হজে প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি ও আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা

জাকির আহমদ খান কামাল

পবিত্র হজ মুসলমানের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বছরের পর বছর সঞ্চয়, দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং অসীম আবেগ নিয়ে মানুষ এই মহান ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কা ও মদিনার পথে যাত্রা করেন। আমিও এ বছর সস্ত্রীক একটি বেসরকারি হজ এজেন্সির মাধ্যমে হজ পালনের সৌভাগ্য অর্জন করেছি। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে হজের সকল ফরজ ও ওয়াজিব যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হলেও পুরো সফর জুড়ে কিছু ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ ভোগান্তির মুখে ফেলেছে।

হজ প্যাকেজে মক্কা ও মদিনায় হারাম শরিফ এবং মসজিদে নববী থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ মিটারের মধ্যে আবাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মদিনায় আমাদের রাখা হয় মসজিদে নববী থেকে দুই কিলোমিটারেরও বেশি দূরে। প্রচণ্ড গরমে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে যাতায়াত করতে গিয়ে অনেক হাজি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশেষ করে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। কারও কারও পায়ে ফোসকা পর্যন্ত পড়ে যায়।

খাবারের ক্ষেত্রেও প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। খাবারের মান ও পরিমাণ অনেকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। যারা স্বল্প আহার করেন, তাদের জন্য বিষয়টি হয়তো বড় সমস্যা ছিল না; কিন্তু অধিকাংশ হাজির জন্য এটি ছিল অসন্তোষের কারণ। অতিরিক্ত সামান্য খাবারের অনুরোধেও অনেক সময় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়েছে। খাবার পরিবেশনকারীদের কারও কারও আচরণ এমন ছিল যেন হাজিরা সেবাগ্রহীতা নন, বরং তাদের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল।

মিনায় অবস্থানকালে প্রায় ২২০ জন হাজির জন্য খাবারের প্লেট ছিল মাত্র ৫০টি। ফলে অনেককে অপেক্ষা করতে হয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবেই অসন্তোষের জন্ম দেয়। অথচ সামান্য পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এ সমস্যার সহজ সমাধান সম্ভব ছিল।

আরও উদ্বেগজনক ছিল কিছু ক্ষেত্রে নারী হাজিদের প্রতি অমার্জিত ভাষার ব্যবহার। আরাফার ময়দানে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত পর্দার ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে অভিযোগ বা প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের প্রতি যে ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে, তা অনেকের কাছেই আপত্তিকর বলে মনে হয়েছে। হজের মতো আধ্যাত্মিক পরিবেশে সেবাদানকারীদের কাছ থেকে আরও সহনশীল ও সম্মানজনক আচরণ প্রত্যাশিত।

আমাদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত ধর্মীয় গাইড নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করলেও অনেক সময় হাজিদের মতামত বা বাস্তব সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি বলে অনুভূত হয়েছে। মতভেদ বা সমালোচনাকে অনেক ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা খোলামেলা আলোচনা ও সমস্যা সমাধানের পরিবেশকে সীমিত করেছে।

হজ কষ্টের নাম— এ কথা সত্য। কিন্তু সেই কষ্ট হওয়া উচিত ইবাদতের স্বাভাবিক অংশ, অব্যবস্থাপনা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফল নয়। হজযাত্রীদের আর্থিক সামর্থ্য, সময় এবং জীবনের স্বপ্নের সঙ্গে এই সফর জড়িত। তাই হজ এজেন্সিগুলোর উচিত প্যাকেজে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা এবং সেবার মান উন্নয়নে আন্তরিক হওয়া। এটি অনেকেই করছেন না, যা দুঃখজনক। কারণ একজন হাজির সন্তুষ্টি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম নয়, বরং একটি পবিত্র আমানতের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণেরও প্রশ্ন।

লেখক: কলামিস্ট ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

৯ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

৯ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১০ দিন আগে

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নয়, দুর্নীতি কমাতে হবে

গত ২৫ বছরের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও অনৈতিক। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে জনগণের ত্রাহি অবস্থা। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত জনগণের কাঁধে বোঝার ওপর শাকের আঁটি বলেই মনে করছে সাধারণ মানুষ।

১০ দিন আগে