ইতিহাস

সাহ সুজা কেন আরাকানে পালিয়ে গিয়েছিলেন?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ছবি: সংগৃহীত

মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সাহ সুজার নাম উচ্চারিত হলে এক ধরণের ট্র্যাজেডির আবহ তৈরি হয়। সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র এই সাহ সুজা ছিলেন বাংলা, বিহার ও ওড়িশার সুবেদার—মুঘল প্রশাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ইতিহাস বলছে, দারাশুকো, আওরঙ্গজেব, মুরাদ ও সাহ সুজা—চার ভাইয়ের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বই তার জীবনের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৬৫৭ সালে শাহজাহানের অসুস্থতার পরপরই শুরু হয় রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে হানাহানি। সাহ সুজা নিজেকে উত্তরসূরি দাবি করে এবং কলকাতা থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেন সেনাবাহিনী নিয়ে। কিন্তু আওরঙ্গজেব ও মুরাদের মিলিত আক্রমণে তিনি ১৬৫৯ সালের জানুয়ারিতে খাজা মাসউমের নেতৃত্বে বাহাদুরপুরের যুদ্ধে পরাজিত হন। এই পরাজয় ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।

আওরঙ্গজেব ক্ষমতা দখল করে নিলে সাহ সুজার পক্ষে আর উত্তরাধিকার দাবি করে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। পরাজয়ের পর তার সামনে দাঁড়ায় দুটি পথ—আত্মসমর্পণ অথবা পলায়ন। তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন। সাহ সুজা পরিবার-পরিজন নিয়ে বাংলায় ফিরে আসেন। কিন্তু দিল্লির সিংহাসনে বসা আওরঙ্গজেবের হিংস্র দৃষ্টি বাংলার দিকেও বিস্তৃত হয়ে পড়ে। তিনি সাহ সুজার বিরুদ্ধে সেনা পাঠান। সাহ সুজা তখন তৎকালীন মুঘল-অধীন বাংলার রাজধানী রাজমহল ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। এখানেও তিনি বেশি দিন টিকতে পারেননি। শেষ ভরসা হিসেবে তিনি আশ্রয়ের জন্য পূর্বের স্বাধীন রাজ্য আরাকানের (বর্তমান মিয়ানমার বা বার্মার রাখাইন রাজ্য) শাসকের দ্বারস্থ হন।

১৬৬০ সালের মে মাসে সাহ সুজা বিশাল পরিবার, সহচর ও সৈন্যসহ জলপথে আরাকানের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই যাত্রা ছিল দীর্ঘ, বিপদসংকুল এবং বেদনাদায়ক। ঐতিহাসিক ফারিস্তা ও বার্নিয়ের (François Bernier) উল্লেখ করেছেন, সাহ সুজা তখন গঙ্গার মোহনা ধরে নৌবহর নিয়ে চলেন এবং কয়েক মাস পর আরাকানের রাজা সন্দুথুদের রাজ্যে পৌঁছান। বার্নিয়ের তাঁর Travels in the Mogul Empire বইয়ে লিখেছেন, “তাঁর এই উক্তি বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘সুজা রাজকীয় আড়ম্বরে আরাকানে পৌঁছালেও বুঝতে পারেননি, তিনি এক সোনার খাঁচায় প্রবেশ করেছেন।’

আশ্রয় পাওয়ার পর কিছুদিন সাহ সুজাকে রাজকীয় সম্মান দেওয়া হয়। তিনি তাঁর কন্যাকে আরাকানের রাজার সঙ্গে বিবাহ দিতে রাজি হন, এমন কথাও প্রচলিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরাকান রাজা সাহ সুজার বিপুল ধনসম্পদ দেখে লোভে পড়ে যান। ইতিহাসবিদ স্যার উইলিয়াম হান্টার The Indian Musalmans গ্রন্থে লেখেন, ‘আরাকানের রাজার লোভই পালিয়ে আসা রাজপুত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ডেকে আনে।’

১৬৬১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে সাহ সুজা ও তার পরিবারের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁদের বন্দি করে রাখা হয় এবং সাহ সুজাকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হয়। তাঁর স্ত্রী ও কন্যারা সম্ভাব্য ধর্ষণ ও অপমানের হাত থেকে বাঁচতে আত্মহত্যা করেন বলে অনেক বিবরণে জানা যায়। যদিও তাঁর মৃত্যু নিয়ে কিছু রহস্য রয়েছে, তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ একমত যে সাহ সুজার মৃত্যু ছিল মর্মান্তিক এবং তার পতন ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নির্মম পরিণতি।

ফরাসি পর্যটক তাভার্নিয়ে তাঁর লেখায় বলেন, ‘মুঘল ইতিহাসে সাহ সুজার ভাগ্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর একটি।’

আজও ইতিহাস অন্বেষণের পথে সাহ সুজার পালিয়ে যাওয়া, তার আরাকানে যাত্রা এবং সেখানে করুণ মৃত্যুর ঘটনা এক অন্ধকার অধ্যায় হয়ে আছে। ক্ষমতার লোভ, রাজনৈতিক হিংসা আর বিদেশে আশ্রয়ের পরও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া—সব মিলিয়ে সাহ সুজার জীবন যেন এক ট্র্যাজেডি নাটকের নায়ক হয়ে ওঠে।

তার জীবনের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতি কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যের নাম নয়; বরং এর ছায়ায় আছে প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, আত্মত্যাগ এবং কখনো কখনো নির্মম অবসান। সাহ সুজার আরাকানে পলায়ন ছিল আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত তার জীবনের অন্তিম অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়।

ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন দের মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে রাজকীয় মর্যাদাও কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে।’

এইভাবে, সাহ সুজার আরাকানে পলায়ন ইতিহাসে শুধু একটি রাজপুত্রের পরাজয় নয়; বরং তা হয়ে উঠেছে রাজনীতির নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

আ. লীগের বিচার শিগগিরই, দেশে রাজনীতির সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৬ ঘণ্টা আগে

বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ু রিপোর্টিং কোর্স চালুর উদ্যোগ

এজাইল (AGILE) প্রকল্পের আওতায় ৩ ও ৪ জুলাই ঢাকার পূর্বাচলের সিসিইউএলবি রিসোর্টে অনুষ্ঠিত কো-ডিজাইন কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকরা অংশ নেন।

১৮ ঘণ্টা আগে

বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে: অর্থমন্ত্রী

তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ, সরাসরি বিনিয়োগ, ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগ এবং ফান্ড ম্যানেজারদের বিনিয়োগ- সবই বাংলাদেশে আসছে। বাজেট প্রথমত বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের যে সম্ভাবনা আছে, সেটিকে মাথায় রেখে বাজেট করা হয়েছে এবং সেই সম্ভাবনাগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হ

১৮ ঘণ্টা আগে

জুলাইয়ের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর

তারেক রহমান বলেন, “যে কারণে এত মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে সরকার। আইন অনুযায়ী, অন্যায়কারী এবং হত্যাকারীদের বিচার করা হবে। বিচারের নামে যেন কারও প্রতি অবিচার না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে”

১৯ ঘণ্টা আগে