে ক্লান্ত সত্যজিৎ রায়কে অস্কার পুরস্কারের স্মারক হাতে দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত
১৯৯২ সালের ৩০ মার্চ টিভির পর্দায় দীর্ঘ রোগভোগে ক্লান্ত সত্যজিৎ রায়কে অস্কার পুরস্কারের স্মারক হাতে দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত

ইন্টারেস্টিং বিষয়, ভারত সরকার সেই সময় সত্যজিৎ রায়কে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার ঘোষণা করে। মানিকবাবু তখন বেলভিউ নার্সিং হোমে চিকিৎসাধীন। শোনা যায়, দীর্ঘদিন হাসপাতালে শয্যাশায়ী থাকা সত্ত্বেও তিনি সহধর্মিণী বিজয়া রায়কে বলেছিলেন— ‘এবার দেখছি পুরস্কার দেওয়ার ধুম পড়ে গেছে।’ বলা বাহুল্য, ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘লিজিয়ন অব অনার’ লাভের পরেও স্বদেশের ‘ভারতরত্ন’ পেতে সত্যজিৎ রায়কে অস্কার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়— এ নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়।

ফেলুদা, তোপসে, জটায়ু, প্রফেসর শঙ্কু প্রভৃতি চরিত্র নির্মাণ করে সত্যজিৎ বাংলা কিশোরসাহিত্যকে এক ভিন্নতর মাত্রা দেন— আজও তারা বেস্টসেলার। একজন ভারতীয় হিসেবে, একজন বাঙালি হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের অস্কারপ্রাপ্তি আমাদের গর্ব ও অহংকারকে দ্বিগুণ করে।

এই ক্ষণজন্মা পুরুষের বাড়ি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে। তার প্রপিতামহ উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী এবং পিতা সুকুমার রায় ছিলেন শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার, যারা বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র। সুকুমার রায়ের জন্ম ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্ম পরিবারে। তার পিতা উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক এবং মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের নেতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা।

সুকুমার রায় জন্মেছিলেন বাংলার নবজাগরণের স্বর্ণযুগে। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্যঅনুরাগী, যা তার সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশে সহায়ক হয়। পিতা উপেন্দ্র কিশোর ছিলেন শিশুতোষ গল্প ও জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার ও শৌখিন জ্যোতির্বিদ। উপেন্দ্র কিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যার প্রভাব সুকুমারের ওপর পড়েছিল। এ ছাড়াও রায় পরিবারের সঙ্গে বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখের সম্পর্ক ছিল।

উপেন্দ্র কিশোর ছাপার ব্লক তৈরির কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং মানসম্পন্ন ব্লক তৈরির একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ‘ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুকুমার যুক্ত ছিলেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় অনার্সসহ বিএসসি করার পর সুকুমার রায় মুদ্রণবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯১১ সালে বিলেত যান। সেখানে তিনি আলোকচিত্র ও মুদ্রণ প্রযুক্তির ওপর পড়াশোনা করেন এবং পরে ভারতের প্রথম সারির আলোকচিত্রী ও লিথোগ্রাফার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

১৯১৩ সালে সুকুমার কলকাতায় ফিরে আসেন। ইংল্যান্ডে তার অধ্যয়নকালে উপেন্দ্র কিশোর উন্নতমানের রঙিন হাফটোন ব্লক তৈরি ও মুদ্রণক্ষম একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন এবং ছোটদের জন্য ‘সন্দেশ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। সুকুমার তাতে নিয়মিত লিখতেন। বিলেত থেকে ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই উপেন্দ্র কিশোরের মৃত্যু হলে পিতার মৃত্যুর পর ‘সন্দেশ’ পত্রিকা ও পারিবারিক ছাপাখানার দায়িত্ব সুকুমার গ্রহণ করেন।

সুকুমার রায়ের স্বল্পস্থায়ী জীবনে তার প্রতিভার শ্রেষ্ঠ বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। ‘সন্দেশে’র সম্পাদক থাকাকালীন সময়ে তার লেখা ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ আজও বাংলা শিশুসাহিত্যে মাইলফলক হয়ে আছে। ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় এই রোগের কোনো চিকিৎসা ছিল না। তার একমাত্র পুত্র সত্যজিৎ রায়ের বয়স তখন মাত্র দুই বছর চার মাস।

পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রপরিচালক হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৭ সালে পিতা সুকুমার রায়ের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। অল্প বয়সে পিতার মৃত্যুর পর মায়ের পরিচর্যায় লালিত-পালিত হয়ে স্নাতক পাস করার পর প্রথমে সাংবাদিকতা এবং পরে চলচ্চিত্র নির্মাণে মনোনিবেশ করেন। তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় এবং সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়। এরপর একে একে বহু চলচ্চিত্র পরিচালনা করে তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রে স্থায়ী আসন করে নেন।

প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ৩০ মার্চ ১৯৯২ সালের অস্কারপ্রাপ্তিতে তাকে স্মরণ করছি এবং তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

Feature-Writer-Dr-Mihir-Kumar-31-03-2026

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

৫৩ বছর পর ফের চাঁদে পাড়ি দিচ্ছে মানুষ

এই মিশনের চার নভোচারী হলেন নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। তারা এরই মধ্যে ওরিয়ন ক্যাপসুলে প্রবেশ করেছেন। ১০ দিনের এই মিশনে তারা চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

১৮ দিন আগে

শুটিংয়ের সেটে পানিতে ডুবে প্রাণ গেল কলকাতার রাহুল অরুণোদয়ের

কলকাতার গণমাধ্যম আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, ওড়িশা রাজ্যের তালসারিতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ের সেটে রোববার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যায় ঘটেছে এমন ঘটনা। অভিনেতার মরদেহ দিঘা হাসপাতালে রাখা হয়েছে। সেখানেই তার ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

২২ দিন আগে

‘মুখ ও মুখোশ’-এর কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই

ঢাকার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর কণ্ঠশিল্পী, একুশে পদকপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

২৪ দিন আগে

তুমুল গতিতে ছুটছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’

ঈদের উৎসবমুখর আবহে প্রেক্ষাগৃহে নতুন প্রাণ ফিরিয়েছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। বড় বাজেটের অ্যাকশনধর্মী সিনেমার ভিড়েও ভিন্নধর্মী গল্প আর শক্তিশালী অভিনয়ের জোরে সিনেমাটি দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটিকে ঘিরে চলছে ইতিবাচক আলোচনা, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বক্সঅফিসের আয়েও।

২৫ মার্চ ২০২৬