কোরবানির পশুতে স্বনির্ভরতা: বদলে যাওয়া অর্থনীতির গল্প

ড. মো. শরীফুল ইসলাম

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব বিপ্লবগুলোর মধ্যে কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অন্যতম। একসময় কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এলেই সীমান্তপথে বিদেশি গরুর প্রবেশ ছিল সাধারণ দৃশ্য। দেশের বাজার অনেকাংশেই নির্ভর করত বাইরের পশুর ওপর। কিন্তু সময় বদলেছে। আজ বাংলাদেশ শুধু কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সক্ষমতাও অর্জন করেছে। এটি নিছক কৃষি বা প্রাণিসম্পদ খাতের সাফল্য নয়; এটি গ্রামীণ উন্নয়ন, যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর অংশগ্রহণ এবং জাতীয় অর্থনীতির এক অনন্য অর্জনের গল্প।

২০২৫ সালের কোরবানির ঈদে বাংলাদেশে প্রায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ লাখ ৫ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ছাগল ও ভেড়া ছিল। অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ লাখেরও বেশি পশু উদ্বৃত্ত ছিল। আরও বিস্ময়ের বিষয়, প্রায় ৩৩ লাখ পশু অবিক্রীত থেকেছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে— বাংলাদেশ আজ কোরবানির পশু উৎপাদনে একটি নতুন সক্ষমতার জায়গায় পৌঁছেছে।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতি সহায়তা, খামারভিত্তিক উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রবণতা। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে এখন ছোট, মাঝারি ও বড় খামার গড়ে উঠেছে। অনেক শিক্ষিত তরুণ চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তার বদলে গবাদিপশুর খামারকে বেছে নিচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তারাও ঘরভিত্তিক খামারের মাধ্যমে পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনছেন।

একসময় ভারতীয় গরু ছাড়া কোরবানির বাজার কল্পনাই করা যেত না। সীমান্ত এলাকায় ঈদের আগে গরুর অস্বাভাবিক প্রবাহ ছিল প্রকাশ্য বাস্তবতা। কিন্তু বর্তমানে সরকার স্পষ্টভাবে বলছে— দেশে কোরবানির পশুর জন্য বিদেশি আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বড়। আগে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যেত; এখন সেই অর্থ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভেতরেই আবর্তিত হচ্ছে।

কোরবানির পশুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি বিশাল ভ্যালু চেইন। খামারি ছাড়াও এর সঙ্গে যুক্ত আছেন পশুখাদ্য ব্যবসায়ী, ওষুধ বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক, হাট ইজারাদার, কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী ও মৌসুমি শ্রমিকরা। প্রতিবছর কোরবানিকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থ প্রবাহ বাড়ায়, যা স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে চাঙ্গা করে।

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত বর্তমানে জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ অবদান রাখছে। যদিও এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি, তারপরও কোরবানিকেন্দ্রিক উৎপাদন দেশের অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কোরবানির চিত্রও পরিবর্তনের বার্তা দেয়। ২০২৫ সালে রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২৩ লাখ ২৪ হাজার পশু কোরবানি হয়েছে। এরপর ঢাকায় প্রায় ২১ লাখ ৮৫ হাজার পশু। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো এখন গবাদিপশু উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। চরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় ঘাস চাষ এবং খামার সম্প্রসারণ এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে এই অর্জনের মাঝেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে খামারিদের সবচেয়ে বড় সংকট পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি। ভুট্টা, খৈল, খড়, ঘাস ও অন্যান্য খাদ্য উপকরণের মূল্য বাড়তে থাকায় উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষুদ্র খামারি ব্যাংকঋণ বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পান না। ফলে তারা উচ্চ সুদে ধার নিয়ে খামার পরিচালনা করতে বাধ্য হন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো বাজার ব্যবস্থাপনা। অনেক সময় খামারিরা ন্যায্যমূল্য পান না, অথচ ভোক্তাদের উচ্চমূল্যে পশু কিনতে হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে খামারি ও ক্রেতা— উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হন। আধুনিক ও ডিজিটাল হাট ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অনলাইন পশুর হাটের ধারণা করোনাকালে জনপ্রিয়তা পেলেও সেটিকে এখনও পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়নি।

পশুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত মোটাতাজাকরণের জন্য ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা ওষুধ ব্যবহার করে থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও সরকারের নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও এ বিষয়ে আরও কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পশু উৎপাদনের জন্য খামারিদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড় গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলছে। চরাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলের খামারিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই জলবায়ু-সহনশীল খামার ব্যবস্থাপনা ও অভিযোজন কৌশল এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের কোরবানির পশু খাতকে আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—

প্রথমত, খামারিদের জন্য সহজশর্তে ঋণ ও বীমা সুবিধা বাড়াতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগে ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে পশুবীমা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশীয় জাতের গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অভিযোজন শক্তি অনেক বেশি। উন্নত জাতের সঙ্গে দেশীয় জাতের বৈশিষ্ট্য সমন্বয় করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, পশুখাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা বাড়াতে হবে। পতিত জমি, চরাঞ্চল ও রাস্তার পাশের খালি জমিতে ঘাস চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে খাদ্য সংকট অনেকাংশে কমবে।

চতুর্থত, আধুনিক কোরবানির হাট গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা গেলে হাট ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।

পঞ্চমত, কোরবানির পর চামড়া শিল্পকে আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রতিবছর কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হলেও সঠিক সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পায় না।

সবশেষে বলতে হয়, কোরবানির পশুতে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা শুধু একটি কৃষিভিত্তিক অর্জন নয়; এটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। এই সাফল্য প্রমাণ করে, পরিকল্পিত নীতি, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং মানুষের পরিশ্রম একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ যেকোনো খাতেই আত্মনির্ভরতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

আজ দেশের খামারিরা আর শুধু কোরবানির বাজারের চাহিদা পূরণ করছেন না; তারা জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছেন। গ্রামীণ বাংলাদেশে যে নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব চলছে, কোরবানির পশুতে স্বনির্ভরতা তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। এই অর্জনকে টেকসই ও আধুনিক রূপ দিতে পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ শুধু নিজস্ব চাহিদা পূরণই করবে না, বরং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তোলার পথেও এগিয়ে যাবে।

লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট, সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা, বাংলাদেশ

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

শিশু ধর্ষণ-হত্যা: রাষ্ট্র ও সমাজের দায়

রামিসা আর ফিরে আসবে না। তার ছোট্ট জীবনের নির্মম সমাপ্তি কোনো শাস্তিই পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে না জাগায়, যদি বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় আত্মসমালোচনা তৈরি না করে, তবে আমরা আরও অনেক রামিসাকে হারাব।

১৬ দিন আগে

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্য

১৬ দিন আগে

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

১৭ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

১৮ দিন আগে