
ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

‘যে পাখি আকাশে উড়বে, সে পাখি বাসাতেই পাখা দ্রুত ঝাপটাতে থাকে’— এমন একটি প্রবাদতুল্য কথা আমি আমার মায়ের কাছে শুনেছিলাম। শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে এই বোধটিই জেগে ওঠে। বারবার পড়লে অনেক বিষয়ে মনের নতুন দিগন্ত ও দরজা খুলে যায়।
আত্মজীবনীটি শেখ মুজিব লিখেছেন ১৯৬৬-৬৯ সময়ের মধ্যে জেলে থাকাবস্থায়। এখন হিসাব নিয়ে বসতে হয়। শেখ মুজিব জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। ১৯৬৬ সালে তার বয়স ৪৬ বছর। এই ৪৬ বছরের মধ্যে এই ব্যক্তিটি সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী বা এ কে ফজলুল হকের স্নেহভাজন এবং কখনো কখনো বিরাগভাজন হয়েছিলেন।
এই ৪৬ বছর বয়সের মধ্যে তিনি পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন, কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সামলাতে আসন্ন সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে ফরিদপুরে রেখে নেতার নির্দেশ মাথা পেতে নিয়েছিলেন। তিনি আবার সিলেট পাকিস্তানে থাকবে না ভারতে যাবে— সে বিষয়টি নির্ধারণের গণভোটে পাকিস্তানের পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন। আমাদের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান এই সিলেট গণভোটের প্রচারে গিয়ে শেখ মুজিবের সান্নিধ্যে এসেছিলেন।
শেখ মুজিব পাকিস্তান অর্জনের পূর্বেই কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় বেকার হোস্টেলে অবস্থানরত শেখ মুজিবের কক্ষটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই কক্ষটিই বলে দেয় তিনি কী মাপের নেতা ছিলেন।
পাকিস্তান অর্জনের পর তার ঢাকার জীবন শুরু হয়। এখানে তিনি প্রায় অপরিচিতই ছিলেন। তাকে পাত্তা দেওয়ার মতো তেমন কোনো কারণ ছিল না। তারপরও খেয়াল করুন— তিনি ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছাত্রত্ব হারান চিরদিনের জন্য। তার সহকর্মী বন্ধুরা মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব উদ্ধার করলেও তিনি তা করেননি। এ ঘটনা যখন ঘটে তখন তার বয়স ছিল ২৯ বছর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আপসহীন ছিলেন।
আওয়ামী লীগ গঠনেও শেখ মুজিবের ভূমিকার কথা সবারই জানা। জেলে থেকেই নবগঠিত আওয়ামী লীগের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ— যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব তিনি পেয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী বা মাওলানা ভাসানীর মতো নেতারা অকারণে তাকে সে পদে বসাননি।
প্রসঙ্গত, কেউ কেউ শেখ মুজিবকে ‘অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক’ হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেন। তার কট্টর সমালোচক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সেদিনের যুগ্ম সম্পাদক পদপ্রত্যাশী অলি আহাদ তার গ্রন্থে লিখেছেন, সে সময়ে আওয়ামী লীগের একজনই যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তী জীবনে অলি আহাদ একান্ত আলোচনায় আমাকে বলেছিলেন— ‘ভাইয়ের মতো ব্যাডা (পুরুষ) এ মুল্লুকে আগে কখনো জন্ম নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও জন্ম নেবে না।’ এই মূল্যায়ন অলি আহাদের নিরপেক্ষতা, হৃদয়ের প্রসারতা ও শেখ মুজিবের অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতি ছাড়া আর কী?

শেখ মুজিব ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ছাড়াও গণতান্ত্রিক যুবলীগ সংগঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন। ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকাও কারও অজানা নয়। এ বিষয়ে তাকে বিতর্কিত করার প্রয়াসী বদরুদ্দিন উমরও স্বীকার করেছেন, তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে যেচে কথা বলেছেন। মেধাবী ছাত্র, সুলেখক ও তৎকালীন মুসলিম লীগের বাঘা নেতা আবুল হাশিমের ছেলে বদরুদ্দিন উমর অকারণে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বলেননি।
ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের পর বাংলা ভাষার সরকারি স্বীকৃতি আসে। শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় সারির নেতা ছিলেন। হক, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর উজ্জ্বলতার পাশে অন্যদের ম্লান হওয়ারই কথা। কিন্তু তারপরও শেখ মুজিব সে সময়ে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রী হয়েছিলেন।
শেখ মুজিব পরে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে শুধু দলের সাধারণ সম্পাদক পদ বা দলীয় দায়িত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। মন্ত্রিত্ব না দলের সাধারণ সম্পাদক— এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদটিই বেছে নেন। আর সেই পদকে কেন্দ্র করেই তিনি স্বপ্নের সিঁড়ি তৈরি করেছিলেন। সেই সিঁড়ি বেয়েই আমাদের স্বাধীনতা এসেছে।
তার আগে এবং তারপর জেলই ছিল শেখ মুজিবের অনেকটা স্থায়ী ঠিকানা। সে তাপদাহ অনেকেই সইতে পারেননি। শেখ মুজিবের সমসাময়িক অনেক নেতা স্ত্রীর আঁচল ধরে রাজনীতি থেকে সরে গেছেন, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যক্তিগত বৈভবের পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু শেখ মুজিব— সেই বঙ্গশার্দূল— ত্যাগ, তিতিক্ষায় অতুলনীয়, নির্লোভ, নির্মোহ, আপসহীন ও লক্ষ্যাভিমুখী হয়েই রয়ে গেলেন।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সারা দেশে মার্শাল ল জারি করে রাজনীতির কণ্ঠরোধ করেন। রাজনীতিবিদদের জেলে ঠেলে দেন। পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্যের পাহাড় ক্রমশ আরও দৃশ্যমান হচ্ছিল। সে সবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব প্রায়ই জেলে যেতেন। কিন্তু তারই ফাঁকে তিনি ছাত্রলীগকে সক্রিয় করার চেষ্টা চালান।

আমার আজও মনে পড়ে, তার বার্তাবাহক একজনের সঙ্গে ১৯৫৯ সালে আমার কথা হয়েছিল। তার স্নেহধন্য কয়েকজন নেতার উৎসাহ ও ত্যাগী মনোভাবের কারণে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন তীব্রতর হয়। এর মাধ্যমে আইয়ুবকে প্রবল ধাক্কা দেওয়া হয় এবং কম করে হলেও আইয়ুব মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
নেতা সোহরাওয়ার্দীর রহস্যময় মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবই দলের পুনর্গঠন করেন। এতদিন বড় গাছটির নিচে ছোট গাছটি বাড়তে অসুবিধা হচ্ছিল; এখন ছোট গাছটি মাথা তুলে ক্রমশ বৃহত্তর হয়ে উঠতে থাকে। যে কথা নেতা সোহরাওয়ার্দীর সময়ে সরবে বলা সম্ভব ছিল না— অর্থাৎ দুই অর্থনীতি বা বৈষম্যের কথা— তিনি উচ্চস্বরে বলতে শুরু করলেন।
অবশ্য নেতা সোহরাওয়ার্দী এটি আগেই অনুমান করেছিলেন। তিনি মৃত্যুর আগে পাকিস্তানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমরা বৈষম্যের অবসান ঘটাও, নতুবা আমি মরে গেলে শেখ মুজিব একদিন পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করে ছাড়বে।’
১৯৬৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আইয়ুব খান তার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে কাশ্মির দখলের উদ্যোগ নেন। সেপ্টেম্বরের ১৭ দিনের যুদ্ধে ভারতের কাছে পরাজিত হয় পাকিস্তান। এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। এ অবস্থায় প্যারামিলিটারি গঠনসহ ছয় দফা প্রস্তাব পেশের অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি হয়। আমরা সেদিন দেখলাম— বাসায় ধড়ফড় করা পাখিটি সত্যিই পাখা ঝাপটিয়ে উড়তে শিখেছে।
এ অবস্থায় শেখ মুজিব পাকিস্তানে বসেই পাকিস্তানের মৃত্যুঘণ্টা— ছয় দফার নিনাদ বাজালেন। ছয় দফার কারণে তাকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। এরই মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়, যেখানে তাকে এক নম্বর আসামি করা হয়। মামলার মূল অভিযোগ ছিল— তিনি ভারতের আগরতলায় গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে সশস্ত্র উপায়ে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেছেন। মামলা চলাকালে স্পষ্ট হচ্ছিল, তাকে হয়তো ফাঁসি দেওয়া হবে। তারপরও তিনি আপসের পথ ধরেননি।

অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান শেখ মুজিব। ২৩ ফেব্রুয়ারি এক সমাবেশে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপরের ঘটনাবলি সবার জানা। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১— মাত্র তিন বছরের মধ্যে তিনি জাতির পিতায় উন্নীত হন।
শেখ মুজিব পাকিস্তানের ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন পাকিস্তান সে জন্য অনুর্বর ক্ষেত্র, তখনই তিনি তার আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য একটি নতুন ভূখণ্ডের কথা ভাবতে শুরু করেন।
২০০৪ সালে বিবিসির বিশ্বজনীন জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। শত প্রতিকূলতার মাঝেও এই পরিচিতি পরবর্তী জরিপেও অটুট রয়েছে।
আজ তার জন্মদিন। তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন, তবে অহেতুক তর্ক বা অপরের চরিত্রহনন তার ভক্ত-অনুরাগীদের কাছ থেকেই হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। মহানবি (সা.) একবার বলেছিলেন, ‘আমাকে নিয়ে এমন কোনো আলোচনা বা বিতর্কের সূচনা করো না, যা প্রতিপক্ষকে আমার ব্যাপারে কটূক্তি করার সুযোগ দেয়।’ মহানবীর এই দর্শনটি বঙ্গবন্ধু অনুসারীরাও নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারেন।
লেখক: শিক্ষাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমি সম্মানিত ফেলো

‘যে পাখি আকাশে উড়বে, সে পাখি বাসাতেই পাখা দ্রুত ঝাপটাতে থাকে’— এমন একটি প্রবাদতুল্য কথা আমি আমার মায়ের কাছে শুনেছিলাম। শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে এই বোধটিই জেগে ওঠে। বারবার পড়লে অনেক বিষয়ে মনের নতুন দিগন্ত ও দরজা খুলে যায়।
আত্মজীবনীটি শেখ মুজিব লিখেছেন ১৯৬৬-৬৯ সময়ের মধ্যে জেলে থাকাবস্থায়। এখন হিসাব নিয়ে বসতে হয়। শেখ মুজিব জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। ১৯৬৬ সালে তার বয়স ৪৬ বছর। এই ৪৬ বছরের মধ্যে এই ব্যক্তিটি সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী বা এ কে ফজলুল হকের স্নেহভাজন এবং কখনো কখনো বিরাগভাজন হয়েছিলেন।
এই ৪৬ বছর বয়সের মধ্যে তিনি পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন, কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সামলাতে আসন্ন সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে ফরিদপুরে রেখে নেতার নির্দেশ মাথা পেতে নিয়েছিলেন। তিনি আবার সিলেট পাকিস্তানে থাকবে না ভারতে যাবে— সে বিষয়টি নির্ধারণের গণভোটে পাকিস্তানের পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন। আমাদের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান এই সিলেট গণভোটের প্রচারে গিয়ে শেখ মুজিবের সান্নিধ্যে এসেছিলেন।
শেখ মুজিব পাকিস্তান অর্জনের পূর্বেই কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় বেকার হোস্টেলে অবস্থানরত শেখ মুজিবের কক্ষটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই কক্ষটিই বলে দেয় তিনি কী মাপের নেতা ছিলেন।
পাকিস্তান অর্জনের পর তার ঢাকার জীবন শুরু হয়। এখানে তিনি প্রায় অপরিচিতই ছিলেন। তাকে পাত্তা দেওয়ার মতো তেমন কোনো কারণ ছিল না। তারপরও খেয়াল করুন— তিনি ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে অংশ নিয়ে ছাত্রত্ব হারান চিরদিনের জন্য। তার সহকর্মী বন্ধুরা মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব উদ্ধার করলেও তিনি তা করেননি। এ ঘটনা যখন ঘটে তখন তার বয়স ছিল ২৯ বছর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আপসহীন ছিলেন।
আওয়ামী লীগ গঠনেও শেখ মুজিবের ভূমিকার কথা সবারই জানা। জেলে থেকেই নবগঠিত আওয়ামী লীগের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ— যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব তিনি পেয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী বা মাওলানা ভাসানীর মতো নেতারা অকারণে তাকে সে পদে বসাননি।
প্রসঙ্গত, কেউ কেউ শেখ মুজিবকে ‘অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক’ হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেন। তার কট্টর সমালোচক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সেদিনের যুগ্ম সম্পাদক পদপ্রত্যাশী অলি আহাদ তার গ্রন্থে লিখেছেন, সে সময়ে আওয়ামী লীগের একজনই যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তী জীবনে অলি আহাদ একান্ত আলোচনায় আমাকে বলেছিলেন— ‘ভাইয়ের মতো ব্যাডা (পুরুষ) এ মুল্লুকে আগে কখনো জন্ম নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও জন্ম নেবে না।’ এই মূল্যায়ন অলি আহাদের নিরপেক্ষতা, হৃদয়ের প্রসারতা ও শেখ মুজিবের অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতি ছাড়া আর কী?

শেখ মুজিব ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ছাড়াও গণতান্ত্রিক যুবলীগ সংগঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন। ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকাও কারও অজানা নয়। এ বিষয়ে তাকে বিতর্কিত করার প্রয়াসী বদরুদ্দিন উমরও স্বীকার করেছেন, তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে যেচে কথা বলেছেন। মেধাবী ছাত্র, সুলেখক ও তৎকালীন মুসলিম লীগের বাঘা নেতা আবুল হাশিমের ছেলে বদরুদ্দিন উমর অকারণে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বলেননি।
ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের পর বাংলা ভাষার সরকারি স্বীকৃতি আসে। শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় সারির নেতা ছিলেন। হক, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর উজ্জ্বলতার পাশে অন্যদের ম্লান হওয়ারই কথা। কিন্তু তারপরও শেখ মুজিব সে সময়ে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রী হয়েছিলেন।
শেখ মুজিব পরে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে শুধু দলের সাধারণ সম্পাদক পদ বা দলীয় দায়িত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। মন্ত্রিত্ব না দলের সাধারণ সম্পাদক— এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদটিই বেছে নেন। আর সেই পদকে কেন্দ্র করেই তিনি স্বপ্নের সিঁড়ি তৈরি করেছিলেন। সেই সিঁড়ি বেয়েই আমাদের স্বাধীনতা এসেছে।
তার আগে এবং তারপর জেলই ছিল শেখ মুজিবের অনেকটা স্থায়ী ঠিকানা। সে তাপদাহ অনেকেই সইতে পারেননি। শেখ মুজিবের সমসাময়িক অনেক নেতা স্ত্রীর আঁচল ধরে রাজনীতি থেকে সরে গেছেন, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যক্তিগত বৈভবের পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু শেখ মুজিব— সেই বঙ্গশার্দূল— ত্যাগ, তিতিক্ষায় অতুলনীয়, নির্লোভ, নির্মোহ, আপসহীন ও লক্ষ্যাভিমুখী হয়েই রয়ে গেলেন।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সারা দেশে মার্শাল ল জারি করে রাজনীতির কণ্ঠরোধ করেন। রাজনীতিবিদদের জেলে ঠেলে দেন। পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্যের পাহাড় ক্রমশ আরও দৃশ্যমান হচ্ছিল। সে সবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব প্রায়ই জেলে যেতেন। কিন্তু তারই ফাঁকে তিনি ছাত্রলীগকে সক্রিয় করার চেষ্টা চালান।

আমার আজও মনে পড়ে, তার বার্তাবাহক একজনের সঙ্গে ১৯৫৯ সালে আমার কথা হয়েছিল। তার স্নেহধন্য কয়েকজন নেতার উৎসাহ ও ত্যাগী মনোভাবের কারণে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন তীব্রতর হয়। এর মাধ্যমে আইয়ুবকে প্রবল ধাক্কা দেওয়া হয় এবং কম করে হলেও আইয়ুব মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
নেতা সোহরাওয়ার্দীর রহস্যময় মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবই দলের পুনর্গঠন করেন। এতদিন বড় গাছটির নিচে ছোট গাছটি বাড়তে অসুবিধা হচ্ছিল; এখন ছোট গাছটি মাথা তুলে ক্রমশ বৃহত্তর হয়ে উঠতে থাকে। যে কথা নেতা সোহরাওয়ার্দীর সময়ে সরবে বলা সম্ভব ছিল না— অর্থাৎ দুই অর্থনীতি বা বৈষম্যের কথা— তিনি উচ্চস্বরে বলতে শুরু করলেন।
অবশ্য নেতা সোহরাওয়ার্দী এটি আগেই অনুমান করেছিলেন। তিনি মৃত্যুর আগে পাকিস্তানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমরা বৈষম্যের অবসান ঘটাও, নতুবা আমি মরে গেলে শেখ মুজিব একদিন পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করে ছাড়বে।’
১৯৬৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আইয়ুব খান তার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে কাশ্মির দখলের উদ্যোগ নেন। সেপ্টেম্বরের ১৭ দিনের যুদ্ধে ভারতের কাছে পরাজিত হয় পাকিস্তান। এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত ছিল। এ অবস্থায় প্যারামিলিটারি গঠনসহ ছয় দফা প্রস্তাব পেশের অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি হয়। আমরা সেদিন দেখলাম— বাসায় ধড়ফড় করা পাখিটি সত্যিই পাখা ঝাপটিয়ে উড়তে শিখেছে।
এ অবস্থায় শেখ মুজিব পাকিস্তানে বসেই পাকিস্তানের মৃত্যুঘণ্টা— ছয় দফার নিনাদ বাজালেন। ছয় দফার কারণে তাকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। এরই মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয়, যেখানে তাকে এক নম্বর আসামি করা হয়। মামলার মূল অভিযোগ ছিল— তিনি ভারতের আগরতলায় গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে সশস্ত্র উপায়ে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেছেন। মামলা চলাকালে স্পষ্ট হচ্ছিল, তাকে হয়তো ফাঁসি দেওয়া হবে। তারপরও তিনি আপসের পথ ধরেননি।

অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান শেখ মুজিব। ২৩ ফেব্রুয়ারি এক সমাবেশে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপরের ঘটনাবলি সবার জানা। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১— মাত্র তিন বছরের মধ্যে তিনি জাতির পিতায় উন্নীত হন।
শেখ মুজিব পাকিস্তানের ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন পাকিস্তান সে জন্য অনুর্বর ক্ষেত্র, তখনই তিনি তার আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য একটি নতুন ভূখণ্ডের কথা ভাবতে শুরু করেন।
২০০৪ সালে বিবিসির বিশ্বজনীন জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। শত প্রতিকূলতার মাঝেও এই পরিচিতি পরবর্তী জরিপেও অটুট রয়েছে।
আজ তার জন্মদিন। তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন, তবে অহেতুক তর্ক বা অপরের চরিত্রহনন তার ভক্ত-অনুরাগীদের কাছ থেকেই হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। মহানবি (সা.) একবার বলেছিলেন, ‘আমাকে নিয়ে এমন কোনো আলোচনা বা বিতর্কের সূচনা করো না, যা প্রতিপক্ষকে আমার ব্যাপারে কটূক্তি করার সুযোগ দেয়।’ মহানবীর এই দর্শনটি বঙ্গবন্ধু অনুসারীরাও নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারেন।
লেখক: শিক্ষাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমি সম্মানিত ফেলো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে। সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সর্বসম্মত। সংসদের সদস্যরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করায় সংসদীয় কার্যক্রমের শুরুতেই একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে।
৪ দিন আগে
এবারের একুশে বইমেলা যে সুপার ফ্লপ করল, আর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা এই ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত বাঙালির প্রাণের উৎসবটির যে কত বড় ক্ষতি করে ফেললাম, তার কারণ, দায় ও উত্তরণ নিয়ে গভীর গবেষণা অত্যন্ত প্রয়োজন।
৫ দিন আগে
দেশের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ হিসেবে আসছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে এই বিশেষ কার্ডের পরিকল্পনা করেছে নতুন সরকার।
৬ দিন আগে
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষা যেভাবে একটি শক্তিশালী একাডেমিক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার পেছনে যাঁদের অবদান অগ্রগণ্য, তাদের মধ্যে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান অন্যতম। তার জীবনকে একটি বাক্যে সংক্ষেপ করা যায় এভাবে— তিনি ছিলেন সাংবাদিকতা শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল সেতুবন্ধন।
৭ দিন আগে