গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কী হচ্ছে?

বিবিসি বাংলা
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০৮: ৪৯
ফারাক্কা ব্যারাজ ও সংলগ্ন ফিডার ক্যানাল

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ নবায়ন হবে নাকি দুই দেশের মধ্যে নতুন করে চুক্তি হবে, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও দুই দেশের কারিগরি দল এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

আর এই প্রস্তুতির মধ্যেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ভারতের দিক থেকে নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন ফর্মুলার কথা বলা হচ্ছে, যেটিকে বাংলাদেশের পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞরা 'অযৌক্তিক' বলে মনে করছেন।

তারা এও বলছেন যে, ভারতের দিক থেকে নতুন করে যেসব বক্তব্য আসছে, তাতে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি সংকটের মুখে পড়তে পারে।

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তির প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী জানিয়েছেন যে, সরকার এ বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে।

"আমরা আশা করছি দুই দেশের বিশেষজ্ঞ কমিটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসবে। এরপর মন্ত্রীপর্যায়ে জেআরসির বৈঠকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা করছি," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকেও আভাস পাওয়া গেছে যে, দুই দেশের কারিগরি দল এ বিষয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে।

এরপর যৌথ নদী কমিশনে খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর দুই দেশের তরফে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসতে পারে।

প্রসঙ্গত, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার দু'দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশ ত্রিশ বছর মেয়াদী ওই চুক্তি সম্পাদন করেছিল।

নতুন ফর্মুলার কথা আসছে কেন

পানি বণ্টন চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারত কী পরিমাণ পানি পাবে, সেটা নির্ভর করবে উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, পানির প্রবাহ ও গতিবেগের ওপর।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, নদীতে ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম পানি থাকলে দুই দেশ সমান সমান পানি ভাগ করে নেবে। পানির পরিমাণ ৭০ হাজার কিউসেক থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে ৪০ হাজার কিউসেক পাবে বাংলাদেশ। অবশিষ্ট প্রবাহিত হবে ভারতে।

আবার নদীর পানির প্রবাহ যদি ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হয় তাহলে ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাবে ভারত। অবশিষ্ট পানি প্রবাহিত হবে বাংলাদেশে।

এখন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসার প্রেক্ষাপটে কয়েক বছর ধরেই চুক্তির নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন প্রস্তাবের বিষয়টি আলোচনায় আসছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের মার্চে গঙ্গা চুক্তি বিষয়ক যৌথ কমিটির বৈঠকের সময় এ প্রশ্নও উঠে আসে যে – এখন কোন শর্তে চুক্তিটির নবায়ন হবে।

জানা যাচ্ছে, চুক্তির নবায়ন ইস্যুতে ভেতরে ভেতরে যে প্রাথমিক প্রস্তুতি চলছে, তাতে ভারতীয় পক্ষ চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে পানি প্রবাহের ভিত্তিতে চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক দাড় করাতে।

অন্যদিকে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির গড় প্রবাহ কম থাকায় বাংলাদেশ চাইছে পুরো নদীর পানি প্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে পানি ভাগাভাগি করতে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দলের ভারত সফরকালে গত ৪ঠা মে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোর মধ্যে পানি সবসময় গুরুত্ব পেয়েছে।

ওই প্রতিনিধি দলে থাকা ঢাকার নিউ এজ পত্রিকার সাংবাদিক মুস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন যে, তাদের সাথে বৈঠকের সময় বিক্রম মিশ্রি বলেছেন তারা বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সাথে পানিসহ সব ইস্যুতেই আলোচনা করতে প্রস্তুত আছেন।

"বিক্রম মিশ্রি বলেছেন যে গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে জেআরসি (যৌথ নদী কমিশন) সময়মতই অংশ নিবে," বলছিলেন মি. রহমান।

সাংবাদিকদের ওই দলটির সঙ্গেই ৫ই মে আলাদা একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেছেন, আগের চুক্তিতে যে ফর্মুলায় পানি ভাগাভাগির কথা বলা হয়েছিল সেটি এখন আর কাজ নাও করতে পারে।

প্রসঙ্গত, ওই চুক্তিতে ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পানি প্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল।

মুস্তাফিজুর রহমান জানান, পঙ্কজ শরণ বলেছেন যে ১৯৯৬ সালের চুক্তির ত্রিশ বছর পর এসে একই ফর্মুলা কাজ করবে না।

তিনি এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ৪০ বছরের পানি প্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন।

যদিও যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ও নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলছেন, এ ধরনের চিন্তা মোটেও যৌক্তিক নয়।

"গঙ্গা নদী তো ফারাক্কা থেকে শুরু হয়নি। আবার উজান থেকে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করার কারণে সেখানে পানির প্রবাহ অনেক কম থাকে। ফলে তার ওপর গড় করে পানি ভাগাভাগি ন্যায্য হবে না। এছাড়া দুই দেশ আগেই সম্মত হয়েছিল যে গঙ্গার পানি নদীর পরিমাণ ভিত্তিক ভাগ হবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

আইনুন নিশাত বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত এখন সুসম্পর্কের কথা বলছে এবং এই সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হলো পানি। আশা করবো আলোচনা ও যৌক্তিক আচরণের ভিত্তিতে গঙ্গার পানি বণ্টনের বিষয়টি ঠিক হবে।

ফারাক্কা বাধ গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি

বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় আঠার কিলোমিটার দূরে ভারতের মনোহরপুরে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছিল ভারত। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে এর উদ্বোধনের আগে থেকে এখন পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে ফারাক্কা বাঁধ ইস্যু।

ভারতের দিক থেকে এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল গঙ্গার প্রবাহ থেকে অতিরিক্ত পানি ভাগীরথীতে সরিয়ে নেওয়া ও তার মাধ্যমে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানো। এ জন্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার লম্বা একটি 'লিঙ্ক ক্যানাল' বা কৃত্রিম খাল খনন করা হয়েছিল।

তবে এই ফারাক্কা নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান অভিযোগ হলো এই ফারাক্কার ফলেই প্রমত্তা পদ্মা নদী শুকিয়ে গেছে, যার প্রভাবে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার জীবন যাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিক মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালে ফারাক্কা অভিমুখে লং মার্চ কর্মসূচী পালন করে আলোচনায় এসেছিলেন।

ফারাক্কা বাঁধের অবস্থান বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ১৮ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায়। বাঁধটি চালু হওয়ার দু'দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬ সালে এসে ভারত ও বাংলাদেশ যে ঐতিহাসিক পানি বণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল তার মেয়াদ এখন প্রায় শেষের পথে।

ওই চুক্তির অধীনে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রতি দশ দিনে ৩৫ হাজার কিউসেক ও ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা।

যার ফলে কয়েক বছর আগে থেকেই চুক্তির নবায়ন নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত দু দেশের মধ্যকার সব দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এটি উঠে এসেছে।

২০২৫ সালের মার্চে চুক্তিটি পুনর্নবায়ন ও এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা বৈঠকে বসেছিলেন। তখন ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে গত দুই দিন ধরে সরেজমিনে জরিপ করেছিলেন দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা।

এরপর যৌথ নদী কমিশনের অধীনে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমিটির ৮৬তম বৈঠকে উভয় পক্ষ ফারাক্কা বাঁধ এলাকায় পরিচালিত জরিপের তথ্য নিয়ে আলোচনাও করেছে।

তবে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হলে চুক্তি নবায়ন নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়নের ইস্যুটি আবারো সামনে এসেছে।

ফেব্রুয়ারিতেই ভারতের লোকসভায় এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন জানিয়েছিলেন যে, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এখনো ভারত সরকারের আলোচনা শুরু হয়নি। তবে এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি প্রতিনিধিদল বিভিন্ন সময়ে আন্ত:মন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নিয়েছে।

এদিকে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলের শুরুতে সরকারি সফরে দিল্লিতে যাওয়ার আগে ঢাকায় কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে সফরের আলোচনায় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টিও রয়েছে।

সফরকালে মি. রহমান ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি হবে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রথম পরীক্ষা"।

তিনি বলেছিলেন, "এখন যে চুক্তিটা আছে, তা কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আমরা একটি সংশোধিত চুক্তি দেখতে চাই, যা মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পারবে"।

তবে তার সফরে এ বিষয়ে দুই পক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে কি-না কিংবা চুক্তির ক্ষেত্রে কী হতে যাচ্ছে- সে সম্পর্কে কোনো ঘোষণা সরকারের দিক থেকে আসেনি।

রাজনীতি/এসআর

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসছে আরও ৫ জাহাজ

বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন আজ বাসসকে বলেন, এখন পর্যন্ত ১৪টি তেলবাহী জাহাজ দেশে এসেছে। এ মাসের বাকি দিনগুলোতে আরও ৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করবে।

১৪ ঘণ্টা আগে

হামের চিকিৎসায় সরকারে গাফিলতি নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার একটি ভেন্টিলেটরও রেখে যায়নি, এমনকি হাম (মিজলস) প্রতিরোধের টিকাও মজুত ছিল না। বর্তমান সরকার শূন্য হাত থেকেই কাজ শুরু করেছে। এখন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় আরও ১০টি জেলায় নতুন আইসিইউ ইউনিট চালু করা হবে। প

১৪ ঘণ্টা আগে

দেড় মাসে হামে ৪৫১ প্রাণহানি, ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২ শিশুর মৃত্যু

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাসে সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৭৪ জন এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৭৭ জন।

১৬ ঘণ্টা আগে

বগুড়া সিটি করপোরেশন গঠন, স্থান পেয়েছে ২১ ওয়ার্ড

বগুড়া পৌরসভা ও সম্প্রসারিত এলাকা নিয়ে বগুড়া সিটি করপোরেশন গঠন করেছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-২ শাখা নতুন এই সিটি করপোরেশন গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। দেশের ১৩তম এই সিটি করপোরেশনে স্থান পেয়েছে ২১টি ওয়ার্ড।

১৯ ঘণ্টা আগে