জাকাতের অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়

সাঈদ বারী

ইসলামে জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়। এটি একই সঙ্গে একটি নৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। মানুষের সম্পদের ভেতরে দরিদ্র মানুষের অধিকার আছে এই বিশ্বাস থেকেই জাকাতের ধারণা এসেছে। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হিসেবে জাকাতকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু দান নয়, বরং সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।

ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। অর্থ উপার্জন বৈধ, সম্পদ অর্জনও বৈধ। কিন্তু সেই সম্পদের ভেতরে সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার আছে। এই বোধ তৈরি করাই জাকাত ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে জাকাত শুধু আধ্যাত্মিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও।

অর্থনীতির দৃষ্টিতে জাকাত একটি পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা। সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি হয়, জাকাত সেই ব্যবধান কমানোর একটি কার্যকর পদ্ধতি। ধনী মানুষের সঞ্চিত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিতভাবে দরিদ্র মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। এতে অর্থ সমাজের ভেতরে চলাচল করে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায় সম্পদের প্রবাহ সৃষ্টি করা।

জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের স্থবিরতা কমে। অনেক সময় সম্পদ নির্দিষ্ট মানুষের হাতে জমে থাকে। এর ফলে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। জাকাত সেই জমাট বাঁধা সম্পদের একটি অংশ সমাজে ছড়িয়ে দেয়। দরিদ্র মানুষের হাতে অর্থ গেলে তারা তা ব্যয় করে। এই ব্যয়ের মাধ্যমে বাজারে চাহিদা তৈরি হয়। উৎপাদন বাড়ে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে জাকাতের এই অর্থনৈতিক শক্তির বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেছে। ইতিহাসে জানা যায়, খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনামলে জাকাত দেওয়ার মতো মানুষ ছিল অনেক। কিন্তু গ্রহণ করার মতো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই ঘটনা শুধু ধর্মীয় অনুপ্রেরণার ফল ছিল না। এর পেছনে ছিল একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

জাকাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক। দরিদ্র মানুষের হাতে যখন অর্থ পৌঁছে যায়, তখন তারা কেবল দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটায় না। অনেক ক্ষেত্রে সেই অর্থ তাদের নতুনভাবে দাঁড়াতে সাহায্য করে। ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করা, উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত হওয়া কিংবা শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয় করার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে দরিদ্র অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হয়।

এখানে জাকাতকে শুধু ভোগের অর্থ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইসলামের শিক্ষায় জাকাত এমনভাবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, যাতে একজন দরিদ্র মানুষ ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় এটি সামাজিক বিনিয়োগের মতো। এই বিনিয়োগের সুফল শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামগ্রিক সমাজও তা পায়।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে জাকাতের অর্থনীতি নতুন করে ভাবার সুযোগ রয়েছে। দেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জাকাত দেওয়া হয়। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়, এই অর্থের পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা হতে পারে। কিন্তু এর বড় অংশই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ব্যয় হয়। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না।

যদি একটি সুসংগঠিত জাকাত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী অংশ হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে জাকাতের অর্থ ব্যবহার করা গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এতে সরকারি সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির ওপর চাপও কিছুটা কমতে পারে।

তবে জাকাতের মূল শক্তি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈতিকতায়ও নিহিত। একজন মুসলমান যখন জাকাত দেন, তখন তিনি কেবল দায়িত্ব পালন করেন না। তিনি সমাজের সঙ্গে একটি নৈতিক সম্পর্কও পুনর্গঠন করেন। এতে সহমর্মিতা বাড়ে, সামাজিক দূরত্ব কমে।

আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক বৈষম্য একটি বড় সমস্যা। অল্প কিছু মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ জমা হচ্ছে। অন্যদিকে বিপুল মানুষ বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় জাকাতের ধারণা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এটি সম্পদের কেন্দ্রীভবন কমিয়ে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা বলে।

ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থনীতি কেবল লাভের হিসাব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক ভারসাম্য। জাকাত সেই ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুশাসন হিসেবে নয়, একটি কার্যকর সামাজিক অর্থনীতি হিসেবেও কাজ করতে পারে।

সমাজে দারিদ্র্য কমাতে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে জাকাতের এই অর্থনৈতিক দর্শন নতুনভাবে ভাবার দাবি রাখে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সমন্বয়ে যদি একটি সুসংহত জাকাত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে তা ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। জাকাতের প্রকৃত চেতনা তখনই বাস্তব অর্থে সফল হবে, যখন এটি কেবল আনুষ্ঠানিক দান নয়, বরং একটি সচেতন সামাজিক অর্থনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হবে।

লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ঘৃণার রাজনীতি নয়, ভালোবাসার ভাষাই হোক সংসদের শক্তি

রাজনীতির ময়দানে ঘৃণা খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। তবুও একটি পরিপক্ব গণতন্ত্রের জন্য সেই কঠিন পথটিই বেছে নেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় সংসদ যদি ঘৃণার বদলে ভালোবাসা, বিদ্বেষের বদলে যুক্তি ও সম্মানের ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে

৪ দিন আগে

নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিতে সবার দায়িত্বশীলতা জরুরি

ঈদের আনন্দ যেন কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বা দুর্ভোগের কারণে ম্লান না হয়, তা নিশ্চিত করতে ঈদযাত্রার সময় সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের প্রচেষ্টায় একটি নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও দুর্ঘটনামুক্ত ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব।

৪ দিন আগে

প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও গণশক্তি

এই সাধারণ কাজটি বাংলাদেশের শাসন-কাঠামোর একটি গভীর সত্যকে সামনে নিয়ে আসে— আমাদের জাতীয় শাসন-আলোচনা ক্রমেই ‘প্রক্রিয়া’কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, যেখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— ‘পদ্ধতি’ —থেকে গেছে উপেক্ষিত।

৪ দিন আগে

প্রত্যাশা এখন দায়িত্বশীল রাজনীতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে। সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সর্বসম্মত। সংসদের সদস্যরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করায় সংসদীয় কার্যক্রমের শুরুতেই একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে।

৫ দিন আগে