
এম ডি মাসুদ খান

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আসসালামু আলাইকুম।
এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।
আমি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নই, কোনো বিশেষ শ্রেণির মুখপাত্রও নই। আমি এই দেশের সেই সাধারণ মানুষদের একজন, যাদের ঘামে বাংলাদেশের অর্থনীতি চলে, যাদের ভোটে সরকার গঠিত হয়, যাদের করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, কিন্তু যাদের কণ্ঠস্বর অনেক সময় ক্ষমতার করিডোর পর্যন্ত পৌঁছায় না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; এটি লাখো মানুষের রক্ত, অগণিত মায়ের কান্না, অসংখ্য পরিবারের আত্মত্যাগ এবং একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের ফসল।
১৯৭১ সালে মানুষ জীবন দিয়েছিল একটি পতাকার জন্য নয়, একটি স্বপ্নের জন্য। সেই স্বপ্ন ছিল এমন একটি রাষ্ট্রের, যেখানে মানুষ মানুষকে ভয় পাবে না; যেখানে বিচার পেতে পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না; যেখানে ক্ষমতার চেয়ে সত্য বড় হবে; যেখানে দরিদ্র মানুষের চোখের জলও রাষ্ট্রের কাছে মূল্যবান হবে।
আজ স্বাধীনতার এত বছর পরে দাঁড়িয়ে আমাদের সাহস করে নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত— আমরা কি সেই রাষ্ট্র গড়তে পেরেছি?
আমরা উন্নয়ন করেছি, সেতু বানিয়েছি, মহাসড়ক বানিয়েছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছি, প্রযুক্তিতে এগিয়েছি। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন কি কেবল কংক্রিট, ইস্পাত আর পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায়?
একজন মা যদি তার মেয়েকে নিরাপদ মনে না করেন, একজন বাবা যদি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, একজন কৃষক যদি তার ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, একজন শ্রমিক যদি কর্মস্থলে নিরাপত্তা না পান, একজন নাগরিক যদি বিচার পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত না হন— তাহলে উন্নয়নের সেই পরিসংখ্যান মানুষের হৃদয়ে কতটুকু অর্থ বহন করে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর ভাবনায় দেশ মানে শুধু রাজধানীর দালান বা ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল না; দেশ ছিল গ্রামের সেই কৃষক, যে ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নামে; ছিল সেই শ্রমিক, যে দিনশেষে ঘরে ফেরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে কিন্তু স্বপ্ন হারায় না; ছিল সেই মা, যে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লড়াই চালিয়ে যায়।
তার রাষ্ট্রচিন্তায় আত্মনির্ভরতা মানে ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস— নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে নিজের ঘর ভরানোর আশা। গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ছিল বাস্তব জীবনের প্রয়োজন, যেখানে গ্রামের বাজারে প্রাণ ফিরে আসে এবং কৃষকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। একই সঙ্গে মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব— যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে, নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে এবং রাষ্ট্রের ছায়ায় নিজেকে সুরক্ষিত মনে করতে পারে।
‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ তার কাছে ছিল মাটির গন্ধ, মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আত্মপরিচয়।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক আহমদ ছফা মনে করতেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা দেখতে হলে সাধারণ মানুষের জীবনের দিকে তাকাতে হয়। রাজধানীর উন্নয়ন নয়, গ্রামের কৃষকের জীবন, শ্রমিকের সংগ্রাম এবং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎই একটি রাষ্ট্রের সত্যিকারের মানদণ্ড।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তার লেখায় বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম ও বাস্তব জীবন তুলে ধরেছিলেন। সেই মানুষগুলো আজও আমাদের চারপাশে আছে। তারা এখনো ন্যায্য মূল্য চায়, নিরাপদ জীবন চায়, সন্তানের ভবিষ্যৎ চায় এবং অসুস্থ হলে মর্যাদার সঙ্গে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা চায়।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন— মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। রাষ্ট্রের সমস্ত উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতেও থাকা উচিত এই মানুষ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের সংকট নয়; আস্থার সংকট।
মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস হারাতে শুরু করলে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে যায়।
একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হলে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো জাতির বিবেক আহত হয়।
একটি মেয়ের নিরাপত্তাহীনতা রাষ্ট্রের নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ভেঙে যায়।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অনেক সময় ছোট মানুষ দ্রুত শাস্তি পায়, কিন্তু বড় অপরাধের বিচার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এই অবস্থা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।
রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ আদালতের দিকে তাকায়— জনরোষের দিকে নয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেখুন—
কৃষক বেঁচে থাকার লড়াই করছে।
জেলে অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঋণের বোঝা টানছে।
তরুণ চাকরির অপেক্ষায় বয়স হারাচ্ছে। মধ্যবিত্ত সংসার নীরবে স্বপ্ন সংকুচিত করছে। প্রবীণ মানুষ চিকিৎসার খরচ নিয়ে চিন্তিত।
আর অসংখ্য মা প্রতিদিন সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে দোয়া করছেন।
এরা রাষ্ট্রের কাছে বিলাসিতা চায় না।
এরা চায় নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার, সম্মান।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আজ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাও সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন দরিদ্র বা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ অসুস্থ হলে অনেক সময় চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও বড় কোনো রোগের চিকিৎসাব্যয় বহন করতে গিয়ে জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে ফেলে। সরকারি হাসপাতালগুলোর উপর চাপ, জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়— সব মিলিয়ে চিকিৎসা এখন অনেক মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা তখনই প্রমাণিত হয়, যখন একজন নাগরিক অসুস্থ হলে তার পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের ভয় না পেয়ে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তায় স্বস্তি পায়। কারণ স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া নয়—এটি নাগরিকের অধিকার।
বিশ্বসাহিত্যিক জন স্টেইনবেক দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কষ্ট দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হলে তা নীরব সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নেয়। শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য বাস্তববাদী লেখকেরা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন— রাষ্ট্রের শক্তি তার সাধারণ মানুষের জীবনমানের মধ্যেই নিহিত।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র টিকে থাকে ন্যায়বিচার, মানুষের আস্থা এবং নাগরিকের মর্যাদার উপর।
আজ আপনার সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া নয়; উন্নয়নের সঙ্গে ন্যায়, মানবিকতা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তাকে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন— মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই তার রাজনীতি। সেই অধিকারই আজ বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান হওয়া জরুরি।
সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়েই এই চিঠি।
সেই বাংলাদেশের প্রত্যাশা নিয়েই এই আবেদন।
আর সেই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্যই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে আপনার প্রতি আমাদের আহ্বান— মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনুন, ন্যায়বিচারকে দৃশ্যমান করুন, স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করুন এবং স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনাকে মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করুন।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে,
একজন সচেতন নাগরিক,
বাংলাদেশ।
লেখক: কলামিস্ট ও বনবিদ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আসসালামু আলাইকুম।
এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।
আমি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নই, কোনো বিশেষ শ্রেণির মুখপাত্রও নই। আমি এই দেশের সেই সাধারণ মানুষদের একজন, যাদের ঘামে বাংলাদেশের অর্থনীতি চলে, যাদের ভোটে সরকার গঠিত হয়, যাদের করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, কিন্তু যাদের কণ্ঠস্বর অনেক সময় ক্ষমতার করিডোর পর্যন্ত পৌঁছায় না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; এটি লাখো মানুষের রক্ত, অগণিত মায়ের কান্না, অসংখ্য পরিবারের আত্মত্যাগ এবং একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের ফসল।
১৯৭১ সালে মানুষ জীবন দিয়েছিল একটি পতাকার জন্য নয়, একটি স্বপ্নের জন্য। সেই স্বপ্ন ছিল এমন একটি রাষ্ট্রের, যেখানে মানুষ মানুষকে ভয় পাবে না; যেখানে বিচার পেতে পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না; যেখানে ক্ষমতার চেয়ে সত্য বড় হবে; যেখানে দরিদ্র মানুষের চোখের জলও রাষ্ট্রের কাছে মূল্যবান হবে।
আজ স্বাধীনতার এত বছর পরে দাঁড়িয়ে আমাদের সাহস করে নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত— আমরা কি সেই রাষ্ট্র গড়তে পেরেছি?
আমরা উন্নয়ন করেছি, সেতু বানিয়েছি, মহাসড়ক বানিয়েছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েছি, প্রযুক্তিতে এগিয়েছি। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন কি কেবল কংক্রিট, ইস্পাত আর পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায়?
একজন মা যদি তার মেয়েকে নিরাপদ মনে না করেন, একজন বাবা যদি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, একজন কৃষক যদি তার ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, একজন শ্রমিক যদি কর্মস্থলে নিরাপত্তা না পান, একজন নাগরিক যদি বিচার পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত না হন— তাহলে উন্নয়নের সেই পরিসংখ্যান মানুষের হৃদয়ে কতটুকু অর্থ বহন করে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর ভাবনায় দেশ মানে শুধু রাজধানীর দালান বা ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল না; দেশ ছিল গ্রামের সেই কৃষক, যে ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নামে; ছিল সেই শ্রমিক, যে দিনশেষে ঘরে ফেরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে কিন্তু স্বপ্ন হারায় না; ছিল সেই মা, যে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লড়াই চালিয়ে যায়।
তার রাষ্ট্রচিন্তায় আত্মনির্ভরতা মানে ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস— নিজের জমিতে ফসল ফলিয়ে নিজের ঘর ভরানোর আশা। গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ছিল বাস্তব জীবনের প্রয়োজন, যেখানে গ্রামের বাজারে প্রাণ ফিরে আসে এবং কৃষকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। একই সঙ্গে মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব— যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে, নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে এবং রাষ্ট্রের ছায়ায় নিজেকে সুরক্ষিত মনে করতে পারে।
‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ তার কাছে ছিল মাটির গন্ধ, মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আত্মপরিচয়।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক আহমদ ছফা মনে করতেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা দেখতে হলে সাধারণ মানুষের জীবনের দিকে তাকাতে হয়। রাজধানীর উন্নয়ন নয়, গ্রামের কৃষকের জীবন, শ্রমিকের সংগ্রাম এবং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎই একটি রাষ্ট্রের সত্যিকারের মানদণ্ড।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তার লেখায় বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম ও বাস্তব জীবন তুলে ধরেছিলেন। সেই মানুষগুলো আজও আমাদের চারপাশে আছে। তারা এখনো ন্যায্য মূল্য চায়, নিরাপদ জীবন চায়, সন্তানের ভবিষ্যৎ চায় এবং অসুস্থ হলে মর্যাদার সঙ্গে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা চায়।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন— মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। রাষ্ট্রের সমস্ত উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতেও থাকা উচিত এই মানুষ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের সংকট নয়; আস্থার সংকট।
মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস হারাতে শুরু করলে রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে যায়।
একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হলে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো জাতির বিবেক আহত হয়।
একটি মেয়ের নিরাপত্তাহীনতা রাষ্ট্রের নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ভেঙে যায়।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে অনেক সময় ছোট মানুষ দ্রুত শাস্তি পায়, কিন্তু বড় অপরাধের বিচার নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এই অবস্থা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।
রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ আদালতের দিকে তাকায়— জনরোষের দিকে নয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেখুন—
কৃষক বেঁচে থাকার লড়াই করছে।
জেলে অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঋণের বোঝা টানছে।
তরুণ চাকরির অপেক্ষায় বয়স হারাচ্ছে। মধ্যবিত্ত সংসার নীরবে স্বপ্ন সংকুচিত করছে। প্রবীণ মানুষ চিকিৎসার খরচ নিয়ে চিন্তিত।
আর অসংখ্য মা প্রতিদিন সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে দোয়া করছেন।
এরা রাষ্ট্রের কাছে বিলাসিতা চায় না।
এরা চায় নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার, সম্মান।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আজ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাও সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন দরিদ্র বা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ অসুস্থ হলে অনেক সময় চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও বড় কোনো রোগের চিকিৎসাব্যয় বহন করতে গিয়ে জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে ফেলে। সরকারি হাসপাতালগুলোর উপর চাপ, জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বেসরকারি চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়— সব মিলিয়ে চিকিৎসা এখন অনেক মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা তখনই প্রমাণিত হয়, যখন একজন নাগরিক অসুস্থ হলে তার পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের ভয় না পেয়ে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তায় স্বস্তি পায়। কারণ স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া নয়—এটি নাগরিকের অধিকার।
বিশ্বসাহিত্যিক জন স্টেইনবেক দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কষ্ট দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হলে তা নীরব সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নেয়। শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য বাস্তববাদী লেখকেরা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন— রাষ্ট্রের শক্তি তার সাধারণ মানুষের জীবনমানের মধ্যেই নিহিত।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র টিকে থাকে ন্যায়বিচার, মানুষের আস্থা এবং নাগরিকের মর্যাদার উপর।
আজ আপনার সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া নয়; উন্নয়নের সঙ্গে ন্যায়, মানবিকতা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তাকে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন— মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই তার রাজনীতি। সেই অধিকারই আজ বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান হওয়া জরুরি।
সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়েই এই চিঠি।
সেই বাংলাদেশের প্রত্যাশা নিয়েই এই আবেদন।
আর সেই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্যই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে আপনার প্রতি আমাদের আহ্বান— মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনুন, ন্যায়বিচারকে দৃশ্যমান করুন, স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করুন এবং স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনাকে মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করুন।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে,
একজন সচেতন নাগরিক,
বাংলাদেশ।
লেখক: কলামিস্ট ও বনবিদ

আজকের বাস্তবতায় কোরবানির মূল চেতনা অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতা, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই কোরবানিকে বড় পশু কেনা, সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন কিংবা বাহ্যিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। অথচ ইসলাম কোরবানির মাধ্যমে মানুষকে যে শিক্ষা দিতে চেয়েছে, তা অনেক গভীর ও ব্যাপক।
১১ দিন আগে
আমরা এনবিআরের কাছে যে প্রস্তাবনা দিয়েছি, তা কেবল কিছু কর ছাড়ের দাবি নয়; এটি মূলত বাংলাদেশকে একটি ‘নলেজ ইকোসিস্টেম’ বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করার একটি সামগ্রিক ব্লুপ্রিন্ট। আমরা বিশ্বাস করি, এনবিআর যদি এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে, তবে এটি দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মেধাভিত্তিক রপ্তানি
১৫ দিন আগে
রামিসার পরিবার আজ শুধু একটি শিশুকে হারায়নি; তারা হারিয়েছে স্বপ্ন, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার সাহস। অথচ বহু ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ কিংবা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যান। এই বিচারহীনতাই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
১৬ দিন আগে
রামিসা আর ফিরে আসবে না। তার ছোট্ট জীবনের নির্মম সমাপ্তি কোনো শাস্তিই পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে না জাগায়, যদি বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় আত্মসমালোচনা তৈরি না করে, তবে আমরা আরও অনেক রামিসাকে হারাব।
১৮ দিন আগে