ট্রাম্পের সফর, ডাফির কবিতা, স্টার্মারের ‘রাজকীয় তাস’

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ২৩: ৩৯
যুক্তরাজ্য সফরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে বেশ কিছু চুক্তি সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই সফর নিয়েই ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান ব্যতিক্রমধর্মী প্রচ্ছদ সাজিয়েছে (বাঁয়ে)। ছবি কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য সফর ঘিরে শুরু থেকে বিতর্ক দানা বাঁধলেও রাষ্ট্রীয় ভোজ থেকে রাজকীয় আয়োজন— সবকিছুই ছিল নজরকাড়া। এ সফর ঘিরে আড়ম্বরের পাশাপাশি ছিল প্রবল রাজনৈতিক বিরোধিতা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ।

লন্ডনের রাজপথে বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পবিরোধী প্ল্যাকার্ড হাতে নেমেছিলেন। আর সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান প্রথম পাতায় প্রকাশ করল এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। বাঁ পাশে মূল খবর, শিরোনাম— ‘PM banks on £150bn investment to placate critics of Trump visit’ (ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরের সমালোচকদের শান্ত করতে ১৫০ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করছেন প্রধানমন্ত্রী)।

এর ঠিক ডান পাশেই ছাপা হলো ব্রিটিশ ‘পোয়েট লরিয়েট’ ক্যারল অ্যান ডাফির কবিতা ‘STATE/BANQUET’। এ কবিতায় ডাফি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তরাজ্য সফরকে তুলনা করেছেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আভিজাত্যপূর্ণ এক ভোজের সঙ্গে।

এদিকে ট্রাম্প সফর নিয়ে যে ক্ষোভ-প্রতিবাদ, তা প্রশমিত করতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫০ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি কাজে লাগালেন। বিশাল এ প্যাকেজ যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে নজিরবিহীন। মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, গুগল এবং ওপেনএআই এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও পারমাণবিক জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

Op-Ed UK Tour Of Donald Trump And The Guardian 19-09-2025 (1)

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে নানা খাতে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের চুক্তি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

তবু ট্রাম্প সফরকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েনের মতো মন্তব্য জনমত বিভক্ত করেছে। যুদ্ধের প্রতিবাদে উইনসর ও লন্ডনে শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে ট্রাম্পবিরোধী স্লোগান তুলেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্পকে অভ্যর্থনা জানাতে রাজকীয় আয়োজন ছিল জমকালো। রাজা চার্লস উইনসর ক্যাসলের সেন্ট জর্জ হলে আয়োজন করেন রাষ্ট্রীয় ভোজ। ট্রাম্প ও চার্লস উভয়েই সেখানে বক্তব্য রাখেন। তবে আড়ম্বরের আড়ালে বিশ্ববাসীর চোখ ছিল ইউক্রেন ও গাজার রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির দিকে— যা ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

কবিতা ও প্রতীকী প্রতিবাদ

ট্রাম্পের সফর ঘিরে ডাফির লেখা কবিতায় যুদ্ধের ধ্বংস আর ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের আভিজাত্যের বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। সেই বৈপরীত্যই সামনে এসেছে—যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতার ভেতর রাজকীয় ভোজের ঝলমল।

অনেকে ডাফির কবিতা প্রকাশকে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন। লন্ডনে অবস্থানরত বিবিসির সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে একসময় পত্রিকার প্রথম পাতায় এক সেনাশাসকের কবিতা নিয়মিত ছাপা হতো। তবে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত আজকের কবিতার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

Op-Ed UK Tour Of Donald Trump And The Guardian 19-09-2025 (3)

দ্য গার্ডিয়ানে ছাপা কবিতা স্টেট/ব্যাংকুয়েট, ডানে কবি ক্যারল অ্যান ডাফি। ছবি কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ‘পোয়েট লরিয়েট’ তথা ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় কবি ছিলেন ডাফি। এ পদে নিয়োগ পাওয়া প্রথম নারী কবি তিনি। ডাফি এর আগে বলেছিলেন, ‘গত কয়েক বছর ট্রাম্প ও ব্রেক্সিটের এই দুষ্ট জমজ জোড়া… আমি আগে কখনো রাজনীতি থেকে এত মানসিক চাপ অনুভব করিনি।’ তার STATE/BANQUET কবিতায় সেই রাজনৈতিক চাপই শিল্পের ভাষায় রূপ নিয়েছে।

ডাফির কবিতাটির বাংলা ভাবানুবাদ এমন—

সে এক রাজকীয় ভোজসভা— ঝলমলে আর দীপ্যমান,

সাজানো পাথুরে ধ্বংসস্তূপে অশ্বক্ষুরাকৃতি টেবিলে,

সাজানো ৬টি করে স্ফটিকের পেয়ালায়।

ফিনফিনে স্বর্ণের প্রলেপে মোড়ানো রুপার তৈজস,

চকচকে— আট আটজন ভৃত্যের ৩ সপ্তাহের শ্রম আর ঘামে,

কংক্রিট থেকে ধুলো ওড়ে বাতাসে,

তাও যেন ঝলমল করে ওঠে।

সেখানে পতপত করে উড়ছে যে পতাকা, গণতন্ত্রের নামে,

তাতে থরে থরে সাজানো ধ্বংসাবশেষ।

ভোজের শুরু মুখরোচক ডোভার মাছে,

ভেতরে স্যামনের ক্রিম, সাজানো পেঁয়াজ পাতায়,

সঙ্গে হোয়াইট ওয়াইন সস।

থাকবে ট্রাফল দিয়ে রান্না করা স্যান্ড্রিংহ্যামের হরিণের মাংস।

শেষ পাতে কাগজি লেবুর পাই, সঙ্গে

ফরাসি রেড ওয়াইন— পিচন কমটেস, ১৯৯০।

প্রতিটি পদেই জিভে জল।

বোমায় বোমায় ধ্বংসস্তূপ যে জনপদ, সেখানে বাজাও ডঙ্কা—

যেখানে সযতনে পথ খুঁজে নেন হর্তাকর্তারা,

যেখানে দেয়ালের গায়ে গায়ে বুলেটের ছেঁদা,

তার ওপারে বুভুক্ষু শিশুর চোখ।

যুক্তরাজ্যে ‘পোয়েট লরিয়েট’ মূলত রাষ্ট্রীয়ভাবে নিযুক্ত একজন কবি, যিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বা উপলক্ষ্যে কবিতা লিখে জাতিকে অনুপ্রাণিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে ব্রিটিশ রাজা বা রানি সম্মানসূচক এ পদে কোনো কবিকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। ১৬৬৮ সালে জন ড্রাইডেন প্রথম সরকারিভাবে এ পদে নিযুক্ত হন। সাড়ে চার শ বছর পেরিয়েও এ প্রথা চলে আসছে।

ডাফির কবিতা ও লন্ডনের বিক্ষোভ— দুটিই দেখায় যে ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনে ট্রাম্প সফর এক গভীর মানসিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতীক। রাজনীতি ও সংস্কৃতি এখানে মিশেছে এক অস্বস্তিকর টানাপোড়েনে, যেখানে রাজকীয় ভোজসভা আর প্রতিবাদের মিছিল পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে।

ব্রিটিশ সমাজে ট্রাম্প ও ব্রেক্সিট কেবল বিদেশনীতি নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক চেতনার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

স্টারমার এখন অর্থনৈতিক মন্দা ও জনপ্রিয়তার ধসের মুখে। তাই ট্রাম্প সফরের মাধ্যমে তিনি যে ‘রাজকীয় তাস’ খেলেছেন, তা সত্যিই তাকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করবে কি না— এখন সেটাই দেখার বিষয়।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্য

৭ দিন আগে

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৮ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৯ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

১১ দিন আগে