রাষ্ট্রপতির বিদায় রাজনৈতিক কৌশলেরই পরিণতি

সাঈদ বারী
আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৩৯
রাষ্ট্রপতির বিদায় রাজনৈতিক কৌশলেরই পরিণতি

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সূচনা। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন, এরপর নির্ধারিত ৯০ দিন সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণ বা পদত্যাগের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। তবে নতুন সংসদ ও মন্ত্রিসভা গঠনের পরও তাকে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্তকে অনেকেই সরকারের দুর্বলতা বা রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু রাজনীতির অনেক সিদ্ধান্তের তাৎপর্য তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। কখনো কখনো বৃহত্তর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়। ঘটনাপ্রবাহ অন্তত এটুকু ইঙ্গিত দেয় যে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের প্রশ্নেও একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাব কাজ করেছে। সে কারণেই নতুন সরকার গঠনের পরপরই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের পথে না গিয়ে অপেক্ষা করা হয়েছে। আজকের এই পরিবর্তন সেই কৌশলেরই পরিণতি বলে মনে করার সুযোগ রয়েছে।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী এখন যিনি নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, তিনি তার সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ করবেন এই সরকারের মেয়াদ শেষে নতুন আরেকটি সরকার আসার পর। অর্থাৎ আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার প্রভাব শুধু বর্তমান রাজনৈতিক পর্বেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আগামী রাজনৈতিক চক্রেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেবল একটি পদ পূরণের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিবেচনারও অংশ।

রাষ্ট্রপতির পদকে অনেক সময় আনুষ্ঠানিক বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা পুরোপুরি সত্য নয়। স্বাভাবিক সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক সংকটের সময় এই পদটির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া, নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি, নতুন সরকার গঠন কিংবা সাংবিধানিক জটিলতা দেখা দিলে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত ও ভূমিকা রাষ্ট্রের গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার ফলে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব ও গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ নির্বাচনকালীন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রাষ্ট্রপতির ভূমিকাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে।

এই কারণেই রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেটি কখনোই কেবল একজন ব্যক্তিকে একটি সম্মানজনক পদে বসানোর প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং জনগণের আস্থার প্রশ্ন।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই পদের জন্য প্রয়োজন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যার ব্যক্তিগত সততা প্রশ্নাতীত, যিনি সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ, রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব এবং সর্বোপরি সর্বজনগ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রপতি এমন একজন হওয়া উচিত, যিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেন এবং সংকটের মুহূর্তে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কাছে আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা যত শক্তিশালী হবে, গণতন্ত্রের ভিতও তত মজবুত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাই কোনো আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধি অনেক বেশি প্রয়োজন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যিনি বসবেন, তিনি শুধু একটি মেয়াদের রাষ্ট্রপতি নন; তিনি হবেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মর্যাদা, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অন্যতম রক্ষক।

লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement