
এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে গণদাবি উপেক্ষা করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করেছে সরকার। এবার বৃদ্ধির পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৫ বছরের সর্বোচ্চ এ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও অনৈতিক। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে জনগণের ত্রাহি অবস্থা। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত জনগণের কাঁধে বোঝার ওপর শাকের আঁটি বলেই মনে করছে সাধারণ মানুষ।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। ২৫ বছরে এবারই একবারে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হলো। এমন বাস্তবতায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে অন্তত ৬০ শতাংশ। এটা যাবে সাধারণ আয়ের মানুষের পকেট থেকে। দেশে সীমিত ও সাধারণ আয়ের মানুষই বেশি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কেন এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিল, তা দেশবাসীর বোধগম্য নয়।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের নেওয়া সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক, অন্যায্য ও গণবিরোধী বলেই দেশবাসী মনে করেন। মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াও অন্য কোনোভাবে বিদ্যুতের লোকসান কমানোর লক্ষ্যেই সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। জ্বালানি তেলের পর বিদ্যুতের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি করাটা জনস্বার্থবিরোধী। আবাসিক, বাণিজ্যিক, কৃষি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিল্পসহ সব ধরনের গ্রাহকের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের ফলাফল উৎপাদন, বিপণন থেকে শুরু করে জনজীবনের সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে। দেশের বিদ্যুৎ খাতের ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর ধারাবাহিকতা পূর্বের মতো এখনো চলছে!
যুগ যুগ ধরে বিদ্যুৎ খাতের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ফল ভোগ করছেন ভোক্তাসাধারণ। ভোক্তাদের পকেট কেটেই এ খাতের লোকসান মেটানো হয়েছে। ভোক্তা বিদ্যুৎ ব্যবহার করুক বা না করুক, মাস গেলে নানা ধরনের বিল পরিশোধ করতেই হয়। এবারও গণশুনানিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। কিন্তু গণদাবিকে সরকার আমলে নেয়নি। বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটের সহযোগী ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি আবারও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেশ করে। কোম্পানিগুলোর খুচরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির অন্যায্য প্রস্তাব কর্তৃপক্ষ আমলে নিয়ে মূল্য বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মেনে নেওয়া যেত যদি এ খাতে সরকার অপচয় ও দুর্নীতি রোধের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর নজির তৈরি করতে পারত। কিন্তু তা না করে তারা দাম বাড়ানোর পুরোনো চক্রই বজায় রেখে চলেছে। ছয়টি কোম্পানির মামাবাড়ির আবদার পূরণের লক্ষণ দেখে সংবাদমাধ্যমগুলো যখন সোচ্চার, তখনও দেখা যাচ্ছে, এসব আবেদন-নিবেদন ও সমালোচনা ‘কুম্ভকর্ণ’দের কর্ণে প্রবেশ করে না।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এক সংবাদ সম্মেলনে মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা প্রদান করে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সরকার ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পেলেও কমিশন সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি চলতি মাস থেকেই কার্যকর হবে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে জনজীবনে বাড়তি চাপের বিপরীতে সরকারের অতিরিক্ত আয় হবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এতে বিদ্যুতের ৫৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি নেমে দাঁড়াবে ৪১ হাজার কোটিতে। ঘোষণা অনুসারে, দিনে শুধু প্রয়োজনীয় সময়ে একটি লাইট-ফ্যান ব্যবহারকারী গ্রাহককেও আগামী মাসে ৪০ টাকার মতো বেশি বিল পরিশোধ করতে হবে। বাসাবাড়ির অন্য গ্রাহকের খরচ ব্যবহার অনুযায়ী মাসে ৭০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকের খরচ আরও বেশি বৃদ্ধি পাবে।
গ্রাহক পর্যায়ে গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে এক টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়েছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে সাত টাকা থেকে এক টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে আট টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। শতকরা বেড়েছে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। পাশাপাশি কৃষিতে ১৫ শতাংশ; স্কুল, মসজিদ, মন্দির ও হাসপাতালে প্রায় ২০ শতাংশ এবং শিল্পে ১৮-১৯ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে সরাসরি বিদ্যুৎ বিল যা বাড়বে, তার চেয়েও বড় প্রভাব পড়বে পরোক্ষ ব্যয়ে। উৎপাদন ও সেবা খাতে বিদ্যুৎ বিল বাড়ায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, বৃদ্ধি পাবে মূল্যস্ফীতি।
যদিও বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হবে না। কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠলে সরকার ওই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। সরকার জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারল না, নাকি প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার জন্যই সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল? দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনের মধ্যেই লাইনের গ্যাস ছাড়া সব ধরনের জ্বালানির কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। এপ্রিলে এলপিজি, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। এবার বিদ্যুতের দামও রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনগণের জন্য তা কতটা বোঝা হবে, তা কি ভেবে দেখেছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা?
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মনে করে, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি, সিস্টেম লস এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলোর কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেগুলো বন্ধের দাবি করা হলেও, এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো। এর প্রভাব সবখানেই পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ বিষয়ে বলছেন, বাজেটের আগে তড়িঘড়ি করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছাচারী। বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বাজারে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তাঁর এই বক্তব্যের পর জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে— আসলে সরকারি চেয়ারে গেলেই কি মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়, নাকি তারা সরকারি চেয়ারে বসলে অতীতের সব বক্তব্য ভুলে গিয়ে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে আনন্দ পায়? দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সরকারি ক্ষমতার চেয়ারে বসলে এরা জনগণকে বোকা মনে করে। প্রায় সকলেই সরকারে যাওয়ার আগের সকল বক্তব্য ভুলে গিয়ে জনবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে বৈদেশিক শক্তির তল্পিবাহকে পরিণত হয়। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা জনগণকে নয়, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ দাতা গোষ্ঠীকে পদলেহনের মাধ্যমে খুশি করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তাদের চেহারা ও বক্তব্য আর ক্ষমতায় যাওয়ার পরে তাদের অবস্থান জনগণকে চপেটাঘাত করে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির দুটি দিক— একটি হলো মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কী হবে? দ্বিতীয়টি হলো এটির বিকল্প কী ছিল?
মূল্যবৃদ্ধির ফলে কী হবে?
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবন ও অর্থনীতিতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং শিল্প ও কৃষিতে উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়। স্বাভাবিক পরিবারের বিদ্যুৎ বিল বাড়ার পাশাপাশি এর ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা পরোক্ষ প্রভাবে বাজারে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কারখানাগুলোতে পণ্য উৎপাদনের খরচ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে। সেচ পাম্পের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে খরচ বৃদ্ধি পায়। যার ফলে সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষকে বাড়তি মূল্যে সেবা গ্রহণ করতে হয়।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি না করে বিকল্প কী করা যেত?
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি না করে বিকল্প অনেক পথই রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন। সেগুলো বিবেচনায় নিলে আপাতত গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি না করলেও চলত, অথবা একান্ত বৃদ্ধি করলেও তা রাখা যেত সহনশীল পর্যায়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ হলো এ খাতে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। বিগত সরকারের আমলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমিয়ে আনায়ও মনোযোগ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রাথমিক জ্বালানির স্থানীয় উৎসগুলোকে কাজে লাগাতে না পারা এবং নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগে অনীহার কারণেও খাতটিতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এড়াতে যে বিকল্প কৌশলগুলো গ্রহণ করা যেত, তা হলো— অব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে যে বিশাল পরিমাণ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হয়, তা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করা। সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ত্রুটি এবং দুর্নীতি রোধ করে সিস্টেম লস কমালে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাশ্রয় হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধান হিসেবে সোলার প্যানেল বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা। ধনী ও সচ্ছল গ্রাহকদের ভর্তুকি প্রত্যাহার করে শুধুমাত্র প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত ও কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা।
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছার উপক্রম হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধি যুক্ত হয়ে জনগণের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দেবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে সংসার পরিচালনা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে এসে জনবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনা দূর করে জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন খরচ এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে সকল পণ্য ও সেবার মূল্যের ওপর। ফলে সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একেবারে মূল্যবৃদ্ধি না করে কোনো উপায় যেমন সরকারের নেই, তেমনি আবার মূল্যবৃদ্ধি করেই ভর্তুকি সমন্বয় করাও সম্ভব নয়। অতীতে দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি করেও ঘাটতি পূরণ হয়নি। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। তবে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং অদক্ষ ও ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার কমিয়ে আনলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। তা ছাড়া সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বন এবং সিস্টেম লস কমিয়ে আনাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নিলে বিদ্যুতের দাম এত বেশি বৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল না।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মুনাফা নয়, লোকসান নয়— এটাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের নীতি। তাই সরকারি কোম্পানির মুনাফা করার কথা নয়। সরকারি কোম্পানি সেবার জন্য তৈরি, অথচ তারা মুনাফা করছে। আবার শ্রম আইনের দোহাই দিয়ে সেই মুনাফা ভাগ করে নিচ্ছে। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোতে বেতন সরকারি বেতন স্কেলের চেয়ে দেড়গুণ বেশি। এরপরও মুনাফার নামে শত শত কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আর তার দায় চাপছে জনগণের ওপর। অথচ এ বাড়তি ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর না চাপিয়ে বিতরণ সংস্থাগুলোর মুনাফা থেকে যতটা সম্ভব সমন্বয় করা যেত।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী প্রস্তাব বাতিল এবং অপচয়, সিস্টেম লস ও লুটপাট-দুর্নীতি বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করে অবিলম্বে গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের পদক্ষেপ জনমনে আশার সঞ্চার করতে পারে।
লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে গণদাবি উপেক্ষা করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করেছে সরকার। এবার বৃদ্ধির পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৫ বছরের সর্বোচ্চ এ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও অনৈতিক। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে জনগণের ত্রাহি অবস্থা। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত জনগণের কাঁধে বোঝার ওপর শাকের আঁটি বলেই মনে করছে সাধারণ মানুষ।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। ২৫ বছরে এবারই একবারে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হলো। এমন বাস্তবতায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে অন্তত ৬০ শতাংশ। এটা যাবে সাধারণ আয়ের মানুষের পকেট থেকে। দেশে সীমিত ও সাধারণ আয়ের মানুষই বেশি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কেন এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিল, তা দেশবাসীর বোধগম্য নয়।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের নেওয়া সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক, অন্যায্য ও গণবিরোধী বলেই দেশবাসী মনে করেন। মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াও অন্য কোনোভাবে বিদ্যুতের লোকসান কমানোর লক্ষ্যেই সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। জ্বালানি তেলের পর বিদ্যুতের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি করাটা জনস্বার্থবিরোধী। আবাসিক, বাণিজ্যিক, কৃষি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিল্পসহ সব ধরনের গ্রাহকের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের ফলাফল উৎপাদন, বিপণন থেকে শুরু করে জনজীবনের সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে। দেশের বিদ্যুৎ খাতের ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর ধারাবাহিকতা পূর্বের মতো এখনো চলছে!
যুগ যুগ ধরে বিদ্যুৎ খাতের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ফল ভোগ করছেন ভোক্তাসাধারণ। ভোক্তাদের পকেট কেটেই এ খাতের লোকসান মেটানো হয়েছে। ভোক্তা বিদ্যুৎ ব্যবহার করুক বা না করুক, মাস গেলে নানা ধরনের বিল পরিশোধ করতেই হয়। এবারও গণশুনানিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। কিন্তু গণদাবিকে সরকার আমলে নেয়নি। বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটের সহযোগী ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি আবারও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেশ করে। কোম্পানিগুলোর খুচরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির অন্যায্য প্রস্তাব কর্তৃপক্ষ আমলে নিয়ে মূল্য বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মেনে নেওয়া যেত যদি এ খাতে সরকার অপচয় ও দুর্নীতি রোধের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর নজির তৈরি করতে পারত। কিন্তু তা না করে তারা দাম বাড়ানোর পুরোনো চক্রই বজায় রেখে চলেছে। ছয়টি কোম্পানির মামাবাড়ির আবদার পূরণের লক্ষণ দেখে সংবাদমাধ্যমগুলো যখন সোচ্চার, তখনও দেখা যাচ্ছে, এসব আবেদন-নিবেদন ও সমালোচনা ‘কুম্ভকর্ণ’দের কর্ণে প্রবেশ করে না।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এক সংবাদ সম্মেলনে মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা প্রদান করে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সরকার ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পেলেও কমিশন সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি চলতি মাস থেকেই কার্যকর হবে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে জনজীবনে বাড়তি চাপের বিপরীতে সরকারের অতিরিক্ত আয় হবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এতে বিদ্যুতের ৫৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি নেমে দাঁড়াবে ৪১ হাজার কোটিতে। ঘোষণা অনুসারে, দিনে শুধু প্রয়োজনীয় সময়ে একটি লাইট-ফ্যান ব্যবহারকারী গ্রাহককেও আগামী মাসে ৪০ টাকার মতো বেশি বিল পরিশোধ করতে হবে। বাসাবাড়ির অন্য গ্রাহকের খরচ ব্যবহার অনুযায়ী মাসে ৭০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকের খরচ আরও বেশি বৃদ্ধি পাবে।
গ্রাহক পর্যায়ে গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে এক টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়েছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে সাত টাকা থেকে এক টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে আট টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। শতকরা বেড়েছে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। পাশাপাশি কৃষিতে ১৫ শতাংশ; স্কুল, মসজিদ, মন্দির ও হাসপাতালে প্রায় ২০ শতাংশ এবং শিল্পে ১৮-১৯ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে সরাসরি বিদ্যুৎ বিল যা বাড়বে, তার চেয়েও বড় প্রভাব পড়বে পরোক্ষ ব্যয়ে। উৎপাদন ও সেবা খাতে বিদ্যুৎ বিল বাড়ায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, বৃদ্ধি পাবে মূল্যস্ফীতি।
যদিও বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হবে না। কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠলে সরকার ওই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। সরকার জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারল না, নাকি প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার জন্যই সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল? দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনের মধ্যেই লাইনের গ্যাস ছাড়া সব ধরনের জ্বালানির কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। এপ্রিলে এলপিজি, ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়। এবার বিদ্যুতের দামও রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনগণের জন্য তা কতটা বোঝা হবে, তা কি ভেবে দেখেছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা?
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মনে করে, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি, সিস্টেম লস এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলোর কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেগুলো বন্ধের দাবি করা হলেও, এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো। এর প্রভাব সবখানেই পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ বিষয়ে বলছেন, বাজেটের আগে তড়িঘড়ি করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছাচারী। বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বাজারে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তাঁর এই বক্তব্যের পর জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে— আসলে সরকারি চেয়ারে গেলেই কি মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়, নাকি তারা সরকারি চেয়ারে বসলে অতীতের সব বক্তব্য ভুলে গিয়ে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে আনন্দ পায়? দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সরকারি ক্ষমতার চেয়ারে বসলে এরা জনগণকে বোকা মনে করে। প্রায় সকলেই সরকারে যাওয়ার আগের সকল বক্তব্য ভুলে গিয়ে জনবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে বৈদেশিক শক্তির তল্পিবাহকে পরিণত হয়। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা জনগণকে নয়, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ দাতা গোষ্ঠীকে পদলেহনের মাধ্যমে খুশি করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তাদের চেহারা ও বক্তব্য আর ক্ষমতায় যাওয়ার পরে তাদের অবস্থান জনগণকে চপেটাঘাত করে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির দুটি দিক— একটি হলো মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কী হবে? দ্বিতীয়টি হলো এটির বিকল্প কী ছিল?
মূল্যবৃদ্ধির ফলে কী হবে?
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবন ও অর্থনীতিতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে এবং শিল্প ও কৃষিতে উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়। স্বাভাবিক পরিবারের বিদ্যুৎ বিল বাড়ার পাশাপাশি এর ‘ডমিনো ইফেক্ট’ বা পরোক্ষ প্রভাবে বাজারে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কারখানাগুলোতে পণ্য উৎপাদনের খরচ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে। সেচ পাম্পের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে খরচ বৃদ্ধি পায়। যার ফলে সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষকে বাড়তি মূল্যে সেবা গ্রহণ করতে হয়।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি না করে বিকল্প কী করা যেত?
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি না করে বিকল্প অনেক পথই রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন। সেগুলো বিবেচনায় নিলে আপাতত গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি না করলেও চলত, অথবা একান্ত বৃদ্ধি করলেও তা রাখা যেত সহনশীল পর্যায়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ হলো এ খাতে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। বিগত সরকারের আমলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমিয়ে আনায়ও মনোযোগ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রাথমিক জ্বালানির স্থানীয় উৎসগুলোকে কাজে লাগাতে না পারা এবং নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগে অনীহার কারণেও খাতটিতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এড়াতে যে বিকল্প কৌশলগুলো গ্রহণ করা যেত, তা হলো— অব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে যে বিশাল পরিমাণ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হয়, তা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করা। সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ত্রুটি এবং দুর্নীতি রোধ করে সিস্টেম লস কমালে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাশ্রয় হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধান হিসেবে সোলার প্যানেল বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা। ধনী ও সচ্ছল গ্রাহকদের ভর্তুকি প্রত্যাহার করে শুধুমাত্র প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত ও কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা।
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছার উপক্রম হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধি যুক্ত হয়ে জনগণের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দেবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে সংসার পরিচালনা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে এসে জনবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও অব্যবস্থাপনা দূর করে জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন খরচ এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে সকল পণ্য ও সেবার মূল্যের ওপর। ফলে সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একেবারে মূল্যবৃদ্ধি না করে কোনো উপায় যেমন সরকারের নেই, তেমনি আবার মূল্যবৃদ্ধি করেই ভর্তুকি সমন্বয় করাও সম্ভব নয়। অতীতে দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি করেও ঘাটতি পূরণ হয়নি। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। তবে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং অদক্ষ ও ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার কমিয়ে আনলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। তা ছাড়া সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বন এবং সিস্টেম লস কমিয়ে আনাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নিলে বিদ্যুতের দাম এত বেশি বৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল না।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মুনাফা নয়, লোকসান নয়— এটাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের নীতি। তাই সরকারি কোম্পানির মুনাফা করার কথা নয়। সরকারি কোম্পানি সেবার জন্য তৈরি, অথচ তারা মুনাফা করছে। আবার শ্রম আইনের দোহাই দিয়ে সেই মুনাফা ভাগ করে নিচ্ছে। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোতে বেতন সরকারি বেতন স্কেলের চেয়ে দেড়গুণ বেশি। এরপরও মুনাফার নামে শত শত কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আর তার দায় চাপছে জনগণের ওপর। অথচ এ বাড়তি ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর না চাপিয়ে বিতরণ সংস্থাগুলোর মুনাফা থেকে যতটা সম্ভব সমন্বয় করা যেত।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী প্রস্তাব বাতিল এবং অপচয়, সিস্টেম লস ও লুটপাট-দুর্নীতি বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করে অবিলম্বে গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের পদক্ষেপ জনমনে আশার সঞ্চার করতে পারে।
লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আজকের বাস্তবতায় কোরবানির মূল চেতনা অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতা, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই কোরবানিকে বড় পশু কেনা, সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন কিংবা বাহ্যিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। অথচ ইসলাম কোরবানির মাধ্যমে মানুষকে যে শিক্ষা দিতে চেয়েছে, তা অনেক গভীর ও ব্যাপক।
১১ দিন আগে
আমরা এনবিআরের কাছে যে প্রস্তাবনা দিয়েছি, তা কেবল কিছু কর ছাড়ের দাবি নয়; এটি মূলত বাংলাদেশকে একটি ‘নলেজ ইকোসিস্টেম’ বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করার একটি সামগ্রিক ব্লুপ্রিন্ট। আমরা বিশ্বাস করি, এনবিআর যদি এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে, তবে এটি দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মেধাভিত্তিক রপ্তানি
১৫ দিন আগে
রামিসার পরিবার আজ শুধু একটি শিশুকে হারায়নি; তারা হারিয়েছে স্বপ্ন, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার সাহস। অথচ বহু ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যান। এই বিচারহীনতাই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
১৬ দিন আগে
রামিসা আর ফিরে আসবে না। তার ছোট্ট জীবনের নির্মম সমাপ্তি কোনো শাস্তিই পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে না জাগায়, যদি বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় আত্মসমালোচনা তৈরি না করে, তবে আমরা আরও অনেক রামিসাকে হারাব।
১৮ দিন আগে