ঘৃণার রাজনীতি নয়, ভালোবাসার ভাষাই হোক সংসদের শক্তি

জাকির আহমদ খান কামাল

জাতীয় সংসদ একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক। এখানে জনগণের প্রতিনিধিরা মতভেদ, বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ নির্ধারণ করেন। কিন্তু সেই বিতর্ক যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ, ঘৃণা বা বিদ্বেষের ভাষায় রূপ নেয়, তখন তা গণতন্ত্রের সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর এক সদস্য রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে তীব্র সমালোচনামূলক বক্তব্য দেওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী যে ভিন্ন এক ভাষা— ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ইতিবাচক রাজনীতির গল্প উপস্থাপন করেছেন, তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন। তাকে কেন্দ্র করে মতভেদ বা সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে শালীন, যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল। সংসদ কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের মঞ্চ নয়; এটি রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই কোনো বক্তব্য যদি ঘৃণা বা অবমাননার ইঙ্গিত বহন করে, তবে তা সংসদের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন— যেখানে ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসা, বিভেদের বিপরীতে ঐক্যের আহ্বান— তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। রাজনীতিতে মতভেদ থাকবেই, কিন্তু সেই মতভেদের প্রকাশ যদি মানবিকতা ও সহনশীলতার মাধ্যমে হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে। ইতিহাস বলছে, যে রাজনীতি মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে, তা শেষ পর্যন্ত সমাজকে দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে সহমর্মিতা, সংলাপ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বাকযুদ্ধ, পারস্পরিক দোষারোপ ও রাজনৈতিক বিভাজনের চিত্র দেখা যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে রাজনীতির প্রতি আস্থা কমে যায়। অথচ সংসদ যদি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ তৈরি করতে পারে, তবে তা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিরোধিতা থাকবে, তীব্র সমালোচনাও থাকবে, কিন্তু তা যেন কখনোই ঘৃণা বা অবমাননার সীমা অতিক্রম না করে।

এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাদের মনে রাখতে হবে— তারা কেবল একটি দলের প্রতিনিধি নন, বরং পুরো জাতির সামনে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছেন। তাই বক্তব্যে সংযম, যুক্তি ও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, রাজনীতির ময়দানে ঘৃণা খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। তবুও একটি পরিপক্ব গণতন্ত্রের জন্য সেই কঠিন পথটিই বেছে নেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় সংসদ যদি ঘৃণার বদলে ভালোবাসা, বিদ্বেষের বদলে যুক্তি ও সম্মানের ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নয়, দুর্নীতি কমাতে হবে

গত ২৫ বছরের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও অনৈতিক। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে জনগণের ত্রাহি অবস্থা। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত জনগণের কাঁধে বোঝার ওপর শাকের আঁটি বলেই মনে করছে সাধারণ মানুষ।

৫ দিন আগে

যুদ্ধের ১০০ দিন: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন সমীকরণ

যুদ্ধের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক শক্তির সামনে ইরান দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়বে— এমন ভবিষ্যদ্বাণীও কম ছিল না। কিন্তু ১০০ দিন পর যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে প

৫ দিন আগে

কোরবানির পশুতে স্বনির্ভরতা: বদলে যাওয়া অর্থনীতির গল্প

আজ বাংলাদেশ শুধু কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সক্ষমতাও অর্জন করেছে। এটি নিছক কৃষি বা প্রাণিসম্পদ খাতের সাফল্য নয়; এটি গ্রামীণ উন্নয়ন, যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর অংশগ্রহণ এবং জাতীয় অর্থনীতির এক অনন্য অর্জনের গল্প।

৭ দিন আগে

রামিসার বিচার শুরু: প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও আশার আলো

রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রীর এ তাৎক্ষণিক গমন সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। নিজের ব্যস্ত সূচি ও মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে গভীর রাতে পল্লবীর একটি সাধারণ বাসভবনে তার ছুটে যাওয়া প্রমাণ করে, প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রামিসার পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছে এটি এক বড় সান্ত্বনা যে তারা

১১ দিন আগে