
মো. কাফি খান

রাষ্ট্রের শক্তি কখনো কেবল আইন, প্রশাসন বা সেনাশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত প্রাণস্পন্দন নির্ভর করে মধ্যবিত্তের মানসিক নিরাপত্তা, সামাজিক আত্মবিশ্বাস এবং জীবনের স্থিতিশীলতার ওপর।
যখন মধ্যবিত্ত জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীত থাকে এবং সন্তানদের জন্য সুযোগ সংকুচিত হতে দেখে, তখন রাষ্ট্রের হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে থমকে যেতে থাকে। এই নীরব ও অদৃশ্য অবনতি সমাজে অসাম্য, হতাশা ও অস্থিরতার বীজ বপন করে।
ঢাকা মহানগরীর সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় ৬৫ শতাংশ আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২৫)। মধ্যবিত্তের এই ক্ষয় কেবল ব্যক্তিগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যের অদৃশ্য বিপর্যয়ের সূচনা।
মধ্যবিত্ত হলো ধনী ও দরিদ্রের মাঝখানে থাকা সেই নীরব সেতু, যা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। এটি শুধু আর্থিক ভারসাম্যই রক্ষা করে না, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শিক্ষার সুযোগকে সুসংহত করে। মধ্যবিত্ত সমাজ রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
ইতিহাস প্রমাণ করে, পশ্চিম ইউরোপে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপস্থিতির কারণে রাজনৈতিক সংহতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সুসংগঠন বজায় ছিল (Tocqueville, ১৯৫১)। বিপরীতে, মধ্যবিত্ত দুর্বল হলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দ্রুতই ঝুঁকির মুখে পড়ে। মধ্যবিত্তের শক্ত অবস্থান রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রদান করে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। খাদ্য, ভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যয় বৃদ্ধি তাদের দৈনন্দিন জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা মহানগরীর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় ৬৫ শতাংশ আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। উচ্চমানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সন্তানদের উন্নয়নের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের শিল্প ও বন্দরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী শ্রেণি ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অনেক যুবক বিদেশে কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে স্থানীয় সমাজে মেধা ও অর্থনৈতিক লিকেজ তৈরি হচ্ছে। এ অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক দ্বিখণ্ডন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।
বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায়, মধ্যবিত্ত দুর্বল হলে সমাজ ধনী ও দরিদ্র— এই দুই চরম প্রান্তে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফরাসি বিপ্লবের সময় মধ্যবিত্তের আর্থিক সংকট ও সামাজিক অংশগ্রহণের অভাব সমাজকে তীব্র বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়। জার্মানিতে ১৯২০-এর দশকে মধ্যবিত্তের ক্রমাগত ক্ষয় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিভাজনের জন্ম দেয় (Fischer, ১৯৫২)।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও শহুরে মধ্যবিত্ত ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকার শহরে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় ৭০ শতাংশ আয় দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত ব্যয় তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এর ফলে স্থানীয় সমাজে মেধা ও অর্থনৈতিক লিকেজ তৈরি হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
মধ্যবিত্তের ক্ষয় সমাজকে ধীরে ধীরে দুই ভাগে বিভক্ত করে— অতি ধনী ও অতি দরিদ্র। অসাম্য ও অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেয় হিংসা, অবিশ্বাস ও সামাজিক সংঘাত। রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ ও সমালোচনামূলক চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়।
রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, নৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক শান্তি মধ্যবিত্তের শক্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মধ্যবিত্তের ক্ষয় কেবল সাময়িক আর্থিক বা সামাজিক সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও প্রায় অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ডেকে আনে। শিক্ষা ও গবেষণার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সন্তানদের বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হয় এবং রাষ্ট্র ভবিষ্যতের মেধাবী প্রজন্ম হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে (জাতিসংঘ, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৪)।
অর্থনৈতিকভাবে স্থানীয় বাজারের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্তের ক্রমাগত ক্ষয় ও ঋণগ্রস্ততা ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, কর্মসংস্থানের সংকট বাড়ায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও ক্ষয় গভীর। মধ্যবিত্ত সমাজ রাষ্ট্রের নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই স্তরের দুর্বলতা রাষ্ট্রে নৈতিক অবক্ষয়, অসাম্য বৃদ্ধি এবং সামাজিক দ্বিখণ্ডনের পথ প্রশস্ত করে।
মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও কম গুরুতর নয়। মধ্যবিত্তের ক্ষয় মানে মানসিক চাপ, হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়, সমাজে হতাশা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে।
মধ্যবিত্তের ক্ষয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, মানবসম্পদ এবং সামাজিক শান্তি হারানোর এক অদৃশ্য শূন্যতার সূচনা করে।
রাষ্ট্র যদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, তবে মধ্যবিত্তকে রক্ষা করা অপরিহার্য। এটি শুধু আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; সামাজিক, নৈতিক ও মানসিক সহায়তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাশ্রয়ী আবাসন, মানসম্মত ও সুলভ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যয় হ্রাস এবং ন্যায়সঙ্গত নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে মধ্যবিত্তকে শক্তিশালী করা সম্ভব। সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।
মধ্যবিত্ত রাষ্ট্রের নৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যের মূল স্তম্ভ। একে রক্ষা করা মানে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল, ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ রাখা। মধ্যবিত্তকে শক্তিশালী না করলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যে রাষ্ট্র মধ্যবিত্তকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র নিজের ভবিষ্যৎও রক্ষা করতে পারে না। মধ্যবিত্তের শক্তিই রাষ্ট্রের ভিত্তি, আর তাদের ক্ষয় রাষ্ট্রের অদৃশ্য বিপর্যয়।
লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
[দায় স্বীকার: এই নিবন্ধে উল্লিখিত তথ্য ও বিশ্লেষণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত। এতে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে সমর্থন বা বিরোধিতার উদ্দেশ্য নেই। ব্যবহৃত তথ্য বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক উৎসভিত্তিক।]
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ২০২৫
২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগরী অর্থনৈতিক জরিপ ২০২৫
৩. টোকভিল, আলেক্সিস, প্রাচীন শাসনব্যবস্থা ও বিপ্লব
৪. ফিশার, কনান, জার্মানিতে অর্থনৈতিক পতন ও সামাজিক অস্থিরতা
৫. জাতিসংঘ, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৪

রাষ্ট্রের শক্তি কখনো কেবল আইন, প্রশাসন বা সেনাশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত প্রাণস্পন্দন নির্ভর করে মধ্যবিত্তের মানসিক নিরাপত্তা, সামাজিক আত্মবিশ্বাস এবং জীবনের স্থিতিশীলতার ওপর।
যখন মধ্যবিত্ত জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীত থাকে এবং সন্তানদের জন্য সুযোগ সংকুচিত হতে দেখে, তখন রাষ্ট্রের হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে থমকে যেতে থাকে। এই নীরব ও অদৃশ্য অবনতি সমাজে অসাম্য, হতাশা ও অস্থিরতার বীজ বপন করে।
ঢাকা মহানগরীর সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় ৬৫ শতাংশ আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২৫)। মধ্যবিত্তের এই ক্ষয় কেবল ব্যক্তিগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যের অদৃশ্য বিপর্যয়ের সূচনা।
মধ্যবিত্ত হলো ধনী ও দরিদ্রের মাঝখানে থাকা সেই নীরব সেতু, যা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। এটি শুধু আর্থিক ভারসাম্যই রক্ষা করে না, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শিক্ষার সুযোগকে সুসংহত করে। মধ্যবিত্ত সমাজ রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
ইতিহাস প্রমাণ করে, পশ্চিম ইউরোপে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপস্থিতির কারণে রাজনৈতিক সংহতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সুসংগঠন বজায় ছিল (Tocqueville, ১৯৫১)। বিপরীতে, মধ্যবিত্ত দুর্বল হলে রাষ্ট্রের ভিত্তি দ্রুতই ঝুঁকির মুখে পড়ে। মধ্যবিত্তের শক্ত অবস্থান রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রদান করে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। খাদ্য, ভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যয় বৃদ্ধি তাদের দৈনন্দিন জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা মহানগরীর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় ৬৫ শতাংশ আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। উচ্চমানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সন্তানদের উন্নয়নের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের শিল্প ও বন্দরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী শ্রেণি ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অনেক যুবক বিদেশে কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে স্থানীয় সমাজে মেধা ও অর্থনৈতিক লিকেজ তৈরি হচ্ছে। এ অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক দ্বিখণ্ডন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।
বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায়, মধ্যবিত্ত দুর্বল হলে সমাজ ধনী ও দরিদ্র— এই দুই চরম প্রান্তে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফরাসি বিপ্লবের সময় মধ্যবিত্তের আর্থিক সংকট ও সামাজিক অংশগ্রহণের অভাব সমাজকে তীব্র বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়। জার্মানিতে ১৯২০-এর দশকে মধ্যবিত্তের ক্রমাগত ক্ষয় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিভাজনের জন্ম দেয় (Fischer, ১৯৫২)।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও শহুরে মধ্যবিত্ত ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকার শহরে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় ৭০ শতাংশ আয় দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত ব্যয় তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এর ফলে স্থানীয় সমাজে মেধা ও অর্থনৈতিক লিকেজ তৈরি হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
মধ্যবিত্তের ক্ষয় সমাজকে ধীরে ধীরে দুই ভাগে বিভক্ত করে— অতি ধনী ও অতি দরিদ্র। অসাম্য ও অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেয় হিংসা, অবিশ্বাস ও সামাজিক সংঘাত। রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ ও সমালোচনামূলক চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়।
রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, নৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক শান্তি মধ্যবিত্তের শক্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মধ্যবিত্তের ক্ষয় কেবল সাময়িক আর্থিক বা সামাজিক সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও প্রায় অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ডেকে আনে। শিক্ষা ও গবেষণার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সন্তানদের বিকাশের সুযোগ সংকুচিত হয় এবং রাষ্ট্র ভবিষ্যতের মেধাবী প্রজন্ম হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে (জাতিসংঘ, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৪)।
অর্থনৈতিকভাবে স্থানীয় বাজারের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্তের ক্রমাগত ক্ষয় ও ঋণগ্রস্ততা ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, কর্মসংস্থানের সংকট বাড়ায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও ক্ষয় গভীর। মধ্যবিত্ত সমাজ রাষ্ট্রের নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই স্তরের দুর্বলতা রাষ্ট্রে নৈতিক অবক্ষয়, অসাম্য বৃদ্ধি এবং সামাজিক দ্বিখণ্ডনের পথ প্রশস্ত করে।
মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও কম গুরুতর নয়। মধ্যবিত্তের ক্ষয় মানে মানসিক চাপ, হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়, সমাজে হতাশা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে।
মধ্যবিত্তের ক্ষয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, মানবসম্পদ এবং সামাজিক শান্তি হারানোর এক অদৃশ্য শূন্যতার সূচনা করে।
রাষ্ট্র যদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, তবে মধ্যবিত্তকে রক্ষা করা অপরিহার্য। এটি শুধু আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; সামাজিক, নৈতিক ও মানসিক সহায়তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাশ্রয়ী আবাসন, মানসম্মত ও সুলভ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যয় হ্রাস এবং ন্যায়সঙ্গত নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে মধ্যবিত্তকে শক্তিশালী করা সম্ভব। সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।
মধ্যবিত্ত রাষ্ট্রের নৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যের মূল স্তম্ভ। একে রক্ষা করা মানে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল, ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ রাখা। মধ্যবিত্তকে শক্তিশালী না করলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যে রাষ্ট্র মধ্যবিত্তকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র নিজের ভবিষ্যৎও রক্ষা করতে পারে না। মধ্যবিত্তের শক্তিই রাষ্ট্রের ভিত্তি, আর তাদের ক্ষয় রাষ্ট্রের অদৃশ্য বিপর্যয়।
লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
[দায় স্বীকার: এই নিবন্ধে উল্লিখিত তথ্য ও বিশ্লেষণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত। এতে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে সমর্থন বা বিরোধিতার উদ্দেশ্য নেই। ব্যবহৃত তথ্য বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক উৎসভিত্তিক।]
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ২০২৫
২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগরী অর্থনৈতিক জরিপ ২০২৫
৩. টোকভিল, আলেক্সিস, প্রাচীন শাসনব্যবস্থা ও বিপ্লব
৪. ফিশার, কনান, জার্মানিতে অর্থনৈতিক পতন ও সামাজিক অস্থিরতা
৫. জাতিসংঘ, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২৪

‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ দীর্ঘ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যাতে দেশে বিদ্যমান সক্রিয় প্রায় সব দল সই করেছে। যেহেতু সংবিধান হলো ‘উইল অব দ্য পিপল’ বা জনগণের চরম অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি, তাই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে জনগণের সম্মতি বা গণভোট আয়ো
৮ দিন আগে
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যুক্ত থেকেও নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষায় সচেতন অবস্থান নিয়েছে (European Council on Foreign Relations, ২০২৩)। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা জরুরি।
৮ দিন আগে
এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকেই আসে ‘নতুন বাংলাদেশে’র ধারণা। এটি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার, একটি সামাজিক চুক্তি— যেখানে রাষ্ট্র হবে মানুষের সেবক, প্রভু নয়।
৯ দিন আগে