আব্দুল হক— এক করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

আল-আমিন নয়ন
আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ১০: ০০
সারা জীবনের কষ্টার্জিত অর্থ পরিবারে পাঠানোর পরও দেশে ফিরে নিজের জন্য জায়গা হলো না আব্দুল হকের।

সাত বছর প্রবাসে কাটিয়ে, সারা জীবনের কষ্টার্জিত অর্থ পরিবারে পাঠানোর পরও দেশে ফিরে নিজের জন্য জায়গা হলো না। এমনই করুণ পরিণতি হয়েছে ফেনীর পশুরাম উপজেলার পশ্চিম সাহেবনগর গ্রামের ৪২ বছরের রেমিট্যান্স যোদ্ধা আব্দুল হকের।

সোমবার (১৬ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় ফ্লাই দুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন আব্দুল হক। দীর্ঘদিন অসুস্থতায় জর্জরিত এই প্রবাসী বিমানবন্দরে স্ত্রী-সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু তাঁদের দেখা না পেয়ে হতাশ হয়ে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ানের (এপিবিএন) কাছে সাহায্য চান।

এপিবিএন অফিস থেকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের প্রতিক্রিয়া হৃদয়বিদারক। তাঁরা সাফ জানিয়ে দেন, আব্দুল হকের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ নেই পরিবারে। এমনকি তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যও কেউ বিমানবন্দরে আসতে রাজি হয়নি।

এই অমানবিক পরিস্থিতিতে এপিবিএন কর্মকর্তারা আব্দুল হককে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কাছে হস্তান্তর করেন। উদ্দেশ্য, তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা এবং পরবর্তীতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমাধান বের করা। বর্তমানে আব্দুল হক ব্র্যাকের লার্নিং সেন্টারের একটি রুমে অবস্থান করছেন।

২০১৭ সালে সৌদি আরবে হাউজ ড্রাইভারের কাজ নিয়ে পাড়ি জমান আব্দুল হক। তাঁর জীবনের সব উপার্জন তিনি স্ত্রী-সন্তানের কাছে পাঠিয়েছেন। কিন্তু সৌদি আরবে শেষ এক বছরে অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেননি, ফলে উপার্জনও বন্ধ হয়ে যায়। আর এখান থেকেই শুরু হয় সম্পর্কের অবনতি।

অভিমানের কারণেই দীর্ঘ এক বছর ধরে তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কিন্তু দেশে ফিরে নিজেই যখন পরিবারের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন, তখন সেই পরিবারই তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

আব্দুল হকের গল্প এক করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাঁদের ঘাম-রক্তে দেশের রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি পায়, পরিবারের জীবনমান উন্নত হয়। অথচ নিজের পরিবারেই যদি তাঁরা আশ্রয় না পান, তবে তাঁদের আর্থিক ও মানসিক সংগ্রামের মূল্য কোথায়?

এখন আব্দুল হক ব্র্যাকের সেইফ হোমে আছেন। তাঁর পরিবার এবং সমাজ কি তাঁকে গ্রহণ করবে, নাকি আরও একটি মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হবে আমরা—এমন প্রশ্ন আমাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

এপিবিএন, ব্র্যাক এবং অন্যান্য সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ হয়তো তাঁকে পরিবারে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু আমাদের সবার উচিত এই প্রবাসী যোদ্ধাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাঁদের কষ্টকে সম্মান জানানো।

আব্দুল হকের গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের সমাজের মূল্যবোধের একটি আয়না। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রবাসীদের অর্থের মূল্যায়ন করি, কিন্তু তাঁদের ব্যক্তি হিসেবে সম্মান করতে শিখি না। আসুন, তাঁদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করি এবং তাঁদের পাশে দাঁড়াই।

আল-আমিন নয়ন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের কর্মকর্তা।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্য

৭ দিন আগে

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৮ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৯ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

১১ দিন আগে