
এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

কেউ আপনার মতের না হলে, ভিন্নমতের বা ভিন্ন দর্শনের হলে তাকে হত্যা করতে হবে কেন? এই হত্যা কি মানবতার পক্ষে? মানবাধিকারের পক্ষে?
অপরাধীর বিচারের জন্য রাষ্ট্র রয়েছে, রয়েছে তার আইন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর, বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘তৌহিদি জনতা’ বা ‘বিক্ষুব্ধ মুসল্লি’ ব্যানারে মব (উত্তেজিত জনতা) বা ‘মব জাস্টিসে’র ঘটনা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এ ব্যানারে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মাজার, এমনকি গণমাধ্যমের ওপর হামলার দৃশ্যও দেখা গেছে।
প্রশ্ন হলো— ‘তৌহিদি জনতা’ আসলে কারা? প্রকৃত অর্থে ‘তৌহিদি জনতা’ বলতে একত্ববাদী জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যা বাংলাদেশে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নয়; বরং কোনো বিশেষ ইস্যুতে বা নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়া বিক্ষুব্ধ মুসলিম গোষ্ঠী বা সাধারণ মানুষের একটি ব্যানারের নাম।
তারা নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে দাবি করে এবং প্রায়ই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মাজার বা নারী তারকাদের অংশগ্রহণে বাধা দেয়। তারা বিভিন্ন স্থানে নারীকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান পণ্ড, মাজারে ভাঙচুর, বিভিন্ন সাধু-সুফিকে হত্যা করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে থানা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মব জাস্টিসের নামে ভাঙচুর বা দাবি আদায়ের চেষ্টা করেছে।
‘তৌহিদি জনতা’ একক সুসংগঠিত দল নয়, বরং ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে কিছু কট্টরপন্থি এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি ‘মব’ বা উগ্রবাদী অ্যাকশন টিম, যা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও শূন্যতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু সময় বন্ধ থাকলেও কুষ্টিয়া অঞ্চলে ভিন্নমতের সুফি শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যা এবং কক্সবাজারে নয়ন সাধুর হত্যাকাণ্ড নতুন করে ‘মব’কে সামনে এনেছে। এগুলো কেবল হত্যাকাণ্ড নয়, মানবতার বিরুদ্ধে নির্মম আঘাত এবং সহনশীলতা ও সহাবস্থানের মূল্যবোধের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ।
কক্সবাজারের খুরুশকুলের সেই পাহাড়ের বুক আজ এক বুক চাপা কান্নায় ভারী হয়ে আছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ নির্জনতাকে চিরে দিয়ে যে নির্মম সত্যটি আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। ধর্মীয় সেবায় নিবেদিত এক প্রাণ, এক শান্ত-সৌম্য মানুষ— নয়ন সাধু। তার জীবন ছিল কেবল শান্তি ও প্রার্থনার চরণে উৎসর্গিত। আজ সেই পাহাড়ের অরণ্য সাক্ষী হয়ে আছে এমন এক বর্বরতার, যা মধ্যযুগীয় বীভৎসতাকেও হার মানায়।
শৈশবের খেলার মাঠ বা মন্দিরের প্রাঙ্গণে নয়, নয়ন সাধুর নিথর দেহটি উদ্ধার করা হলো পাহাড়ের এক নিভৃত কোণ থেকে। অপহরণের পর তাকে যে সীমাহীন যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষত আজ সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাকে নির্যাতন করে গাছে ঝুলিয়ে যে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে, তা কেবল এক ব্যক্তির ওপর নয়, বরং আমাদের পুরো মনুষ্যত্বের গায়ে এক গভীর কলঙ্ক।
নয়ন সাধুর পরিবার ব্যাকুল হয়ে থানায় জিডি করে আশায় বুক বেঁধেছিল— হয়তো তিনি ফিরে আসবেন, হয়তো আবারও সেই পরিচিত হাসিমুখটি দেখা যাবে। তখন কেউ কল্পনাও করেনি, নিয়তি এমন এক বিভীষিকাময় সমাপ্তি লিখে রেখেছে। তারা ফিরে পেলেন এক নিথর দেহ, যা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। যে হাত দুটি আশীর্বাদ ও সেবার জন্য ছিল, সেই হাত দুটি আজ স্থির হয়ে গেছে। একটি ঘর চিরতরে অন্ধকারে ডুবে গেল, এক জোড়া চোখ অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে আজ পাথর হয়ে গেছে।
আমাদের নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ? নয়ন সাধুর এই হত্যাকাণ্ড কোনো গোষ্ঠী বা জাতিগত বিবাদ নয়, স্রেফ মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ। এমন এক শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে এই বর্বরতা আমাদের আধুনিক সমাজের বড় এক ব্যর্থতা। এই নির্মমতার সামনে চুপ থাকা মানে অপরাধীকে নীরবে সমর্থন দেওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমাজে নিষ্ঠুরতা ও নির্দয়তার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং বিবেকবান মানুষের জন্য চরম লজ্জার কারণ। অবলা পশু-পাখির প্রতি যে ধরনের নৃশংস আচরণ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে না। মাজারের পুকুরে জীবন্ত কুকুর কিংবা মুরগি ছুড়ে দিয়ে কুমিরের খাবারের দৃশ্য ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করা বিকৃত চরিত্রের চরম বহির্প্রকাশ।
মানবিক, নৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গুম-খুনের বিচারের দাবিতে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও দ্বিধাবিভক্ত। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। ভিন্নমতের মানুষের প্রাণহরণ কোনো নৈতিক, মানবিক বা ধর্মীয় ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তবু এমন ঘটনার পর কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে, আবার কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মবের মাধ্যমে খুনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে।
এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক মতভেদের ফল নয়, সামাজিক মনোবিজ্ঞানের প্রতিফলন, যেখানে ‘দলগত পক্ষপাত’ (ইনগ্রুপ বায়াস) মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত করে। অথচ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের নৈতিক অবস্থান এবং সেই নীরবতা প্রায়ই অন্যায়কারীর পক্ষেই কাজ করে।
ইসলাম অন্য ধর্মের উপাসনালয় রক্ষার স্পষ্ট নির্দেশ দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আল্লাহ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত আশ্রম, গির্জা, উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ।” (সূরা হজ্জ ২২:৪০)
মহানবী রাসুল (সা.) নাজরানের খ্রিষ্টানদের মসজিদে নববিতে উপাসনার সুযোগ দিয়েছিলেন। বিদায় হজে তিনি বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য হারাম।’ আবার গুজব ছড়ানো প্রসঙ্গে কোরআন বলছে, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যেন অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়।’ (সূরা হুজুরাত ৪৯:৬)
গাউসুল আজম হজরত বড়পির আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বলতেন, ‘যার অন্তরে হিংসা আছে, তার অন্তরে আল্লাহ নেই।’ মব মানে নফসের গোলামি, আধ্যাত্মিকতার মৃত্যু।
কুষ্টিয়া অঞ্চলের সুফি দরবেশ শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যা এবং কক্সবাজারের নয়ন সাধুকে হত্যার ঘটনা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? ভিন্নমতের একজন মানুষকে পিটিয়ে বা পুড়িয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই মতপার্থক্য, বিশ্বাস বা বিরোধের গ্রহণযোগ্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে না। সভ্য সমাজে মতবিরোধ থাকবে, চিন্তার ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু তার সমাধান হতে হবে সংলাপ, যুক্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে। যেখানে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, সেখানে শুধু একটি প্রাণই নিভে যায় না. নিভে যায় সমাজের বিবেক ও মানবতার আলো।
কুষ্টিয়া ও কক্সবাজারের এই ঘটনা আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতাও তুলে ধরে। আমরা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছি, যেখানে গুজব, উসকানি ও অজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে ঘৃণা তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অর্ধসত্য কিংবা মিথ্যা তথ্য অনেক সময় মানুষের যুক্তিবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে মানুষ আর মানুষ থাকে না; পরিণত হয় ক্ষুব্ধ জনতায়, যারা মুহূর্তের আবেগে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেয়।
হামলাকারীরা রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও অস্থিতিশীল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। ফকির লালন, খালেক দেওয়ান, আব্দুল হালিম, রাধারমণ, আরকুম শাহসহ বিভিন্ন ফকির-দরবেশ, পির-মুরশিদের গানে ধর্মতত্ত্বের গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। এ কারণেই মানুষ এতে আকৃষ্ট হয়। এই তত্ত্বগুলোর সঙ্গে কথিত পরকালবাদীদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, বিশেষত যারা ধর্ম বলতে কেবল পরকালকেই বোঝে।
তারা আক্রমণের শুরুতে গাঁজা সেবনের অভিযোগ তোলে কিংবা জমি, আধিপত্য বা দানের বাক্সের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তৈরি করে। আগে এসব বড় কোনো বিষয় ছিল না, তবে এখন এগুলোকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ রাষ্ট্র এখন দুর্বল। মাজার, সুফি বা সাধুদের বিষয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট নীতি নেই— কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ফৌজদারি ব্যবস্থার বাইরে কার্যকর দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত।
ধর্ম মানুষকে শান্তির পথ দেখায়, ধ্বংসের নয়। কাটপিস ভিডিও এবং মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মব তৈরি করা ইসলাম, মানবতা ও রাষ্ট্রীয় আইন— তিন ক্ষেত্রেই হারাম ও শাস্তিযোগ্য। যারা ধর্মের লেবাসকে পুঁজি করে ‘তৌহিদি জনতা’র আড়ালে লুটপাট করছে, তাদের রুখে দিয়ে আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে।
বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ।’ আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু কুষ্টিয়ার সুফি শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যার পর আশ্বস্ত হওয়ার পরিবর্তে হতাশ হচ্ছি।
শামীম আল জাহাঙ্গীরের মৃত্যু ও নয়ন সাধুর হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার থেকেই মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা শুরু করতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে মানুষকে সম্মান করা, ভিন্নমতকে সহ্য করা ও সহানুভূতিশীল হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
‘মব জাস্টিস’ গ্রহণযোগ্য নয় এবং কোনো সমাধানও আনবে না। আইনের মাধ্যমেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে এবং সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এ অবস্থা বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে বহুদলীয়, বহুমতের গণতান্ত্রিক চেতনা ও ‘জুলাই-আগস্ট’ বিপ্লবের অপমৃত্যু ঘটতে বাধ্য।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং জনমনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মব কালচার বা অনুরূপ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে সমাজ থেকে এই অপসংস্কৃতির অভিশাপ দূর করা সম্ভব হবে না।
লেখক: রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
রাজনীতি/টিআর

কেউ আপনার মতের না হলে, ভিন্নমতের বা ভিন্ন দর্শনের হলে তাকে হত্যা করতে হবে কেন? এই হত্যা কি মানবতার পক্ষে? মানবাধিকারের পক্ষে?
অপরাধীর বিচারের জন্য রাষ্ট্র রয়েছে, রয়েছে তার আইন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর, বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘তৌহিদি জনতা’ বা ‘বিক্ষুব্ধ মুসল্লি’ ব্যানারে মব (উত্তেজিত জনতা) বা ‘মব জাস্টিসে’র ঘটনা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এ ব্যানারে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মাজার, এমনকি গণমাধ্যমের ওপর হামলার দৃশ্যও দেখা গেছে।
প্রশ্ন হলো— ‘তৌহিদি জনতা’ আসলে কারা? প্রকৃত অর্থে ‘তৌহিদি জনতা’ বলতে একত্ববাদী জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যা বাংলাদেশে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নয়; বরং কোনো বিশেষ ইস্যুতে বা নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়া বিক্ষুব্ধ মুসলিম গোষ্ঠী বা সাধারণ মানুষের একটি ব্যানারের নাম।
তারা নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে দাবি করে এবং প্রায়ই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মাজার বা নারী তারকাদের অংশগ্রহণে বাধা দেয়। তারা বিভিন্ন স্থানে নারীকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান পণ্ড, মাজারে ভাঙচুর, বিভিন্ন সাধু-সুফিকে হত্যা করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে থানা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মব জাস্টিসের নামে ভাঙচুর বা দাবি আদায়ের চেষ্টা করেছে।
‘তৌহিদি জনতা’ একক সুসংগঠিত দল নয়, বরং ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে কিছু কট্টরপন্থি এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি ‘মব’ বা উগ্রবাদী অ্যাকশন টিম, যা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও শূন্যতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু সময় বন্ধ থাকলেও কুষ্টিয়া অঞ্চলে ভিন্নমতের সুফি শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যা এবং কক্সবাজারে নয়ন সাধুর হত্যাকাণ্ড নতুন করে ‘মব’কে সামনে এনেছে। এগুলো কেবল হত্যাকাণ্ড নয়, মানবতার বিরুদ্ধে নির্মম আঘাত এবং সহনশীলতা ও সহাবস্থানের মূল্যবোধের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ।
কক্সবাজারের খুরুশকুলের সেই পাহাড়ের বুক আজ এক বুক চাপা কান্নায় ভারী হয়ে আছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ নির্জনতাকে চিরে দিয়ে যে নির্মম সত্যটি আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। ধর্মীয় সেবায় নিবেদিত এক প্রাণ, এক শান্ত-সৌম্য মানুষ— নয়ন সাধু। তার জীবন ছিল কেবল শান্তি ও প্রার্থনার চরণে উৎসর্গিত। আজ সেই পাহাড়ের অরণ্য সাক্ষী হয়ে আছে এমন এক বর্বরতার, যা মধ্যযুগীয় বীভৎসতাকেও হার মানায়।
শৈশবের খেলার মাঠ বা মন্দিরের প্রাঙ্গণে নয়, নয়ন সাধুর নিথর দেহটি উদ্ধার করা হলো পাহাড়ের এক নিভৃত কোণ থেকে। অপহরণের পর তাকে যে সীমাহীন যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষত আজ সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাকে নির্যাতন করে গাছে ঝুলিয়ে যে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে, তা কেবল এক ব্যক্তির ওপর নয়, বরং আমাদের পুরো মনুষ্যত্বের গায়ে এক গভীর কলঙ্ক।
নয়ন সাধুর পরিবার ব্যাকুল হয়ে থানায় জিডি করে আশায় বুক বেঁধেছিল— হয়তো তিনি ফিরে আসবেন, হয়তো আবারও সেই পরিচিত হাসিমুখটি দেখা যাবে। তখন কেউ কল্পনাও করেনি, নিয়তি এমন এক বিভীষিকাময় সমাপ্তি লিখে রেখেছে। তারা ফিরে পেলেন এক নিথর দেহ, যা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। যে হাত দুটি আশীর্বাদ ও সেবার জন্য ছিল, সেই হাত দুটি আজ স্থির হয়ে গেছে। একটি ঘর চিরতরে অন্ধকারে ডুবে গেল, এক জোড়া চোখ অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে আজ পাথর হয়ে গেছে।
আমাদের নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ? নয়ন সাধুর এই হত্যাকাণ্ড কোনো গোষ্ঠী বা জাতিগত বিবাদ নয়, স্রেফ মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ। এমন এক শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে এই বর্বরতা আমাদের আধুনিক সমাজের বড় এক ব্যর্থতা। এই নির্মমতার সামনে চুপ থাকা মানে অপরাধীকে নীরবে সমর্থন দেওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমাজে নিষ্ঠুরতা ও নির্দয়তার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং বিবেকবান মানুষের জন্য চরম লজ্জার কারণ। অবলা পশু-পাখির প্রতি যে ধরনের নৃশংস আচরণ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে না। মাজারের পুকুরে জীবন্ত কুকুর কিংবা মুরগি ছুড়ে দিয়ে কুমিরের খাবারের দৃশ্য ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করা বিকৃত চরিত্রের চরম বহির্প্রকাশ।
মানবিক, নৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গুম-খুনের বিচারের দাবিতে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও দ্বিধাবিভক্ত। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। ভিন্নমতের মানুষের প্রাণহরণ কোনো নৈতিক, মানবিক বা ধর্মীয় ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তবু এমন ঘটনার পর কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে, আবার কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মবের মাধ্যমে খুনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে।
এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক মতভেদের ফল নয়, সামাজিক মনোবিজ্ঞানের প্রতিফলন, যেখানে ‘দলগত পক্ষপাত’ (ইনগ্রুপ বায়াস) মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত করে। অথচ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের নৈতিক অবস্থান এবং সেই নীরবতা প্রায়ই অন্যায়কারীর পক্ষেই কাজ করে।
ইসলাম অন্য ধর্মের উপাসনালয় রক্ষার স্পষ্ট নির্দেশ দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আল্লাহ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত আশ্রম, গির্জা, উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ।” (সূরা হজ্জ ২২:৪০)
মহানবী রাসুল (সা.) নাজরানের খ্রিষ্টানদের মসজিদে নববিতে উপাসনার সুযোগ দিয়েছিলেন। বিদায় হজে তিনি বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য হারাম।’ আবার গুজব ছড়ানো প্রসঙ্গে কোরআন বলছে, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যেন অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে না হয়।’ (সূরা হুজুরাত ৪৯:৬)
গাউসুল আজম হজরত বড়পির আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বলতেন, ‘যার অন্তরে হিংসা আছে, তার অন্তরে আল্লাহ নেই।’ মব মানে নফসের গোলামি, আধ্যাত্মিকতার মৃত্যু।
কুষ্টিয়া অঞ্চলের সুফি দরবেশ শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যা এবং কক্সবাজারের নয়ন সাধুকে হত্যার ঘটনা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? ভিন্নমতের একজন মানুষকে পিটিয়ে বা পুড়িয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই মতপার্থক্য, বিশ্বাস বা বিরোধের গ্রহণযোগ্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে না। সভ্য সমাজে মতবিরোধ থাকবে, চিন্তার ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু তার সমাধান হতে হবে সংলাপ, যুক্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে। যেখানে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, সেখানে শুধু একটি প্রাণই নিভে যায় না. নিভে যায় সমাজের বিবেক ও মানবতার আলো।
কুষ্টিয়া ও কক্সবাজারের এই ঘটনা আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতাও তুলে ধরে। আমরা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছি, যেখানে গুজব, উসকানি ও অজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে ঘৃণা তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অর্ধসত্য কিংবা মিথ্যা তথ্য অনেক সময় মানুষের যুক্তিবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে মানুষ আর মানুষ থাকে না; পরিণত হয় ক্ষুব্ধ জনতায়, যারা মুহূর্তের আবেগে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেয়।
হামলাকারীরা রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও অস্থিতিশীল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। ফকির লালন, খালেক দেওয়ান, আব্দুল হালিম, রাধারমণ, আরকুম শাহসহ বিভিন্ন ফকির-দরবেশ, পির-মুরশিদের গানে ধর্মতত্ত্বের গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। এ কারণেই মানুষ এতে আকৃষ্ট হয়। এই তত্ত্বগুলোর সঙ্গে কথিত পরকালবাদীদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, বিশেষত যারা ধর্ম বলতে কেবল পরকালকেই বোঝে।
তারা আক্রমণের শুরুতে গাঁজা সেবনের অভিযোগ তোলে কিংবা জমি, আধিপত্য বা দানের বাক্সের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তৈরি করে। আগে এসব বড় কোনো বিষয় ছিল না, তবে এখন এগুলোকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ রাষ্ট্র এখন দুর্বল। মাজার, সুফি বা সাধুদের বিষয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট নীতি নেই— কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ফৌজদারি ব্যবস্থার বাইরে কার্যকর দিকনির্দেশনা অনুপস্থিত।
ধর্ম মানুষকে শান্তির পথ দেখায়, ধ্বংসের নয়। কাটপিস ভিডিও এবং মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মব তৈরি করা ইসলাম, মানবতা ও রাষ্ট্রীয় আইন— তিন ক্ষেত্রেই হারাম ও শাস্তিযোগ্য। যারা ধর্মের লেবাসকে পুঁজি করে ‘তৌহিদি জনতা’র আড়ালে লুটপাট করছে, তাদের রুখে দিয়ে আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে।
বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ।’ আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু কুষ্টিয়ার সুফি শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যার পর আশ্বস্ত হওয়ার পরিবর্তে হতাশ হচ্ছি।
শামীম আল জাহাঙ্গীরের মৃত্যু ও নয়ন সাধুর হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার থেকেই মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা শুরু করতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে মানুষকে সম্মান করা, ভিন্নমতকে সহ্য করা ও সহানুভূতিশীল হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
‘মব জাস্টিস’ গ্রহণযোগ্য নয় এবং কোনো সমাধানও আনবে না। আইনের মাধ্যমেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে এবং সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এ অবস্থা বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে বহুদলীয়, বহুমতের গণতান্ত্রিক চেতনা ও ‘জুলাই-আগস্ট’ বিপ্লবের অপমৃত্যু ঘটতে বাধ্য।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং জনমনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মব কালচার বা অনুরূপ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে সমাজ থেকে এই অপসংস্কৃতির অভিশাপ দূর করা সম্ভব হবে না।
লেখক: রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
রাজনীতি/টিআর

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব দেশের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি অগ্রাধিকারে রাখলে এবং পূর্বের ন্যায় দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা করা যায়।
৪ দিন আগে
ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা অপরিহার্য। মানবসম্পদ উন্নয়নে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।
৭ দিন আগে
এ বছর ধর্মমন্ত্রীকে সরাসরি মাঠে গিয়ে হজযাত্রীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া তিনি হজযাত্রা ও এর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। এসবের মাধ্যমে যেসব বাস্তব সমস্যা খুঁজে পাচ্ছেন, দ্রুত সেগুলো সমাধানেরও উদ্যোগ নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার একটি
১০ দিন আগে
স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ— রাষ্ট্রের এই মৌলিক স্তম্ভগুলোও আজ কথিত চেতনার বলি হয়ে পড়েছে। জনগণের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয় প্রচুর, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে মনে হয়, সবাই শুধু ‘কমিটি গঠন’ পর্যায়েই দক্ষ।
১১ দিন আগে