
মিতা রহমান

স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের নারী সমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী, অদ্বিতীয় ও প্রেরণাদায়ক। তারা শুধু ঘর থেকে সমর্থন জানাননি, বরং রাজপথে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন, বুলেট ও টিয়ারশেলের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর তালা ভেঙে নারী শিক্ষার্থীরা প্রথম প্রতিবাদে নামেন। মিছিলের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়ে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেছেন। লাঠি ও ইট হাতে তারা পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রত্যেক পরিবারের মা ও গৃহিণীরা অকুতোভয় সৈনিকের মতো রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার, পানি ও স্যালাইনের ব্যবস্থা করেছেন এবং আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন। কোটা আন্দোলন থেকে এক দফার আন্দোলন— জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাসে জড়িয়ে আছে শতসহস্র নারীর নাম। প্রাণ দিয়েছেন নাম না জানা অনেক নারী; হামলা ও নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন অনেকে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অনেক নারী গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ১১ জন নারী তাদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। মাইলস্টোন স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈমা সুলতানা ছিলেন এই অভ্যুত্থানের প্রথম নারী শহিদদের একজন। আন্দোলনের পর রাষ্ট্র গঠনে ও অধিকার রক্ষায় নারীরা এখনো সোচ্চার রয়েছেন। সমান অধিকার ও নিরাপদ সমাজ গড়তে তারা বিভিন্ন সময় নতুন করে মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরছেন। ২৪-এর রক্তাক্ত জুলাইয়ে এমন হাজার হাজার নারীর সাহসী লড়াই পুরো জাতিকে এনে দিয়েছে অদম্য এক জয়ের ইতিহাস। ‘কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয়-লক্ষ্মী নারী।’ নজরুলের এই পঙ্ক্তি যেন আবারও সত্য হয়েছে ২৪-এর স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে। কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান— লাখো নারীর কণ্ঠে তখন দ্রোহজাগানিয়া স্লোগান। ছিলেন মিছিলে, রাজপথে, সমরে, সংগ্রামে। ঝরেছে অশ্রু, ঝরেছে রক্ত; কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে কোনো কিছুই বাধা হতে পারেনি।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের নারী শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে মধ্যরাতে প্রথম রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের এই সাহসী পদক্ষেপ পুরো দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করে। সেই থেকে নারীরা প্রায়ই বিক্ষোভের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে পুরুষ সহযোদ্ধাদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের অনেককে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে এবং অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় ‘অসীম শক্তিধর’ আওয়ামী সন্ত্রাসী, বেপরোয়া র্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর তাক করা অস্ত্রের সামনে তেজোদীপ্ত, সাহসী নারীরা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের প্রতিবাদ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য টনিক হিসেবে কাজ করেছিল। তারা সন্তানদের পাশে এসে দাঁড়ান অকুতোভয় সৈনিকের মতো। ৩৬ দিনের আন্দোলনে এসব সাহসী বীর নারীর অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের বিদায় হলেও নারী কি তাদের হিস্যা বুঝে পেয়েছেন— এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো বৈষম্যের শিকার। নতুন বাংলাদেশে নারীর প্রতি আরও সহনশীল হওয়ার প্রয়োজন থাকলেও তা এখনো হয়নি। সরকার ও দেশের সবাইকে মনে রাখতে হবে, এই বাংলাদেশে শুধু নারী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে তাদের মর্যাদা দিতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনে ‘পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা’— সাহসী শিক্ষার্থী সানজিদা চৌধুরীর এই অগ্নিঝরা বাক্যটি আন্দোলনকারীদের শক্তি জুগিয়েছিল। এতে স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা একটি চরম বার্তা পেয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান— সব আন্দোলন-সংগ্রামে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি নেতৃত্বও দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই অভ্যুত্থান শেষে নারীদের পিছিয়ে দেওয়া হয়, অবমূল্যায়ন করা হয়। রাষ্ট্রও নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেয় না; অধিকারের প্রশ্নে নীরব থাকে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের অবদান অস্বীকার করা হয় এবং তাদের পিছিয়ে দেওয়া হয়। ১৪ জুলাইকে ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ হিসেবে পালন করা হলো। এগুলো করা যেতেই পারে। কিন্তু স্বীকৃতি না দিয়ে, মর্যাদা না দিয়ে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এসব উৎসব পালন বা ড্রোন ওড়ানোর কোনো মানে হয় না। অভ্যুত্থান হয়েছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কিন্তু এখন তার বিপরীত পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। নারীর প্রতিটি প্রাপ্তিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্র নীরব ভূমিকা পালন করছে। মনে রাখতে হবে, নারীরা হারিয়ে যাননি। তারা ইতিহাসের প্রয়োজনে আবার হয়তো মাঠে নেমে আসবেন। শাসকগোষ্ঠী তাদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে না চাইলেও ইতিহাস তাদের মনে রাখবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন, দল বা সংস্থা নয়, বরং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। এতে রাষ্ট্রকাঠামোর কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও তা অবশ্যই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এ সময়ে নারীদেরও কোনো একটি পক্ষ নিতে হতো এবং তারা তা নিয়েছিলেন। ঘরানাগত পার্থক্য, অ্যাক্টিভিজমগত পার্থক্যের বেড়া পেরিয়ে তাদের সামনে বিশাল প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছিল— তারা কি রাষ্ট্রীয়-সরকারি কর্তৃত্ববাদের পক্ষে, না বিপক্ষে? উল্লেখ্য, অধিকাংশ নারীবাদীই এ সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন গণঅভ্যুত্থানের একটি বড় শক্তি হিসেবে। গণঅভ্যুত্থানের একটি বিখ্যাত ছবি আছে। কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে লাঠি হাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিলে বের হচ্ছেন এক হিজাবপরিহিতা (যাকে ইসলামিক চিন্তাধারার প্রতীক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন) এবং এক প্যান্ট-শার্ট পরা (যাকে লিবারেল-মডার্ন চিন্তাধারার প্রতীক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন) তরুণী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাদের পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশি নারীদের অবস্থানকে আরও রাজনৈতিক করেছে।
২০২৪ সালে ‘কোটা পায় কে?’— এই প্রশ্নে উত্তাল হয়েছিল ক্যাম্পাস। কিন্তু আজ প্রশ্ন হচ্ছে, ‘স্বীকৃতি পায় কে?’ দুই বছর পরও নারীদের ত্যাগ রাষ্ট্রীয়ভাবে বা সামাজিকভাবে পূর্ণ মর্যাদা পায়নি। জুলাই কন্যারা সম্মান না পেলেও জায়গা করে নিয়েছে সুবিধাবাদীরা, যারা আন্দোলনের উত্তাল দিনে বাড়িতে হাওয়া খাচ্ছিল। যারা গুলি খেয়েছে, পরিবার-সমাজ-পুলিশি হুমকি সহ্য করেছে, তারা আজ স্মৃতিচ্যুতি ও নিষ্ক্রিয়তার শিকার। এভাবেই নারীদের প্রতিরোধ শুধু রক্তে নয়, স্মৃতিতেও মুছে ফেলা হচ্ছে, যেখানে তাদের ত্যাগ ছিল আন্দোলনের আত্মা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু ‘অংশগ্রহণকারী’ ছিলেন না; তারা ছিলেন এর মূল চালিকাশক্তি। তাদের সাহসিকতা, ত্যাগ, নেতৃত্ব এবং হৃদয় জুড়ে থাকা প্রতিরোধস্পৃহা মিলে গড়ে উঠেছে একটি নতুন প্রজন্ম, যা আর কোনো দিন ভয় পাবে না। জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে এই লেখার মাধ্যমে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাসের কাছে দাবি রাখি— এই দেশ, এই ইতিহাস যেন তাদের নামেও উচ্চারিত হয়। দীর্ঘ জুলাইয়ে ঝরে যাওয়া অসংখ্য নারীর প্রাণ, যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও নারীদের লড়াই এখনো চলমান। রাষ্ট্র সংস্কারসহ নিজেদের অধিকার আদায়ের এই লড়াই প্রতিদিনের।
লেখক: কবি ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন

স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের নারী সমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী, অদ্বিতীয় ও প্রেরণাদায়ক। তারা শুধু ঘর থেকে সমর্থন জানাননি, বরং রাজপথে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন, বুলেট ও টিয়ারশেলের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর তালা ভেঙে নারী শিক্ষার্থীরা প্রথম প্রতিবাদে নামেন। মিছিলের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়ে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেছেন। লাঠি ও ইট হাতে তারা পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রত্যেক পরিবারের মা ও গৃহিণীরা অকুতোভয় সৈনিকের মতো রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার, পানি ও স্যালাইনের ব্যবস্থা করেছেন এবং আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন। কোটা আন্দোলন থেকে এক দফার আন্দোলন— জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাসে জড়িয়ে আছে শতসহস্র নারীর নাম। প্রাণ দিয়েছেন নাম না জানা অনেক নারী; হামলা ও নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন অনেকে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অনেক নারী গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ১১ জন নারী তাদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। মাইলস্টোন স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈমা সুলতানা ছিলেন এই অভ্যুত্থানের প্রথম নারী শহিদদের একজন। আন্দোলনের পর রাষ্ট্র গঠনে ও অধিকার রক্ষায় নারীরা এখনো সোচ্চার রয়েছেন। সমান অধিকার ও নিরাপদ সমাজ গড়তে তারা বিভিন্ন সময় নতুন করে মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরছেন। ২৪-এর রক্তাক্ত জুলাইয়ে এমন হাজার হাজার নারীর সাহসী লড়াই পুরো জাতিকে এনে দিয়েছে অদম্য এক জয়ের ইতিহাস। ‘কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয়-লক্ষ্মী নারী।’ নজরুলের এই পঙ্ক্তি যেন আবারও সত্য হয়েছে ২৪-এর স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে। কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান— লাখো নারীর কণ্ঠে তখন দ্রোহজাগানিয়া স্লোগান। ছিলেন মিছিলে, রাজপথে, সমরে, সংগ্রামে। ঝরেছে অশ্রু, ঝরেছে রক্ত; কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে কোনো কিছুই বাধা হতে পারেনি।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের নারী শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে মধ্যরাতে প্রথম রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের এই সাহসী পদক্ষেপ পুরো দেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করে। সেই থেকে নারীরা প্রায়ই বিক্ষোভের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে পুরুষ সহযোদ্ধাদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীদের অনেককে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে এবং অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় ‘অসীম শক্তিধর’ আওয়ামী সন্ত্রাসী, বেপরোয়া র্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর তাক করা অস্ত্রের সামনে তেজোদীপ্ত, সাহসী নারীরা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের প্রতিবাদ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য টনিক হিসেবে কাজ করেছিল। তারা সন্তানদের পাশে এসে দাঁড়ান অকুতোভয় সৈনিকের মতো। ৩৬ দিনের আন্দোলনে এসব সাহসী বীর নারীর অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের বিদায় হলেও নারী কি তাদের হিস্যা বুঝে পেয়েছেন— এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো বৈষম্যের শিকার। নতুন বাংলাদেশে নারীর প্রতি আরও সহনশীল হওয়ার প্রয়োজন থাকলেও তা এখনো হয়নি। সরকার ও দেশের সবাইকে মনে রাখতে হবে, এই বাংলাদেশে শুধু নারী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে তাদের মর্যাদা দিতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনে ‘পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা’— সাহসী শিক্ষার্থী সানজিদা চৌধুরীর এই অগ্নিঝরা বাক্যটি আন্দোলনকারীদের শক্তি জুগিয়েছিল। এতে স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা একটি চরম বার্তা পেয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান— সব আন্দোলন-সংগ্রামে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি নেতৃত্বও দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই অভ্যুত্থান শেষে নারীদের পিছিয়ে দেওয়া হয়, অবমূল্যায়ন করা হয়। রাষ্ট্রও নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেয় না; অধিকারের প্রশ্নে নীরব থাকে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাদের অবদান অস্বীকার করা হয় এবং তাদের পিছিয়ে দেওয়া হয়। ১৪ জুলাইকে ‘জুলাই উইমেন্স ডে’ হিসেবে পালন করা হলো। এগুলো করা যেতেই পারে। কিন্তু স্বীকৃতি না দিয়ে, মর্যাদা না দিয়ে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এসব উৎসব পালন বা ড্রোন ওড়ানোর কোনো মানে হয় না। অভ্যুত্থান হয়েছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। কিন্তু এখন তার বিপরীত পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। নারীর প্রতিটি প্রাপ্তিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্র নীরব ভূমিকা পালন করছে। মনে রাখতে হবে, নারীরা হারিয়ে যাননি। তারা ইতিহাসের প্রয়োজনে আবার হয়তো মাঠে নেমে আসবেন। শাসকগোষ্ঠী তাদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে না চাইলেও ইতিহাস তাদের মনে রাখবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন, দল বা সংস্থা নয়, বরং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। এতে রাষ্ট্রকাঠামোর কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও তা অবশ্যই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এ সময়ে নারীদেরও কোনো একটি পক্ষ নিতে হতো এবং তারা তা নিয়েছিলেন। ঘরানাগত পার্থক্য, অ্যাক্টিভিজমগত পার্থক্যের বেড়া পেরিয়ে তাদের সামনে বিশাল প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছিল— তারা কি রাষ্ট্রীয়-সরকারি কর্তৃত্ববাদের পক্ষে, না বিপক্ষে? উল্লেখ্য, অধিকাংশ নারীবাদীই এ সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন গণঅভ্যুত্থানের একটি বড় শক্তি হিসেবে। গণঅভ্যুত্থানের একটি বিখ্যাত ছবি আছে। কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে লাঠি হাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিলে বের হচ্ছেন এক হিজাবপরিহিতা (যাকে ইসলামিক চিন্তাধারার প্রতীক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন) এবং এক প্যান্ট-শার্ট পরা (যাকে লিবারেল-মডার্ন চিন্তাধারার প্রতীক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন) তরুণী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাদের পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশি নারীদের অবস্থানকে আরও রাজনৈতিক করেছে।
২০২৪ সালে ‘কোটা পায় কে?’— এই প্রশ্নে উত্তাল হয়েছিল ক্যাম্পাস। কিন্তু আজ প্রশ্ন হচ্ছে, ‘স্বীকৃতি পায় কে?’ দুই বছর পরও নারীদের ত্যাগ রাষ্ট্রীয়ভাবে বা সামাজিকভাবে পূর্ণ মর্যাদা পায়নি। জুলাই কন্যারা সম্মান না পেলেও জায়গা করে নিয়েছে সুবিধাবাদীরা, যারা আন্দোলনের উত্তাল দিনে বাড়িতে হাওয়া খাচ্ছিল। যারা গুলি খেয়েছে, পরিবার-সমাজ-পুলিশি হুমকি সহ্য করেছে, তারা আজ স্মৃতিচ্যুতি ও নিষ্ক্রিয়তার শিকার। এভাবেই নারীদের প্রতিরোধ শুধু রক্তে নয়, স্মৃতিতেও মুছে ফেলা হচ্ছে, যেখানে তাদের ত্যাগ ছিল আন্দোলনের আত্মা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু ‘অংশগ্রহণকারী’ ছিলেন না; তারা ছিলেন এর মূল চালিকাশক্তি। তাদের সাহসিকতা, ত্যাগ, নেতৃত্ব এবং হৃদয় জুড়ে থাকা প্রতিরোধস্পৃহা মিলে গড়ে উঠেছে একটি নতুন প্রজন্ম, যা আর কোনো দিন ভয় পাবে না। জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে এই লেখার মাধ্যমে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাসের কাছে দাবি রাখি— এই দেশ, এই ইতিহাস যেন তাদের নামেও উচ্চারিত হয়। দীর্ঘ জুলাইয়ে ঝরে যাওয়া অসংখ্য নারীর প্রাণ, যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও নারীদের লড়াই এখনো চলমান। রাষ্ট্র সংস্কারসহ নিজেদের অধিকার আদায়ের এই লড়াই প্রতিদিনের।
লেখক: কবি ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন

এটি নিছক আরেকটি কূটনৈতিক ইশতেহার নয়। এটি সম্ভবত মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে একটি প্রকৃত যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলার প্রথম বিশ্বাসযোগ্য প্রয়াস। এমন এক স্থাপনা, যা একদিন কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্বকেও সুরক্ষার ছায়া দিতে পারে।
৩ দিন আগে
বিদ্যুৎ ঘাটতির সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছে দেশের গ্রামাঞ্চল। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং এক নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভ্যাপসা গরম, অন্যদিকে সেচ সংকটে কৃষকের হাহাকার— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
৪ দিন আগে
স্যুটের একাধিক স্তর— মোটা কাপড়, টাই এবং কখনো ওয়েস্টকোট— শরীরের তাপ আটকে রাখে এবং বাতাস চলাচলের সুযোগ কমিয়ে দেয়। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস বা গাড়ির ভেতরে স্যুট পরেন, তাদের হয়তো এই অস্বস্তি অনুভব করতে হয় না। কিন্তু জনসমাগম, সমাবেশ বা মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনের জন্য বাইরে বের হলে এই বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ও
৫ দিন আগে
মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাইরের কোনো শক্তি নয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। সুন্নি-শিয়া বিভাজন, আরব-অনারব বৈরিতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করেছে। তাই কোনো অভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগের আগে প্রয়োজন আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন উন্নয়ন-দর্শন গড়ে তোলা।
৮ দিন আগে