পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর এখনই সময়

ফজলুল বারী
আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৫, ১২: ০৯

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চারটি মূল্যসূচকের মধ্যে দুটি সূচক বেড়েছে। সূচক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ডিএসইএক্স সূচকে মাত্র ৫১ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট যোগ হয়েছে। আর ডিএসই-৩০ সূচক বেড়েছে ২৪ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট। এ সময় ডিএসই শরিয়াহ সূচক ও এসএমই সূচক কমেছে যথাক্রমে ২ দশমিক শূন্য আট ও ১৯ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট।

লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থেকেছে। সপ্তাহের শেষ দিন ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৩ কোটি টাকায়। প্রাতিষ্ঠানিক বাজার সংশ্লিষ্টরা এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

গত সপ্তাহের লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূল্যবৃদ্ধির দিক থেকে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ২১টি খাতের মধ্যে ১৫টি খাতের সিকিউরিটিজ ঋণাত্মক ধারায় ছিল। ধনাত্মক ধারায় ছিল মাত্র পাঁচটি খাত। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ ধনাত্মক পরিবর্তন এসেছে ব্যাংক খাতের শেয়ারে। দাম বৃদ্ধিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ফার্মাসিউটিক্যাল খাত। এ খাতের লেনদেন অংশ ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

সংখ্যাগত দিক থেকে দেখা যায়, মোট লেনদেনের ৪৯ দশমিক ৩২ শতাংশই ছিল ব্যাংক খাতের দখলে। পাঁচটি খাত ধনাত্মক ধারায় থাকলেও বাকি চারটি খাত ছিল যথাক্রমে সাধারণ বীমা, জীবন বীমা, টেলিকম ও বস্ত্র খাত।

সপ্তাহ জুড়ে বাজারচিত্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ব্রোকার হাউজগুলোর অনুকূলে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘টি-প্লাস-টু’ লেনদেন পদ্ধতির প্রবণতা বেশি। এ কারণে গত সপ্তাহে অধিকাংশ শেয়ারের বড় দরপতন ঘটে এবং ১৫ খাত ঋণাত্মক ধারায় চলে যায়।

তবে বহু বছর পর ব্যাংক ও বীমা খাত একসঙ্গে ধনাত্মক ধারায় প্রবেশ করেছে। এর কৃতিত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দাবি করতেই পারেন। তিনি ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক খাতে নীতি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে গেছেন এবং আমানতকারীদের আস্থা ধরে রেখেছেন।

এর উল্টো চিত্র পুঁজিবাজারে। এখানে বিনিয়োগকারীরাই প্রধান অংশীজন হলেও তাদের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব পরিপক্ক ও প্রভাবশালী হলেও তারা নিজেদের স্বার্থেই কাজ করে যাচ্ছেন। অতি সম্প্রতিও কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে পেরেছেন তারা, যার ইতিবাচক প্রতিফলন বাজারে দৃশ্যমান। এ পরিবর্তনের কৃতিত্ব প্রতিমন্ত্রী মর্যাদাপ্রাপ্ত বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী পেতে পারেন।

তবে একই সঙ্গে বাজারের স্থিতিশীলতার পথেই হঠাৎ যেন ‘মিসাইল’ ছুড়েছে বিএসইসি— একটি নয়, দুটি! প্রথমত, অর্থ ও পুঁজিবাজারের কুখ্যাত সালমানকে ১০০ কোটি টাকা জরিমানাসহ আজীবন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তার ছেলে শায়নকেও আজীবন নিষিদ্ধ করে ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এ সিদ্ধান্তে বিএসইসির গুটিকয়েক কর্মকর্তা ছাড়া অর্থ ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই হতবাক। প্রশ্ন উঠেছে— এ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কি তাদের দায়মুক্তির পথ তৈরি করে দেওয়া হলো?

মাত্র কয়েক মাস আগে শায়নের বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আফ্রিকার একটি দেশে তিন দিনের উৎসবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়। তথ্য মতে, সালমান প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা অর্থ ও পুঁজিবাজার থেকে লুট ও পাচার করেছেন। তার সর্বশেষ কেলেঙ্কারি ‘সুকুক বন্ড’, যার মাধ্যমে জোরপূর্বক তিন হাজার কোটি টাকা আদায় করা হয়। এসব লিখতে গেলে হাজার পৃষ্ঠার বইও যথেষ্ট নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের কিছু শিক্ষক এই লুটপাটে সহযোগী হয়েছেন এবং এখনো সেই ভূমিকায় রয়ে গেছেন। যেখানে গবেষণা আর তত্ত্ব তৈরির কাজ করার কথা, সেখানে তারা হয়ে উঠেছেন মাফিয়া-ফ্যাসিস্টদের দোসর।

১০০ কোটি টাকা জরিমানা সালমানের কাছে তুচ্ছ। আজীবন নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তও বিনিয়োগকারীদের বিপক্ষে যাবে বলেই আশঙ্কা। প্রশ্ন উঠেছে, এই সিদ্ধান্ত কার মস্তিষ্কপ্রসূত? অনেকেই মনে করছেন, এটি বিএসইসি চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের চিন্তার ফসল।

ভাবলে অবাক হতে হয়— এক মাস, এক বছর পেরিয়ে গেলেও তার উপলব্ধি হয়নি যে তিনি যে কিছু জানেন না। আবার তিনি যে কিছু জানেন না, এটাও তিনি জানেন না।

একই সপ্তাহে বিএসইসি একটি অপ্রয়োজনীয় প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে, পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগকারী সরে যায়নি, বরং কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। এই তত্ত্ব সত্য নয়।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৩০ জুন সক্রিয় বিও অ্যাকাউন্ট ছিল ৩২ লাখ ৪ হাজার ৬০৩টি। বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৪৮টিতে। অর্থাৎ, গত ১০ বছরে ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫ জন বিনিয়োগকারী বাজার ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

তাদের অনেকেই মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। পরে তাদের অনেককেই মাথায় হাত দিয়ে বাজার ছাড়তে হয়েছে। কেউ কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এখনই সময়— পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়ার। সম্ভাবনা আছে, সামর্থ্য আছে। দরকার কেবল সদিচ্ছা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

পরীক্ষার হল কি রাজনৈতিক মঞ্চ?

পরীক্ষার কক্ষে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে— মন্ত্রী, এমপি, বিরোধী নেতা কিংবা সাংবাদিক— কেউই এর ব্যতিক্রম নন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো ধরনের প্রদর্শনমূলক কার্যক্রম বা রাজনৈতিক উপস্থিতি এই সংবেদনশীল পরিবেশে অনুমোদন করা উচিত নয়।

৫ দিন আগে

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা আবশ্যক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব দেশের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি অগ্রাধিকারে রাখলে এবং পূর্বের ন্যায় দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা করা যায়।

৫ দিন আগে

একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার সমন্বয় টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি

ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র ডিগ্রি নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা অপরিহার্য। মানবসম্পদ উন্নয়নে একাডেমিক শিক্ষা ও কর্পোরেট বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

৮ দিন আগে

সক্রিয় তদারকিতে হজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা দৃশ্যমান

এ বছর ধর্মমন্ত্রীকে সরাসরি মাঠে গিয়ে হজযাত্রীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া তিনি হজযাত্রা ও এর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। এসবের মাধ্যমে যেসব বাস্তব সমস্যা খুঁজে পাচ্ছেন, দ্রুত সেগুলো সমাধানেরও উদ্যোগ নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার একটি

১১ দিন আগে