স্লোগানে বন্দি ‘চেতনা’, কাজে প্রতিফলন থাকবে?

এম ডি মাসুদ খান

বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক গৌরবের এক দীর্ঘ উত্তরাধিকার। এই ঐতিহ্যের ভিত্তিতেই আমাদের জাতীয় পরিচয়— বাংলাদেশি। আমরা সেই জাতি, যারা ‘চেতনা’ শব্দটি এত বেশি ব্যবহার করি যে মাঝে মাঝে মনে হয়— এটি হয়তো দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ‘অফিশিয়াল সফটওয়্যার আপডেট’।

কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই পরিচয় কি আজ কেবল আবেগ ও স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ? নাকি বাস্তব জীবনেও তার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটছে?

স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়েছে। কৃষি, পোশাকশিল্প, রেমিট্যান্স ও মানবসম্পদে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। তবে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও ন্যায্য সমাজব্যবস্থা এখনো অধরা। এর পেছনে অন্যতম কারণ দায়িত্বহীনতা, নৈতিক অবক্ষয় ও সুশাসনের ঘাটতি; যেগুলো নিয়ে আমরা প্রায়ই ‘খুব সিরিয়াস’ আলোচনা করি, বিশেষ করে টকশোতে চা-নাশতার বিরতির সময়।

আজ দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বেকারত্ব আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষাব্যবস্থার মানগত বৈষম্য, গবেষণার ঘাটতি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অভাব তরুণ প্রজন্মকে পিছিয়ে দিচ্ছে। অনেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হয়, কিন্তু বাস্তব দক্ষতা এমন অবস্থায় থাকে যেন ‘সিভিতে লেখা আছে এক্সপার্ট, কিন্তু বাস্তবে ইউটিউব টিউটোরিয়ালেই নির্ভরতা’।

স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এখনো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সংকট। হাসপাতাল আছে, ডাক্তার আছে— কখনো কখনো শুধু রোগীর তুলনায় ‘অপেক্ষার তালিকা’ বেশি সক্রিয় থাকে। আর সিরিয়াল পাওয়াটা এমন এক দক্ষতা, যা এমবিএ ডিগ্রির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

পরিবেশগত বিপর্যয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দূষণ আমাদের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে। শহরে বৃষ্টি হলে আমরা আরাম পাই না, আমরা নতুন করে ‘নদী গবেষণা প্রকল্প’ শুরু করি। কারণ রাস্তাগুলো তখন হঠাৎ করেই পদ্মা-মেঘনা-যমুনার রূপ নেয়।

দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক সময় মনে হয়— ফাইলের গতি পরীক্ষা করতে আলাদা করে ‘ঘড়ি’ লাগবে। কারণ সময় সেখানে সাধারণ সময়রেখা অনুসরণ করে না।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো সুশাসন ও নাগরিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমে নিজেদের উন্নত করেছে। আমরা ভৌগোলিক ও মানবসম্পদে সমৃদ্ধ হয়েও মাঝে মাঝে উন্নয়নকে দেখি ‘ভবিষ্যতের স্থায়ী প্রকল্প’ হিসেবে, যার উদ্বোধন সবসময় পরের নির্বাচনের পরেই নিশ্চিত।

এর মূল কারণ রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীলতার ঘাটতি। রাজনীতি, প্রশাসন ও নাগরিক জীবনে স্বার্থপরতা ও স্বল্পমেয়াদি চিন্তা জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে চেতনার কথা বলা হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ অনেক সময় ‘স্টেজ প্রোগ্রামের ব্যানারে সীমাবদ্ধ’ থেকে যায়।

স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ— রাষ্ট্রের এই মৌলিক স্তম্ভগুলোও আজ কথিত চেতনার বলি হয়ে পড়েছে। জনগণের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয় প্রচুর, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে মনে হয়, সবাই শুধু ‘কমিটি গঠন’ পর্যায়েই দক্ষ।

আরও গভীর বাস্তবতা হলো— এই সমস্যাগুলো কেবল পরিস্থিতির ফল নয়, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে ক্ষমতা-অনিয়ম ও স্বার্থান্বেষী চক্রের কারণে। তবে দায় শুধু ‘ওদের’ নয়, আমরাও সবাই কোনো না কোনোভাবে এর অংশীদার। আমাদের নীরবতা, আপসপ্রবণতা এবং ও ‘চুপ থাকলে ঝামেলা কম’ দর্শনও বাস্তবতাকে দীর্ঘায়িত করেছে।

আজ তাই প্রয়োজন কেবল চেতনার উচ্চারণ নয়, বরং তার বাস্তব প্রয়োগ। নাগরিক হিসেবে দায়িত্ববোধ, আইনের শাসন, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতাই হতে পারে পরিবর্তনের মূল ভিত্তি, যেখানে ‘স্লোগান’ নয়, ‘কাজ’ হবে মূল পরিচয়।

একটি উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে রাজনীতি হতে হবে দেশকেন্দ্রিক, প্রশাসন হতে হবে জনসেবামূলক এবং নাগরিক জীবন হতে হবে দায়িত্বশীল ও নৈতিক। শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শেষ প্রশ্ন একটাই— আমরা কবে চেতনাকে স্লোগান থেকে নামিয়ে কর্মে রূপ দেবো? নাকি আমরা এখনো বিশ্বাস করি, শুধু ‘উচ্চারণ করলেই পরিবর্তন ঘটে যায়’, বাকিটা সময়ই ঠিক করে নেবে?

চেতনা তখনই অর্থবহ, যখন তা আচরণ, নীতি ও বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়। সেই দিনই হবে প্রকৃত উন্নত বাংলাদেশ গড়ার সূচনা।

লেখক: কলামিস্ট ও ব‍্যবসায়ী

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

৪ দিন আগে

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৫ দিন আগে

ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় জলসম্পদের ভূরাজনীতি

এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ বাংলাদেশ। কারণ দেশের ৮০ শতাংশের বেশি নদীপ্রবাহ আন্তঃরাষ্ট্রীয় উৎস থেকে আসে। কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি পানির ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এরই মধ্যে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

৬ দিন আগে

ভিক্ষাবৃত্তির বিস্তার ও আমাদের দায়

ঘটনাটি শুনতে কঠোর, এমনকি কিছুটা অমানবিকও মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে একটি গভীর সামাজিক বার্তা রয়েছে— অনেক উন্নত সমাজে ভিক্ষাবৃত্তিকে শুধু দারিদ্র্যের বিষয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি কর্মসংস্কৃতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করা হয়।

৭ দিন আগে