প্রসঙ্গ মুখস্থবিদ্যা

সরকার আবদুল মান্নান
প্রতীকী ছবি

‘মুখস্থবিদ্যা’- এই বিষয়টি নিয়ে বেশ গোলমাল শুরু হয়েছে। একটি মহল বলছেন, মুখস্থ করা উচিত নয়। কেননা, মুখস্থ করা জ্ঞানের বিষয় নয়। কেউ কেউ বলছেন, মুখস্থবিদ্যার আশ্রয় নেওয়া আর নকলের আশ্রয় নেওয়া সমান।

এর বিপরীতে আরেকটি মহল বলছেন, মুখস্থ করা অনিবার্য। মুখস্থ করা ছাড়া গণিতের সূত্রাদি, বিজ্ঞানের সূত্রাদি এবং আরও হাজারটা বিষয় আত্মস্থ করা সম্ভব নয়, প্রয়োগ করাও সম্ভব নয়।

এখানে কিছু ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ আছে। প্রথমত মুখস্থ করা বলতে আমরা কী বুঝি? এই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। মুখস্থ করা হলো, কোনো কন্টেন্ট বারবার আওড়িয়ে স্মৃতিতে ধারণ করে রাখার চেষ্টা এবং পরীক্ষার খাতায় হুবহু তা লেখার প্রয়াস। যেমন রচনা মুখস্থ করা, সারাংশ-সারমর্ম মুখস্থ করা, কোনো প্রশ্নের উত্তর হুবহু মুখস্থ করা, এমনকি গণিত অথবা জ্যামিতি মুখস্থ করা ইত্যাদি। মূলত অতি অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য রাত-দিন পড়ে কিংবা বার বার আওড়িয়ে স্মৃতিতে ধারণ করার প্রাণান্তকর চেষ্টাকে বলে মুখস্থবিদ্যা।

এই মুখস্থবিদ্যার বিরুদ্ধে শিক্ষাবিজ্ঞানীদের অবস্থান। যারা শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করেন এবং শিক্ষার্থী মূল্যায়নের কৌশল ও বিধিবিধান প্রণয়ন করেন তারা এমনতর মুখস্থবিদ্যাকে নিরুৎসাহিত করেন। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই প্রতিনিয়ত কথা বলছি কংবা লিখছি। সেই লেখা পরীক্ষার খাতায় হতে পারে অথবা অন্য কোনো কারণেও হতে পারে। আর আমাদের প্রতিনয়ত কথা বলতে হয়। কথা বলা এবং লেখার জন্য আমাদের কিছু বিষয় স্মৃতিতে ধারণ করতে হয়।

আমি যদি বলি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। এই কথাটুকু বলতে গেলে আমাকে ‘১৯১৩’ এবং ‘গীতাঞ্জলি’ ইত্যাদি তথ্য স্মৃতিতে ধারণ করে রাখতে হবে। এই বিষয়টিকে মুখস্থ বলে না। এগুলো হচ্ছে মানুষ হিসেবে আমাদের সহজাত এবং সাধারণ প্রবণতা।

আমাদের মস্তিষ্কের বৈশিষ্ট্য এই যে, সে কিছু তথ্য ধারণ করে রাখবে এবং সেটা খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এর জন্য সারাক্ষণ আওড়িয়ে মুখস্থ করতে হবে না। স্মৃতিতে ধারণ করা ওইসব তথ্য বিভিন্ন সময় ব্যবহার করা হয়। সেই ব্যবহার হতে পারে আলাপচারিতায়, কথা বলায়, বক্তৃতায়, লেখায় কিংবা পরীক্ষায়।

সুতরাং আমাদের কিছুতেই ভুললে চলবে না যে, যাকে মুখস্থবিদ্যা বলে তার সঙ্গে অবলীলায় স্মৃতিতে ধারণ করে রাখার বিষয়টি এক নয়। একজন মানুষ যখন কিছু দেখে, স্পর্শ করে, পড়ে বা শোনে তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছু তথ্য তার স্মৃতিতে জমা হতে থাকে। এইসব তথ্য বারবার আউড়িয়ে, বারবার পড়ে, বারবার বলে স্মৃতিতে ধারণ করে রাখতে হয় না। এইসব তথ্য আপনা থেকেই আমাদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়। একে কিছুতেই মুখস্থবিদ্যা বলা যাবে না। এই বিভ্রান্তি থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

সুতরাং মুখস্থবিদ্যা আর তথ্যাদি স্মৃতি ধারণ করা বা অবলীলায় সংরক্ষিত হওয়া এক নয়।

[লেখকের ফেসবুক থেকে]

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

শুধু দাবিদাওয়ার আন্দোলন নয়, রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের গল্প

২০ জুলাইয়ের সেই দিন এবং এরপর পুলিশি দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করার পরও মানুষ যে আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে, তা সম্ভব হতো না, যদি এমন এক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত না হতো, যারা এতদিন সংগঠিত রাজনীতির বাইরে ছিল। তারা এতদিন শুধু পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বী

৬ দিন আগে

পোল্ট্রি খামার: লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা

বিশ্ব জুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোল্ট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বি

৬ দিন আগে

ককরোচ আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি, ভারতের বুকেও কি ‘জুলাইয়ের আবহ’?

দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্দোলনের সূচনা, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভের কারণে ভারতের চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে অনেকেই ‘জুলাইয়ের আবহ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।

৯ দিন আগে

হুমায়ূন আহমেদ—একটি প্রজন্মের অনুভূতি

আজ তার মহাপ্রয়াণ দিবসে আমরা কেবল একজন লেখককে স্মরণ করছি না, আমরা স্মরণ করছি এমন এক আলোকবর্তিকাকে, যিনি বাংলা সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন— সহজ ভাষাও গভীর হতে পারে, নীরবতাও অনেক কথা বলতে পারে, আর ছোট ছোট সুখ-দুঃখও সাহিত্যের মহৎ বিষয় হতে পারে।

১০ দিন আগে