তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা, সাহস ফিরে পাওয়ার গল্প

জান্নাতুল নওরিন উর্মি

রাজনীতিতে টিকে থাকা সব সময় স্লোগান বা পদ-পদবির বিষয় নয়। অনেক সময় রাজনীতি মানে হলো দীর্ঘদিনের মানসিক লড়াই, অব্যক্ত ক্ষত আর নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। কখনো কখনো একটি কথাই সেই লড়াইয়ে মানুষকে আবার দাঁড়াতে সাহায্য করে। একজন নারীর জন্য সেই প্রতিবন্ধকতা দ্বিগুণ।

২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এমনই একটি দিন হয়ে থাকবে আমার জীবনে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। ভেবেছিলাম, দূর থেকেই সালাম দেওয়া যাবে— এইটুকুই। কিন্তু সেই সাক্ষাৎ আমার কাছে শুধু আনুষ্ঠানিক কোনো দেখা নয়, বরং আমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে মানবিক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।

পরিচয় দিলাম, আর তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বললেন। বললেন, ‘নওরিন, এখন কেমন আছো? শারীরিকভাবে সুস্থ আছো?’

এই একটি প্রশ্নেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, তিনি আমার জীবনের কঠিন সময়গুলোর কথা মনে রেখেছেন। কয়েক মাস আগে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম। আমি আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম— যা আমার নিতান্তই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। একটি গোষ্ঠী আমাকে ২০২০ সালে লীগ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার ও নারী নির্যাতন মামলার ভিকটিম হিসেবে নিয়ে সাইবার বুলিং করত। আমি এখনও পুরুষদের মাঝে রাজনীতি করি— এ নিয়েও নানা কথা বলা হতো।

আমি যে নারী নির্যাতন মামলার ভিকটিম, সেই কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর আমার বাবা— তাকেও শুনতে হয়েছে, ‘এত কিছুর পর মেয়েকে কেন রাজনীতি করতে দেয়!’ ৫ আগস্টের পর ভেবেছিলাম আমার লড়াই শেষ। কিন্তু তারপর অনলাইনে কিছু আইডির এমন হ্যারাসমেন্ট ও স্লাট-শেমিং আমি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারিনি।

আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে অনেক কিছু শিখেছি। আজ আমি জানি, এমন দুর্বল সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি। আমার পরিবার, দল ও দলের নেতাকর্মীরা আমার পাশে ছিল। তারা সাংগঠনিকভাবে এসব হ্যারাসমেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান আমার ও আমার পরিবারের পাশে ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে তিনি ও দল যে সাপোর্ট দিয়েছেন, তা তার মনে আছে। আমি সেদিন বাঁচতে চাইনি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফেরার পর তার দেওয়া অনুপ্রেরণায় আমি আবার শক্ত হয়ে দাঁড়াই, সুস্থ হই এবং রাজনৈতিক ময়দানে আগের থেকেও সক্রিয় হই।

সেদিনের আত্মহননের চেষ্টার ভুল সিদ্ধান্তে কিছু মানুষ আমাকে দুর্বল বলে। আমি মানি, সেটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না— আমি ভুল করেছি, শিখেছি। কোনো সমালোচনা তোয়াক্কা করিনি, চেষ্টা করা ছাড়িনি। সুস্থ হয়ে সংগঠন টিবিআর তৈরি করেছি, ডিজিটাল লিটারেসি সেমিনার ও ট্রেনিং আয়োজন করেছি। ভিকটিম নারীরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।

ডিজিটাল লিটারেসি ও সচেতনতা নিয়ে আমার দল বিএনপির পলিসি-মেকিং লেভেলে কাজ করেছি, যেন আমার মতো মানসিক বিপর্যয়ের শিকার আর কোনো নারী না হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকল দল-মতের গৃহিণী, শ্রমিক, কর্মজীবী ও রাজনৈতিক নারীদের সামাজিক ও মানসিক সুরক্ষা নিয়ে কাজ করছি। ইউএন উইমেনের সঙ্গে কাজ করেছি, শ্রীলঙ্কায় জাতিসংঘের ফেলোশিপ করেছি। সবকিছুর অনুপ্রেরণা ছিল রাজনীতি।

সমালোচকেরা যেমনই বলুক, কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে আমি প্রতিদিন লড়েই বাঁচতে চাই। আমি দুর্বল নই। আমার জীবনের বাস্তবতা, ভাগ্য ও অতীত মেনে বাঁচব, ইনশাআল্লাহ। জনাব তারেক রহমানের কথায় ও আচরণে আমি সাহস পেলাম— আমি ঠিক পথে আছি।

সাক্ষাতের সময় আরেকটি মুহূর্ত আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে লীগের নির্যাতনের ঘটনায় তিনি চিকিৎসার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি যখন বললেন, ‘তোমার পায়ের কী অবস্থা?’

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে মঞ্চে জান্নাতুল নওরিন উর্মি। ছবি: লেখকের সৌজন্যে
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে মঞ্চে জান্নাতুল নওরিন উর্মি। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমি অবাক হয়ে বসে পড়লাম। ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। ২০২০ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে আমি সভাপতি পদপ্রার্থী ছিলাম। সে ঘটনার জের ধরে ২০২০ সালের ১ মার্চ ছাত্রলীগের নির্যাতনের ঘটনাও তার মনে আছে— যা শুনে আমার চোখে পানি এসে যায়।

দীর্ঘ দেড় মাস ঢাকায় হাসপাতালে রেখে চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান আমার চিকিৎসা করান। আমার পরিবার আমাকে নিয়ে বরিশাল শহর ছেড়ে দেয়। বিশেষ করে মা আমাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি করান। দীর্ঘ সময় ধরে নারী নির্যাতন মামলার ভিকটিম হিসেবে আমাকে সহ্য করতে হয়েছে হাজারো সামাজিক অপমান ও গ্লানি। আমার পরিবারকে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রভাবশালী গোষ্ঠী হুমকি দিত।

যে নির্যাতনের চিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছি, তার বিচার আজও পাইনি। দেশের অনেক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল এই সংবাদ, কিন্তু আসামিরা এখনও বিচারের বাইরে— কেউ দেশ থেকে পালিয়েছে। আমি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। বহু লড়াইয়ের পর ছাত্রত্ব ফিরে পাই। তার ছয় বছর পরেও সেই লোমহর্ষক ঘটনা তার মনে আছে।

তিনি শুধু রাজনৈতিক নির্যাতনের কথাই নয়, আমার মেধাভিত্তিক কাজের কথাও মনে রেখেছেন। তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে অনলাইন আলোচনার প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, স্মার্ট মডুলার নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট।’

আমি অবাক হইনি এবার, কারণ বুঝলাম তিনি কর্মীদের মনে রাখেন। ওই অনলাইন সেমিনারে জনাব তারেক রহমান ও বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা টানা এক ঘণ্টা আমাকে প্রজেক্ট নিয়ে খুঁটিনাটি প্রশ্ন করেছিলেন।

প্রতিকূলতা এসেছে, তবুও আমি রাজনীতি ছাড়িনি। রাজপথের পাশাপাশি দলের বিভিন্ন মেধাভিত্তিক সংগঠনে কাজ করেছি। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের একটি সায়েন্স ফিকশন প্রজেক্ট অনুষ্ঠানে ২০২১ সালে জনাব তারেক রহমানের সামনে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে স্মল মডুলার নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রেজেন্টেশন দিয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে থাকাকালীন সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। প্রথমে খুলনা-বরিশালের মানুষ, পরে পুরো দেশ এই আন্দোলনে সরব হয়েছিল। ম্যাডাম খালেদা জিয়া সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনকে গণমানুষের আন্দোলনে পরিণত করেন। মূলত সেই ধারণার জায়গা থেকেই সায়েন্স ফিকশন প্রজেক্টটি তৈরি করি। আমার সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল ঢাবির নিউক্লিয়ার সায়েন্সের এক বন্ধু, সে টেকনিক্যাল জ্ঞান দিয়েছিল।

আমি শুধু কাছাকাছি বসে তার মুখে আমার নামটা শুনলাম। অদ্ভুতভাবে কেউ আমাকে তাড়া দেয়নি, কেউ আটকায়নি। আল্লাহর রহমতে সময় পেয়ে গেছি। লাখো মানুষের মাঝে বসে, যে দলের জন্য, যে নেতার জন্য এতকাল লড়েছি— তাকে দেখা ও কথা বলার সুযোগ নসিব হলো।

উঠে আসার সময় আমি কাঁদছিলাম। বলেছিলাম, ‘স্যার, চলে গেলাম। এটা তো সিনিয়রদের মঞ্চ। আপনি ভালো থাকবেন।’

সবশেষে সালাম দিয়ে বিদায় নিতে গেলে তিনি শুধু বললেন, ‘নিজের যত্ন নিও।’

আমি তখন অঝোরে কেঁদেছি। নিজেকে সামলাতে পারিনি। নিরাপত্তার একজন জিজ্ঞেস করলেন, আমি অসুস্থ বোধ করছি কি না, পানি খাব কি না। আমি বললাম, ঠিক আছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই সব দিন, যা রাজনৈতিক হওয়ার কারণে আমাকে পাড়ি দিতে হয়েছে।

আমি যেন চিৎকার করে কাঁদতে চাইছিলাম, হালকা হতে চাইছিলাম। আমি দুনিয়ার সবাইকে বলতে চাই— কত অসম্ভব কঠিন ছিল আমার লড়াই, আজও কত কঠিন।

আমাকে শহর ছাড়তে হয়েছে, পরিবার, ক্যারিয়ার, আত্মীয়স্বজন—জীবনের বহু সুন্দর সম্ভাবনা হারিয়েছি এই রাজপথে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কারাবাসেও দিন কাটিয়েছি। তবুও মনে হয়েছে, একদিন ভোট ও ভাতের অধিকার পাব। জনাব তারেক রহমানকে বলতে চেয়েছি— আমি কত কিছু সয়েছি। তৃণমূলের একজন সাধারণ নারী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এটুকুই ছিল আমার স্বপ্ন।

‘দ্য পারস্যুট অব হ্যাপিনেস’ সিনেমার উইলিয়াম স্মিথের মতো মনে হলো— ‘This part of my life, this little part, is called happiness.’

এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃণমূলের খোঁজ রাখেন— তিনি কর্মী নওরিনের গল্প জানেন। শুধু এজন্যই আমরা পরিবারসহ বংশ পরম্পরায় বিএনপি করেছি, করব ইনশাআল্লাহ।

আমার বাবা-মা ও পরিবার এত বছর শক্তভাবে পাশে ছিল— এ আল্লাহর রহমত। আমার মতো অতি সাধারণ একটি মেয়ের আজকের রাজনৈতিক নওরিন হয়ে ওঠা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। জানি না গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিত করার পর জীবনে কী করব।

তবে আমি আমার ঈমানি যুদ্ধে সফল— আলহামদুলিল্লাহ। আজ পর্যন্ত প্রতিদিন অনেক কিছু হারিয়েছি, কারণ আমি রাজনীতি বেছে নিয়েছি— অথবা রাজনীতি আমাকে বেছে নিয়েছে। সময়ই তার উত্তর দেবে। তবুও আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। সকল প্রশংসা আল্লাহর।

নারীদের জন্য এই সমাজে সব পথই কঠিন, রাজনীতি একটু বেশিই কঠিন।

লেখক: জান্নাতুল নওরিন উর্মি, সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৫ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৬ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

৯ দিন আগে

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৯ দিন আগে