প্রত্যাশা এখন দায়িত্বশীল রাজনীতি

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক যাত্রার মাধ্যমে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর দেশের জনগণ একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠনের সুযোগ পেয়েছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকের কাছেই একটি ইতিবাচক গণতান্ত্রিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে দুই হাজারেরও বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ভোটার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ফলে দীর্ঘ সময় পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদকে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে। সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সর্বসম্মত। সংসদের সদস্যরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করায় সংসদীয় কার্যক্রমের শুরুতেই একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের শুরুতেই এই ধরনের ঐক্যমতের পরিবেশ ভবিষ্যৎ সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে। সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সর্বসম্মতিক্রমে তাদের নির্বাচন নতুন সংসদের প্রতি জনগণের আস্থাকে আরও দৃঢ় করেছে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি শুভ সূচনা তৈরি করেছে।

এই নতুন সংসদে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর সরকার পরিচালনার সুযোগ পাওয়ায় দলটির সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং দুর্নীতি দমন— এসব বিষয়কে সরকার অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যেমন— বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বৈদেশিক শ্রমবাজার, রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ— এসব ক্ষেত্রেই কার্যকর নীতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে একটি টেকসই উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলার দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সংসদে সরকারের কার্যক্রম কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী হবে, তার ওপরই এই সরকারের সফলতা নির্ভর করবে।

এবারের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই সংসদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার ধারাবাহিকতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিভিন্ন মহলে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উদ্যোগ ও নেতৃত্বকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণভাবে সংসদের কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে নতুন প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশের অনেক নাগরিক মনে করেন, তিনি ভবিষ্যতেও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নেতৃত্ব দেবেন এবং তার পিতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মতো দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন। সংসদের সফল সূচনার জন্য সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকেও নতুন নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারের কর্মকাণ্ডকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তারা সংসদে গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতি করবে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে তারা সরকারের নীতি ও কার্যক্রমের সমালোচনা করে বিকল্প মতামত তুলে ধরবে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গঠনমূলক আলোচনা এবং জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে বিরোধী দল সংসদের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে। একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে সহায়তা করে।

সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ সময় পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। আজ দেশের মানুষ একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, সংবিধানের সুরক্ষা ও কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আশায় নতুন সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই উচিত অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও দায়িত্বশীল ও গণমুখী রাজনীতি করা। সংসদের প্রতিটি সদস্য যদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করেন এবং গঠনমূলক সংসদীয় সংস্কৃতি বজায় রাখেন, তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ইতিবাচক যুগের সূচনা করতে পারে।

লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বৈষম্যের বিলোপে স্লোগান: নারী দিবস শুধুই আনুষ্ঠানিকতা

নারীরা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকেও ছিটকে গিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ধারণীর প্ল্যাটফর্ম থেকেও ছিটকে যাবেন। আর এর বিরূপ প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। নারী নেতৃত্বহীনতার ভারসাম্যহীন অবস্থা পুরুষতান্ত্রিক পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকেও সুষম ও ভারসাম্যহীন করে তুলবে বলে মনে করছেন বোদ্ধা ও বিশ্লেষকরা।

৫ দিন আগে

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা

কেউ কেউ বলেছেন, শেখ মুজিব হেয়ালি পরিহার করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় যদি সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন, তাহলে পাকিস্তানের অপ্রস্তুতির সুযোগ নিয়ে আমরা আরও কম জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত-আব্রুর বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম। কী হতো জানি না, তবে বিতর্ক না বাড়িয়ে অনুমান করা যায়— এটি হতো হঠকারী আচরণের নব সংযোজন এবং তার

৬ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: প্রবাসী শ্রমবাজার সুরক্ষায় কূটনৈতিক প্রস্তুতি জরুরি

এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও বৈদেশিক আয় কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে আঞ্চলিক যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত, ভিসা নবায়নে জটিলতা, প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রত্যাবাসনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে প্র

৬ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ‘সার-বিদ্যুৎ রাজনীতি’: ইতিহাস কি আবার ফিরে আসছে?

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিএনপি ক্ষমতায় আসার সময়গুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বড় যুদ্ধের সময়কাল মিলে গেছে, যার প্রভাব দেশের কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে অনুভূত হয়েছে। ফলে এসব সংকটকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।

৮ দিন আগে