দখলদারির ছাত্র রাজনীতি ও নতুন বাংলাদেশের শঙ্কা

নিজাম উদ্দিন আহমেদ
গত ২১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে একটি গ্রাফিতির নিচে লেখা ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’ বাক্যটি থেকে ‘ছাত্র’ মুছে ‘গুপ্ত’ লিখে দেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ লেখা পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সেদিন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ছবি: সংগৃহীত

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা কোনোভাবেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে নন, কারণ তারা ছাত্রদের নিজেদের স্বার্থে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

নেপালে যখন ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হয়ে গেল, সারা দেশের জনগণ সেটাকে স্বাগত জানিয়েছিল। আমাদের এখানেও এমনটি করতে পারলে সাধারণ মানুষ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাত। কারণ কয়েক শতাংশ ছেলে রাজনীতি করলেও কোটি কোটি সাধারণ শিক্ষার্থী এর ভুক্তভোগী হয়। তারা বাধ্য হয়ে রাজনীতি করে, কিন্তু কোনো আওয়াজ করতে পারে না।

বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একসময়ের মিত্র জামায়াত-শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে যে সংঘাত চলছে, তা কিছুটা একাত্তরের বিভাজন বা আদর্শিক হলেও এর মূল কারণ ‘দখলদারি’। ছাত্র রাজনীতির উপযোগিতা বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে কে কত মাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে টেন্ডারবাজি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতা থেকেই মূলত সংঘাত চলছে। জামায়াত এখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়ার কথা বললেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেছনের সব কাজই করে যাচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকে শক্ত অবস্থানে থাকা ছাত্রশিবির এতদিন লো-প্রোফাইলে থাকলেও এখনকার মারামারি প্রমাণ করে ছাত্র রাজনীতির লক্ষ্যই প্রতিষ্ঠান দখল করা।

এই ছাত্র সংঘাতের সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রকাশ্যে সংঘাত চলছে এবং এ ক্ষেত্রে সরকার গঠন করায় তাদের দায় তুলনামূলক বেশি।

প্রধানমন্ত্রী জুলাই সনদের কথা বারবার বললেও বাস্তবে তাদের কাজগুলো এর পরিপন্থি মনে হয়। সনদে সরকারকে জবাবদিহি করার কথা থাকলেও সেই মেকানিজম বাদ দেওয়া হয়েছে, এমনকি গুম-খুনের সাজা মৃত্যুদণ্ড করার কথা বললেও এ আইনের মধ্যে সেই বিধান রেখে তা সংসদে আনা হয়নি।

অন্যদিকে গভর্নিং পার্টি হিসেবে বিএনপি সিদ্ধান্ত গ্রহণে বরাবরই অত্যন্ত ধীরগতির। খালেদা জিয়া যেভাবে পুলিশের মার খেয়ে, জেলে গিয়ে, অত্যাচারিত হয়ে জনগণের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন, গত ১৫ বছরে বর্তমান নেতৃত্বের মাঝে আমরা ঠিক সেভাবে মাঠে থাকার প্রবণতা দেখিনি।

বিএনপিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও দ্রুত ও দূরদর্শী হতে হবে। তা না হলে ধাক্কা খেয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে কেয়ারটেকার ইস্যু নিয়ে আওয়ামী লীগ যেভাবে সংসদ থেকে বেরিয়ে গেছে, দীর্ঘমেয়াদে জামায়াতও যদি সংসদ থেকে বেরিয়ে যায়, আমি খুব আশ্চর্য হব না।

সংসদ অধিবেশনে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি রামদা-হকিস্টিক নিয়ে যে কলুষিত ছাত্র রাজনীতি বন্ধের কথা বলেছেন, আমি তা পূর্ণ সমর্থন করি। এ নিয়ে গণভোট দিলে দেশের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এর পক্ষে রায় দেবে। তবে এ্যানির এই কথা তার দলের কোনো পর্ষদে আদৌ আলোচনা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে এবং এই বিষয়ে তার দলের ভেতরে শক্ত অবস্থান নেওয়া উচিত।

বাস্তবে ‘নতুন বাংলাদেশে’র যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তার কোনো লক্ষণই নেই। বরং এই দুই দিনের যুদ্ধ প্রমাণ করে, আমরা সেই পুরোনো নোংরা রাজনীতির বৃত্তেই আটকে থাকতে চাই। এনসিপি বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ধাক্কা দিতে না পেরে সেই পুরোনো রাজনীতিরই অংশ হয়ে গেছে। বিরোধী দল হিসেবে তারা যদি দ্রুত জুলাই সনদের মতো জাতীয় দাবিগুলো আদায় করতে না পারে, তবে সমাজে এই সংঘাত কেবলই বাড়বে।

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ছাত্র ইউনিয়ন ও আগামীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম ও বিকাশ একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে— প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা। এই চারটি স্তম্ভ কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক দর্শনেরও প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে তাদের প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি কর্মসূচি সরাসরি

২ দিন আগে

পরীক্ষার হল কি রাজনৈতিক মঞ্চ?

পরীক্ষার কক্ষে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে— মন্ত্রী, এমপি, বিরোধী নেতা কিংবা সাংবাদিক— কেউই এর ব্যতিক্রম নন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো ধরনের প্রদর্শনমূলক কার্যক্রম বা রাজনৈতিক উপস্থিতি এই সংবেদনশীল পরিবেশে অনুমোদন করা উচিত নয়।

৫ দিন আগে

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা আবশ্যক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব দেশের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি অগ্রাধিকারে রাখলে এবং পূর্বের ন্যায় দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা করা যায়।

৫ দিন আগে

একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার সমন্বয় টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি

ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা অপরিহার্য। মানবসম্পদ উন্নয়নে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

৮ দিন আগে