জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে নারীর জীবন আরও কঠিন হয়

মিতা রহমান
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে নারীর জীবন আরও কঠিন হয়

হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে যে বহুমুখী প্রভাব ফেলেছে, তার বড় একটি অংশ এসে পড়েছে নারীদের ওপর। এর প্রভাব শুধু যাতায়াত ব্যয় বা বাজারদরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নারীর সংসার পরিচালনা, কর্মজীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং মানসিক শান্তির ওপরও এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারীদের একটি বড় অংশকে একই সঙ্গে ঘর ও কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব সামলাতে হয়। সংসারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা, সন্তানদের দেখাশোনা, বাজার-সদাই, রান্না এবং পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের যত্ন— এসব কাজের বড় অংশ নারীর ওপর বর্তায়। পাশাপাশি লাখ লাখ নারী চাকরি, ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম, কৃষিকাজ ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশার সঙ্গে যুক্ত। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার অভিঘাত নারীদের জীবনে নানাভাবে প্রতিফলিত হয়।

সম্প্রতি চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর থেকেই জনজীবনে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। নতুন মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা ও পেট্রল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক রাতের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বেড়েছে।

বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনেও বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর প্রভাব কেবল পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ধীরে ধীরে তা কাঁচাবাজার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নির্মাণসামগ্রী, রং, হার্ডওয়্যারসহ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই বাড়তি ব্যয়ের প্রথম ধাক্কা সামলাতে হয় পরিবারকে। আর পরিবারের সীমিত আয় দিয়ে ব্যয় সামলানোর বড় দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই নারীর ওপর থাকে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। ফলে চাল, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, তেল, সবজি, মাছ ও মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। আয় একই থাকলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের মাসিক বাজেটে ঘাটতি তৈরি হয়। তখন নারীকেই বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করে সংসার চালানোর চেষ্টা করতে হয়।

এর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নারীরা অনেক সময় নিজেদের প্রয়োজনকে সবার শেষে রাখেন। খাবারের পরিমাণ বা মান কমানো, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া, প্রয়োজনীয় পোশাক বা ব্যক্তিগত সামগ্রী কেনা বন্ধ রাখা— এ ধরনের সিদ্ধান্তের বোঝা অনেক নারী নীরবে বহন করেন। দীর্ঘদিন এভাবে চললে তা নারীর পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মজীবী নারী ও ছাত্রীদের যাতায়াতে। বাস ভাড়া বা অন্যান্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ মাসিক বাজেটের একটি বড় অংশ দখল করে নেয়। বিশেষ করে কম ও মাঝারি আয়ের চাকরিজীবী নারীদের ক্ষেত্রে কর্মস্থলে যাতায়াতের খরচ বেতনের উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

খরচ কমাতে গিয়ে অনেক নারী তুলনামূলক কম নিরাপদ বা অতিরিক্ত ভিড়ের গণপরিবহন বেছে নিতে বাধ্য হতে পারেন। এতে শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তির বিষয়টিও যুক্ত হয়। প্রতিদিন কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভিড়, যানজট এবং নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা নারীর ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করে।

গ্রাম ও শহরতলির নারীদের পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। অনেক পরিবার রান্না ও অন্যান্য কাজে কেরোসিন, গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির ব্যয় বাড়লে রান্নাঘরের বাজেটও বেড়ে যায়। পরিবারের মোট ব্যয় কমাতে গিয়ে নারীদেরই খাবার প্রস্তুত ও গৃহস্থালির কাজে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। জ্বালানির সংকট বা দাম বৃদ্ধির কারণে যদি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়, তাহলেও সেই অতিরিক্ত শ্রমের বড় অংশ নারীকেই বহন করতে হয়।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নারী উদ্যোক্তাদের ওপরও পড়ে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তা, অনলাইন ব্যবসায়ী, বুটিক, হস্তশিল্প বা ঘরে তৈরি খাদ্যপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নারীদের পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যায়। ডেলিভারি খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বাড়াতে হয়, আর দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ব্যবসার মুনাফা কমে যেতে পারে। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়াকেই কঠিন করে তুলতে পারে।

এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কম থাকার সময় দেশের বাজারে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। আবার দাম বাড়ার সময় এক ধাক্কায় বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি করে।

কিছুদিন আগে দাম কমানোর ক্ষেত্রে লিটারে মাত্র পাঁচ টাকা কমানো হলেও এখন একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশে কোনো পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আগের পর্যায়ে ফিরে আসার নজির তুলনামূলকভাবে কম— এমন অভিজ্ঞতাও মানুষের আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দেয়।

তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব পণ্যের দাম একই দিনে বাড়ে না। কয়েকটি খুচরা বাজারে দেখা যায়, চাল-ডাল, আটা-ময়দা, চিনি-তেল, সবজি ও মাছ-মাংসের দামে মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়নি। বিক্রেতাদের বক্তব্য, বাজারে থাকা অনেক পণ্য আগেই পরিবহন করে আনা হয়েছে। ফলে নতুন জ্বালানি দরে পরিবহন ব্যয়ের হিসাব পুরোপুরি যুক্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।

কাঁচাবাজারের এক সবজি বিক্রেতা বাবর উদ্দিন বলেন, আগামী দুয়েক দিনে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে খুচরা দামও বাড়াতে হবে। কারণ পরিবহনের ভাড়া বাড়বে নিশ্চিত, আর আমাদের বেশি দামে কিনতে হলে বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। সরকার যেহেতু তেলের দাম বাড়িয়েছে, সেখানে বলার কিছু নেই। কিন্তু এভাবে চলবে কীভাবে? সরকার কি সাধারণ মানুষের কথা একবারও ভাববে না?

মূল্যস্ফীতির চাপ এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে। এর সঙ্গে যদি পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়ে, তাহলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবার এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ঝুঁকি বিশেষভাবে বাড়তে পারে।

কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাবও শেষ পর্যন্ত পরিবারের রান্নাঘরে গিয়ে পড়ে। সেচ, কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণে ব্যয় বাড়লে উৎপাদক পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। আর সেই চাপের শেষ প্রান্তে থাকা ভোক্তা পরিবারের বাজেট সামলানোর দায়িত্ব আবারও অনেকাংশে নারীদের কাঁধে এসে পড়ে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কৃষি ও গণপরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ায় এর প্রভাব উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারে কেরোসিনের বাড়তি দাম জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এমনিতেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নানা সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। এই চাপের একটি বড় অংশ নীরবে বহন করছেন নারীরা, যারা পরিবারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের প্রয়োজন, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করেন।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি তাই শুধু অর্থনীতির একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি নারী সমাজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কর্মজীবন ও মানসিক শান্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়। মূল্যস্ফীতির চাপে নারীর ওপর অবৈতনিক গৃহস্থালি শ্রমের বোঝা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কর্মজীবী নারীর আয় যদি বাড়তি যাতায়াত ব্যয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে তাঁর কর্মজীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

একটি সমাজের অর্থনৈতিক সংকটের প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে শুধু বাজারদর বা মূল্যস্ফীতির হার দেখলেই হবে না, দেখতে হবে সেই সংকট পরিবারের ভেতরে কার ওপর কতটা অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। এর ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নারীকে সংসারের বাড়তি ব্যয় সামলাতে হচ্ছে, নিজের প্রয়োজন কমাতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গেও আপস করতে হচ্ছে।

তাই জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু রাজস্ব, আমদানি ব্যয় বা আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব নয়, এর সামাজিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে নারী, নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবার এবং ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, গণপরিবহনে সহনীয় ভাড়া, বাজার তদারকি এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অভিঘাত কেবল গাড়ির চাকা ঘোরার খরচ বাড়ায় না, তা একটি পরিবারের রান্নাঘর, বাজারের ব্যাগ, কর্মজীবী নারীর যাতায়াত, শিক্ষার্থীর পথচলা এবং একজন নারী উদ্যোক্তার ব্যবসার হিসাবেও প্রতিফলিত হয়। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত সামাজিক ক্ষতির একটি বড় অংশ অদৃশ্যই থেকে যাবে।

লেখক: কবি ও রাজনীতিক; আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement