
মো. হাসান আলী রেজা দোজা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সফরের আগেই চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন (এনডিআরসি) বাংলাদেশের জন্য ২৩টি সহযোগিতা খাত চিহ্নিত করে যে প্রস্তাবনা দিয়েছে, তা নিছক অর্থনৈতিক সহযোগিতার নথি নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক শক্তি-সমীকরণের একটি কৌশলগত রূপরেখা।
গত এক দশকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে আটলান্টিক অঞ্চল থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরে এসেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি হলো চীন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এখন আর শুধু সড়ক, সেতু, বন্দর কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প নয়; এটি বাণিজ্য, প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিকে ঘিরে একটি বিস্তৃত বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের প্রভাব আজ দৃশ্যমান বাস্তবতা। ইন্দোনেশিয়ার দ্রুতগতির রেল প্রকল্প, লাওস-চীন রেল সংযোগ, কম্বোডিয়ার বন্দর উন্নয়ন, মিয়ানমারের অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা মালয়েশিয়ার অবকাঠামোগত বিনিয়োগ কর্মসূচি দেখলে বোঝা যায়, বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উপস্থিতিকে কৌশলগত প্রভাবের ভিত্তিতে রূপান্তর করতে সফল হয়েছে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এখন চীন।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রও দ্রুত বদলাচ্ছে। পাকিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি), নেপালে যোগাযোগ অবকাঠামো, শ্রীলঙ্কায় বন্দর উন্নয়ন এবং মালদ্বীপে বিনিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে চীন এই অঞ্চলেও গভীর অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এমন এক নতুন বাস্তবতার জন্ম হয়েছে, যেখানে চীন আর বাইরের কোনো শক্তি নয়; বরং আঞ্চলিক উন্নয়ন ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রভাবশালী অংশীদার।
এই পরিবর্তনের ফলে ভারতের ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয়ও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ভারত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এখন আর এককভাবে কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করতে আগ্রহী নয়। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, এমনকি বাংলাদেশও বহুমাত্রিক কূটনীতির পথে হাঁটছে। তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
এটি ভারতের সম্পূর্ণ পিছু হটা নয়, বরং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর আত্মবিশ্বাস ও কৌশলগত স্বাধীনতার প্রকাশ। তবে এটাও সত্য যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বৃহৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে চীনের প্রতিযোগী খুব কম।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইসলামাবাদ বেইজিংয়ের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে। সিপিইসি শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি পাকিস্তানের অন্যতম সফল কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির কৌশলগত অনুসারী নয়; বরং নিজস্ব স্বার্থকে কেন্দ্র করে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল জনশক্তি, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সম্ভাবনা বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ ভবিষ্যতের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
এ কারণেই চীন বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী। একই কারণে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দক্ষ কূটনীতি প্রয়োগ করতে পারলে প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক আগ্রহকে জাতীয় উন্নয়নের সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।
চীনের প্রস্তাবিত ২৩টি সহযোগিতা খাতের গুরুত্ব এখানেই। এগুলো শুধু প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গবেষণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষির আধুনিকায়নের মতো ক্ষেত্র আগামী কয়েক দশকের উন্নয়ন নির্ধারণ করবে। যদি বাংলাদেশ এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে উন্নয়নের নতুন এক ধাপে প্রবেশ করা সম্ভব হবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সতর্কতার প্রয়োজনও কম নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরআই প্রকল্প নিয়ে ঋণনির্ভরতা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে বাংলাদেশকে আবেগ নয়, বরং বাস্তবতার ভিত্তিতে প্রতিটি প্রস্তাব মূল্যায়ন করতে হবে। কোন প্রকল্প জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সংযোজন করবে, কোনটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং কোনটি কেবল ঋণের বোঝা বাড়াবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ অপরিহার্য।
কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস আমাদের শেখায়, স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই; স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে, তেমনি প্রতিটি সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর সেই অর্থে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তর, আঞ্চলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাব্য সূচনা। বিচক্ষণ কূটনীতি, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যদি এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বিআরআইয়ের নতুন অধ্যায় শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের নতুন ভিত্তি রচনা করতে সক্ষম হবে।
লেখক: উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সফরের আগেই চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন (এনডিআরসি) বাংলাদেশের জন্য ২৩টি সহযোগিতা খাত চিহ্নিত করে যে প্রস্তাবনা দিয়েছে, তা নিছক অর্থনৈতিক সহযোগিতার নথি নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক শক্তি-সমীকরণের একটি কৌশলগত রূপরেখা।
গত এক দশকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে আটলান্টিক অঞ্চল থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরে এসেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি হলো চীন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এখন আর শুধু সড়ক, সেতু, বন্দর কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প নয়; এটি বাণিজ্য, প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিকে ঘিরে একটি বিস্তৃত বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের প্রভাব আজ দৃশ্যমান বাস্তবতা। ইন্দোনেশিয়ার দ্রুতগতির রেল প্রকল্প, লাওস-চীন রেল সংযোগ, কম্বোডিয়ার বন্দর উন্নয়ন, মিয়ানমারের অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা মালয়েশিয়ার অবকাঠামোগত বিনিয়োগ কর্মসূচি দেখলে বোঝা যায়, বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উপস্থিতিকে কৌশলগত প্রভাবের ভিত্তিতে রূপান্তর করতে সফল হয়েছে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এখন চীন।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রও দ্রুত বদলাচ্ছে। পাকিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি), নেপালে যোগাযোগ অবকাঠামো, শ্রীলঙ্কায় বন্দর উন্নয়ন এবং মালদ্বীপে বিনিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে চীন এই অঞ্চলেও গভীর অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এমন এক নতুন বাস্তবতার জন্ম হয়েছে, যেখানে চীন আর বাইরের কোনো শক্তি নয়; বরং আঞ্চলিক উন্নয়ন ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রভাবশালী অংশীদার।
এই পরিবর্তনের ফলে ভারতের ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয়ও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ভারত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এখন আর এককভাবে কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করতে আগ্রহী নয়। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, এমনকি বাংলাদেশও বহুমাত্রিক কূটনীতির পথে হাঁটছে। তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
এটি ভারতের সম্পূর্ণ পিছু হটা নয়, বরং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর আত্মবিশ্বাস ও কৌশলগত স্বাধীনতার প্রকাশ। তবে এটাও সত্য যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বৃহৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে চীনের প্রতিযোগী খুব কম।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইসলামাবাদ বেইজিংয়ের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে। সিপিইসি শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি পাকিস্তানের অন্যতম সফল কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ শক্তির কৌশলগত অনুসারী নয়; বরং নিজস্ব স্বার্থকে কেন্দ্র করে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল জনশক্তি, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সম্ভাবনা বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ ভবিষ্যতের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
এ কারণেই চীন বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী। একই কারণে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দক্ষ কূটনীতি প্রয়োগ করতে পারলে প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক আগ্রহকে জাতীয় উন্নয়নের সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।
চীনের প্রস্তাবিত ২৩টি সহযোগিতা খাতের গুরুত্ব এখানেই। এগুলো শুধু প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গবেষণা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষির আধুনিকায়নের মতো ক্ষেত্র আগামী কয়েক দশকের উন্নয়ন নির্ধারণ করবে। যদি বাংলাদেশ এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে উন্নয়নের নতুন এক ধাপে প্রবেশ করা সম্ভব হবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সতর্কতার প্রয়োজনও কম নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরআই প্রকল্প নিয়ে ঋণনির্ভরতা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে বাংলাদেশকে আবেগ নয়, বরং বাস্তবতার ভিত্তিতে প্রতিটি প্রস্তাব মূল্যায়ন করতে হবে। কোন প্রকল্প জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সংযোজন করবে, কোনটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং কোনটি কেবল ঋণের বোঝা বাড়াবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ অপরিহার্য।
কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস আমাদের শেখায়, স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই; স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে, তেমনি প্রতিটি সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর সেই অর্থে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তর, আঞ্চলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাব্য সূচনা। বিচক্ষণ কূটনীতি, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যদি এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বিআরআইয়ের নতুন অধ্যায় শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের নতুন ভিত্তি রচনা করতে সক্ষম হবে।
লেখক: উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

বিশ্ব জুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোল্ট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বি
৪ দিন আগে
দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্দোলনের সূচনা, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভের কারণে ভারতের চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে অনেকেই ‘জুলাইয়ের আবহ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
৬ দিন আগে
আজ তার মহাপ্রয়াণ দিবসে আমরা কেবল একজন লেখককে স্মরণ করছি না, আমরা স্মরণ করছি এমন এক আলোকবর্তিকাকে, যিনি বাংলা সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন— সহজ ভাষাও গভীর হতে পারে, নীরবতাও অনেক কথা বলতে পারে, আর ছোট ছোট সুখ-দুঃখও সাহিত্যের মহৎ বিষয় হতে পারে।
৭ দিন আগে
ছোটবেলা থেকেই জাম্বুরা দিয়ে কিংবা খড়ের বল বানিয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেছি এবং তা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে গেছি অনার্স পরীক্ষার প্রায় তিন মাস আগ পর্যন্ত। ফুটবল ছাড়া ক্রিকেট, হকি ও দৌড় প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব প্রদর্শন না করতে পারলেও পাকিস্তান অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম।
৯ দিন আগে