
জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

কিছুসংখ্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে!
শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের সংক্রমণ বাড়ছে। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে পাশ করা ‘মেধাবী’ দাবিদার কিছু মানুষ যেভাবে নানা ইস্যুতে বিতর্ক ছড়াচ্ছেন, তাতে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারবোধের জাগ্রত ধারায় মতামত দেওয়া যেন ফরজ হয়ে গেছে। এ যেন হীরক রাজার দেশের পরিস্থিতি।
মায়ের বুকের দুধ শিশুর প্রথম ও প্রধান খাবার বটে। সেদিক থেকে শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু গণতন্ত্রের চর্চা আজ এমন এক গণবিধ্বংসী পর্যায়ে গেছে যে, সেই নির্ভেজাল সত্যটাও কোনো বৈজ্ঞানিক ও উপযুক্ত প্রেক্ষাপট ছাড়াই ব্যবহার হচ্ছে।
যে বা যারা মায়েদের দোষারোপ করে বক্তব্য দিয়ে ভাইরাল হয়েছেন, তাদের সেই বক্তব্যের পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তি দেওয়ার জন্য এই লেখা নয়। সাধারণ মানুষকে কোনটি ভুল তা ধরিয়ে দেওয়ার চেয়েও বেশি জরুরি হলো তাদের সামনে সঠিক তথ্যটি তুলে ধরা। সেটাই যারা ভুলে গেছেন, সেই গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতেই এই লেখার অবতারণা।
কেননা দীর্ঘদিন গণমাধ্যমে কাজের সুবাদে এটা বলাটা অবশ্যই কর্তব্য মনে করি— গণমাধ্যম হিসেবে খণ্ডিত, অবৈজ্ঞানিক এবং অনেকাংশে ভুল বার্তা যায় এমন বক্তব্যকে ফোকাস করে রিপোর্ট করা কতটা দায়িত্বশীল, সেই বিশ্লেষণ জরুরি।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) বা জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্যের আলোকে খানিক বিশ্লেষণ করি। সেই তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে শূন্য থেকে ছয় মাস বয়সী ৫৫ শতাংশ শিশু সম্পূর্ণভাবে মায়ের বুকের দুধ খেয়ে থাকে। বৈশ্বিক পর্যায়ে এই হার প্রায় ৪৮ শতাংশ।
এ ছাড়া এক জরিপে দেখা গেছে শিশুদের মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার সার্বজনীন হার— প্রায় ৮৭ শতাংশ মা তাদের সন্তানকে কোনো না কোনো সময় বুকের দুধ দেওয়া শুরু করেন। তবে নারীদের ঘরের বাইরে কর্মক্ষেত্রে যেতে হয় বলেই মায়ের বুকের দুধ ছাড়াও শিশুকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা আছে। এটা বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং এর একটি বাণিজ্যিক দিকও রয়েছে।
কিন্তু হামের মতো শতভাগ সংক্রামক রোগের জন্য মায়েদের বুকের দুধকে সরাসরি দায়ী করাটা অবৈজ্ঞানিক। প্রথমত, কেনো মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান না? তারা কোন আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বাস করেন— সেটা জানা জরুরি। দ্বিতীয়ত, যে শিশুরা সংক্রমিত হচ্ছে, তারা কোন অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণি থেকে আসছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
যে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বড় অংশই নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পর্যায়ের পরিবার থেকে আসছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন হামের জরুরি টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন করে বলেছিলেন, ঢাকার দুই সিটির বস্তিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের পাশাপাশি বরিশাল, ময়মনসিংহের মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে টিকাদান জোরদার হলে সংক্রমণ কমবে।
এখন এটা তো সবারই জানা, এই দেশে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলো কোথায়, আর সেখানে কোন ধরনের মানুষের বসবাস। দেশের বৃহৎ ঘনবসতি অঞ্চলগুলোর বড় অংশই শহর বা উপশহরের দরিদ্রপ্রবণ, স্বল্প আয়ের ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর আবাস। বিভিন্ন বস্তি, চর, হাওর-বাঁওড় কিংবা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল— সবখানেই এবার হামের সংক্রমণ ছড়িয়েছে। বান্দরবানের প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলেও সংক্রমণ দেখা গেছে, যেখানে পাকা সড়কে পৌঁছাতেই কয়েক ঘণ্টা হাঁটতে হয়।
ফেসবুকের ভাইরাল পোস্টে হামের সংক্রমণের জন্য নারীদের বুকের দুধ না খাওয়ানোকে দায়ী করে সরলীকৃত বিশ্লেষণে সয়লাব! এ যেন ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’— এমন নিষ্ফল তর্ক।
শুরুতেই বলেছি, নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মায়েরা তাদের শিশুর খাবারের জন্য নিজেদের বুকের দুধকেই সম্বল করেন। কারণ তাদের ঘরে শিশুর জন্য রকমারি বাহারি খাবারের জোগান থাকে না। তাই যে মায়েরা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না, তারা মোট কত শতাংশ— সেটাই বড় প্রশ্ন।
হামের মতো সংক্রামক রোগ, যার প্রতিরোধে টিকার কোনো বিকল্প নেই, সেই রোগের সংক্রমণের জন্য বুকের দুধকে একমাত্র বা অন্যতম কারণ হিসেবে প্রচার করা নিঃসন্দেহে অবৈজ্ঞানিক। পুরনো জরিপের একপেশে তথ্য দিয়ে এমন ভয়াবহ সংক্রমণের দায় নারীদের ঘাড়ে চাপানো খুবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, মূলধারার কিছু গণমাধ্যমও এই বিভ্রান্তিকর বার্তা প্রচার করছে।
দশক দুই আগে নারীরা যখন ঘরের বাইরে কর্মক্ষেত্রে বেশি করে যুক্ত হচ্ছিলেন, তখন কিছু উচ্চবিত্ত ও ফ্যাশনসচেতন মায়ের মধ্যে শিশুদের বুকের দুধ না খাওয়ানোর প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক মা সন্তানের স্বার্থে নিজেদের মনোভাব বদলেছেন।
সুতরাং হঠাৎ করে ‘৫০ শতাংশ মা বুকের দুধ খাওয়ান না, তাই হাম বাড়ছে’— এমন বক্তব্য খুবই স্থূল চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। এটি নারীর প্রতি অবদমন ও অবমাননার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে একটি রোগকে বিজ্ঞান দিয়ে নয়, বরং অপতথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগও করে দিচ্ছে।
ফলে কিছু মা হয়তো ভয় পেয়ে শিশুদের বেশি বেশি বুকের দুধ খাওয়াবেন— যেটা স্বাভাবিকভাবেই ভালো। কিন্তু যদি তারা মনে করেন বুকের দুধই হামের একমাত্র প্রতিষেধক, তাহলে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই— সেখানেই তৈরি হতে পারে বড় বিপদ।
হামের সংক্রমণে প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরাও আক্রান্ত হয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এসব পরিবারের মায়েরা অধিকাংশই সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান। তবে যারা নারীদের দায়ী করছেন, তারা আরেকটি বাস্তবতা উপেক্ষা করছেন।
প্রথমত, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধের ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা তৈরি করে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে বুকের দুধ সীমিত বা বন্ধ রাখতে হয়।
দ্বিতীয়ত, বাল্যবিয়ের শিকার বহু কিশোরী মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকায় বুকের দুধও পর্যাপ্ত তৈরি হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারের মেয়ে। অল্প বয়সে গর্ভধারণ ও অপুষ্টির কারণে শিশুর পাশাপাশি মাও ঝুঁকিতে থাকেন।
অপুষ্টিতে ভোগা অপ্রাপ্তবয়স্ক মায়েরা মা হলে তাদের শিশুরাও পর্যাপ্ত বুকের দুধ নাও পেতে পারে। কারণ বুকের দুধ উৎপাদন নির্ভর করে মায়ের পুষ্টি, সুষম খাদ্য ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ওপর। এবার বুকের ওপর হাত দিয়ে বলুন তো— নিম্নবিত্ত, প্রান্তিক এমনকি মধ্যম আয়ের কত পরিবারে প্রসূতি মায়ের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা হয়?
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে যে কেউ রোগের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। শিশুকে জন্মের পর অন্তত ছয় মাস বুকের দুধ খাওয়ানো, সময়মতো জন্ম, সঠিক ওজন ও পুষ্টি— সবই শিশুর রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, হামের দুই ডোজ টিকা না দিলেও চলবে।
বরং টিকার কোনো বিকল্প নেই— এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সত্য। জন্মের পর নয় মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতেই হবে। একই সঙ্গে দেশের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
শিশুদের জন্য নির্ধারিত ১০টি রোগের বিরুদ্ধে ১২টি টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মায়ের বুকের দুধ, ছয় মাস পর সুষম সম্পূরক খাবার— সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা ব্যবস্থা।
হামের মতো প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ শিশুর শরীরের প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে পারে— এই বৈজ্ঞানিক সত্যও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সুতরাং ‘মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হাম বাড়ছে’— এই খণ্ডিত ও অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রচার ভয়ংকর বিভ্রান্তি তৈরি করছে। যখন শিক্ষিত তরুণ সমাজও এসব অপতথ্যের পেছনে ছুটছে, তখন আশার জায়গা সংকুচিত হয়। আর যখন মূলধারার গণমাধ্যমও ফেসবুকে ভাইরাল বক্তব্যের আঙ্গিকে সংবাদ পরিবেশন করে, তখন সেটি সত্যিই আমাদের দুর্ভাগ্য।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট

কিছুসংখ্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে!
শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের সংক্রমণ বাড়ছে। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে পাশ করা ‘মেধাবী’ দাবিদার কিছু মানুষ যেভাবে নানা ইস্যুতে বিতর্ক ছড়াচ্ছেন, তাতে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারবোধের জাগ্রত ধারায় মতামত দেওয়া যেন ফরজ হয়ে গেছে। এ যেন হীরক রাজার দেশের পরিস্থিতি।
মায়ের বুকের দুধ শিশুর প্রথম ও প্রধান খাবার বটে। সেদিক থেকে শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু গণতন্ত্রের চর্চা আজ এমন এক গণবিধ্বংসী পর্যায়ে গেছে যে, সেই নির্ভেজাল সত্যটাও কোনো বৈজ্ঞানিক ও উপযুক্ত প্রেক্ষাপট ছাড়াই ব্যবহার হচ্ছে।
যে বা যারা মায়েদের দোষারোপ করে বক্তব্য দিয়ে ভাইরাল হয়েছেন, তাদের সেই বক্তব্যের পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তি দেওয়ার জন্য এই লেখা নয়। সাধারণ মানুষকে কোনটি ভুল তা ধরিয়ে দেওয়ার চেয়েও বেশি জরুরি হলো তাদের সামনে সঠিক তথ্যটি তুলে ধরা। সেটাই যারা ভুলে গেছেন, সেই গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতেই এই লেখার অবতারণা।
কেননা দীর্ঘদিন গণমাধ্যমে কাজের সুবাদে এটা বলাটা অবশ্যই কর্তব্য মনে করি— গণমাধ্যম হিসেবে খণ্ডিত, অবৈজ্ঞানিক এবং অনেকাংশে ভুল বার্তা যায় এমন বক্তব্যকে ফোকাস করে রিপোর্ট করা কতটা দায়িত্বশীল, সেই বিশ্লেষণ জরুরি।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) বা জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্যের আলোকে খানিক বিশ্লেষণ করি। সেই তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে শূন্য থেকে ছয় মাস বয়সী ৫৫ শতাংশ শিশু সম্পূর্ণভাবে মায়ের বুকের দুধ খেয়ে থাকে। বৈশ্বিক পর্যায়ে এই হার প্রায় ৪৮ শতাংশ।
এ ছাড়া এক জরিপে দেখা গেছে শিশুদের মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার সার্বজনীন হার— প্রায় ৮৭ শতাংশ মা তাদের সন্তানকে কোনো না কোনো সময় বুকের দুধ দেওয়া শুরু করেন। তবে নারীদের ঘরের বাইরে কর্মক্ষেত্রে যেতে হয় বলেই মায়ের বুকের দুধ ছাড়াও শিশুকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা আছে। এটা বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং এর একটি বাণিজ্যিক দিকও রয়েছে।
কিন্তু হামের মতো শতভাগ সংক্রামক রোগের জন্য মায়েদের বুকের দুধকে সরাসরি দায়ী করাটা অবৈজ্ঞানিক। প্রথমত, কেনো মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান না? তারা কোন আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বাস করেন— সেটা জানা জরুরি। দ্বিতীয়ত, যে শিশুরা সংক্রমিত হচ্ছে, তারা কোন অর্থনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণি থেকে আসছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
যে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বড় অংশই নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পর্যায়ের পরিবার থেকে আসছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন হামের জরুরি টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন করে বলেছিলেন, ঢাকার দুই সিটির বস্তিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের পাশাপাশি বরিশাল, ময়মনসিংহের মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে টিকাদান জোরদার হলে সংক্রমণ কমবে।
এখন এটা তো সবারই জানা, এই দেশে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলো কোথায়, আর সেখানে কোন ধরনের মানুষের বসবাস। দেশের বৃহৎ ঘনবসতি অঞ্চলগুলোর বড় অংশই শহর বা উপশহরের দরিদ্রপ্রবণ, স্বল্প আয়ের ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর আবাস। বিভিন্ন বস্তি, চর, হাওর-বাঁওড় কিংবা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল— সবখানেই এবার হামের সংক্রমণ ছড়িয়েছে। বান্দরবানের প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলেও সংক্রমণ দেখা গেছে, যেখানে পাকা সড়কে পৌঁছাতেই কয়েক ঘণ্টা হাঁটতে হয়।
ফেসবুকের ভাইরাল পোস্টে হামের সংক্রমণের জন্য নারীদের বুকের দুধ না খাওয়ানোকে দায়ী করে সরলীকৃত বিশ্লেষণে সয়লাব! এ যেন ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’— এমন নিষ্ফল তর্ক।
শুরুতেই বলেছি, নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মায়েরা তাদের শিশুর খাবারের জন্য নিজেদের বুকের দুধকেই সম্বল করেন। কারণ তাদের ঘরে শিশুর জন্য রকমারি বাহারি খাবারের জোগান থাকে না। তাই যে মায়েরা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না, তারা মোট কত শতাংশ— সেটাই বড় প্রশ্ন।
হামের মতো সংক্রামক রোগ, যার প্রতিরোধে টিকার কোনো বিকল্প নেই, সেই রোগের সংক্রমণের জন্য বুকের দুধকে একমাত্র বা অন্যতম কারণ হিসেবে প্রচার করা নিঃসন্দেহে অবৈজ্ঞানিক। পুরনো জরিপের একপেশে তথ্য দিয়ে এমন ভয়াবহ সংক্রমণের দায় নারীদের ঘাড়ে চাপানো খুবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, মূলধারার কিছু গণমাধ্যমও এই বিভ্রান্তিকর বার্তা প্রচার করছে।
দশক দুই আগে নারীরা যখন ঘরের বাইরে কর্মক্ষেত্রে বেশি করে যুক্ত হচ্ছিলেন, তখন কিছু উচ্চবিত্ত ও ফ্যাশনসচেতন মায়ের মধ্যে শিশুদের বুকের দুধ না খাওয়ানোর প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক মা সন্তানের স্বার্থে নিজেদের মনোভাব বদলেছেন।
সুতরাং হঠাৎ করে ‘৫০ শতাংশ মা বুকের দুধ খাওয়ান না, তাই হাম বাড়ছে’— এমন বক্তব্য খুবই স্থূল চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। এটি নারীর প্রতি অবদমন ও অবমাননার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে একটি রোগকে বিজ্ঞান দিয়ে নয়, বরং অপতথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগও করে দিচ্ছে।
ফলে কিছু মা হয়তো ভয় পেয়ে শিশুদের বেশি বেশি বুকের দুধ খাওয়াবেন— যেটা স্বাভাবিকভাবেই ভালো। কিন্তু যদি তারা মনে করেন বুকের দুধই হামের একমাত্র প্রতিষেধক, তাহলে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই— সেখানেই তৈরি হতে পারে বড় বিপদ।
হামের সংক্রমণে প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরাও আক্রান্ত হয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এসব পরিবারের মায়েরা অধিকাংশই সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান। তবে যারা নারীদের দায়ী করছেন, তারা আরেকটি বাস্তবতা উপেক্ষা করছেন।
প্রথমত, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধের ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা তৈরি করে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে বুকের দুধ সীমিত বা বন্ধ রাখতে হয়।
দ্বিতীয়ত, বাল্যবিয়ের শিকার বহু কিশোরী মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকায় বুকের দুধও পর্যাপ্ত তৈরি হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারের মেয়ে। অল্প বয়সে গর্ভধারণ ও অপুষ্টির কারণে শিশুর পাশাপাশি মাও ঝুঁকিতে থাকেন।
অপুষ্টিতে ভোগা অপ্রাপ্তবয়স্ক মায়েরা মা হলে তাদের শিশুরাও পর্যাপ্ত বুকের দুধ নাও পেতে পারে। কারণ বুকের দুধ উৎপাদন নির্ভর করে মায়ের পুষ্টি, সুষম খাদ্য ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ওপর। এবার বুকের ওপর হাত দিয়ে বলুন তো— নিম্নবিত্ত, প্রান্তিক এমনকি মধ্যম আয়ের কত পরিবারে প্রসূতি মায়ের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা হয়?
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে যে কেউ রোগের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। শিশুকে জন্মের পর অন্তত ছয় মাস বুকের দুধ খাওয়ানো, সময়মতো জন্ম, সঠিক ওজন ও পুষ্টি— সবই শিশুর রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, হামের দুই ডোজ টিকা না দিলেও চলবে।
বরং টিকার কোনো বিকল্প নেই— এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সত্য। জন্মের পর নয় মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতেই হবে। একই সঙ্গে দেশের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
শিশুদের জন্য নির্ধারিত ১০টি রোগের বিরুদ্ধে ১২টি টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মায়ের বুকের দুধ, ছয় মাস পর সুষম সম্পূরক খাবার— সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা ব্যবস্থা।
হামের মতো প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ শিশুর শরীরের প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দিতে পারে— এই বৈজ্ঞানিক সত্যও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সুতরাং ‘মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হাম বাড়ছে’— এই খণ্ডিত ও অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রচার ভয়ংকর বিভ্রান্তি তৈরি করছে। যখন শিক্ষিত তরুণ সমাজও এসব অপতথ্যের পেছনে ছুটছে, তখন আশার জায়গা সংকুচিত হয়। আর যখন মূলধারার গণমাধ্যমও ফেসবুকে ভাইরাল বক্তব্যের আঙ্গিকে সংবাদ পরিবেশন করে, তখন সেটি সত্যিই আমাদের দুর্ভাগ্য।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট

ঘটনাটি শুনতে কঠোর, এমনকি কিছুটা অমানবিকও মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে একটি গভীর সামাজিক বার্তা রয়েছে— অনেক উন্নত সমাজে ভিক্ষাবৃত্তিকে শুধু দারিদ্র্যের বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি কর্মসংস্কৃতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করা হয়।
৬ দিন আগে
বর্তমান বাস্তবতায় জনপ্রশাসনকে আরও গণমুখী করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতায়িত করার আলোচনা বহুদিনের। এখনো অনেক ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির শিকার হন।
৭ দিন আগে
ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন ধর্মীয় উগ্রতা বা বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে এসে বৃহত্তর মানবিকতা, সার্বজনীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের পথে এগোয়। ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগানটি যদি সত্যিকার অর্থে একটি ঐক্যের আহ্বান হয়ে ওঠে, তবে তা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হত
১৪ দিন আগে
বিজেপির নেতৃত্বে দিল্লির কেন্দ্র সরকার ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে, যা বাংলাদেশের এখনকার নতুন সরকারের সঙ্গেও টেকসই সম্পৃক্ততা ও যোগাযোগের মাধ্যমে প্রমাণিত। এটি ইঙ্গিত দেয়, নির্বাচনি প্রচারের ‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’ তাদের দেশীয় রাজনীতির জন্য লাভজনক হতে প
১৪ দিন আগে