মানবাধিকারে প্রভাব ফেলতে পারে ৩ আইন— আইনমন্ত্রীকে অ্যামনেস্টির চিঠি

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইনের পাশাপাশি প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধনী) আইন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি বলছে, এসব আইন সরাসরি মানবাধিকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়ে এই তিন আইন নিয়ে ‘গুরুতর উদ্বেগ’ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

আইনগুলো নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে চিঠি পাঠিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। চিঠিতে এসব আইনের বিভিন্ন বিধান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক স্মৃতি সিংয়ের লেখা চিঠিতে বলা হয়, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের সঙ্গে আইনমন্ত্রীর বৈঠকে কিছু বিষয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছিল। ওই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় চিঠিটি পাঠানো হয়েছে।

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধনী) আইনে আগের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতোই নতুন সংশোধনীতে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে অ্যামনেস্টি বলছে, আগে এসব আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত এ আইনের জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, ধর্মানুভূতিতে আঘাত, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও রাষ্ট্রীয় অবমাননাসহ সরকারবিরোধী বা মানহানির মতো অস্পষ্ট শব্দ রাখা হয়েছে; যেগুলো অপব্যবহার করে সরকার বা সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা করলে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।

অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির তুলনায় বেশি মাত্রায় সমালোচনা সহ্য করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে সে সুযোগ নেই। বরং প্রস্তাবিত আইনের এসব ধারার সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও অত্যন্ত বিস্তৃত।

প্রস্তাবিত আইনের ৮(৪) ধারায় কনটেন্ট সরানোর পর তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। ২৫ ও ২৬(এ) ধারায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘গুজব’, ‘বুলিং’, ‘হয়রানি’ বা ‘অপপ্রচার’ ছড়ানোর অভিযোগে ফৌজদারি অপরাধে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। অ্যামনেস্টি এই প্রস্তাবিত আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বন্ধ ও প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

এদিকে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন পাস হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তবে আইনটির বর্তমান রূপ আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং সে সামঞ্জস্য আনার ‘সুযোগ হাতছাড়া’ হয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।

আইনের ২(এইচ) ধারায় গুম হওয়া ব্যক্তি, তার পরিবারের সদস্য ও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে অ্যামনেস্টি বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ২৪(১) ধারার সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই সংজ্ঞাটি সংশোধনের সুপারিশ করেছে তারা।

তদন্তের জন্য ৯০ দিন ও প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন সময়ের বিধান নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে তারা। অ্যামনেস্টির মতে, গুমের মতো জটিল অপরাধের তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা তদন্তের মানকে প্রভাবিত করতে পারে। পুলিশের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

এ ছাড়া গুমের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটি সব পরিস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে এবং বাংলাদেশকে মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি বিলোপের পথে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সাবেক র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) নাম বদলে হয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এ আইন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। চিঠিতে র‌্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত আইনের ১২ ও ১৫ ধারা অনুযায়ী বিশেষ বাহিনীটিকে তল্লাশি, বাজেয়াপ্তকরণ ও গ্রেপ্তারের অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অ্যামনেস্টি।

এ আইনের ২৪ ধারায় এসআরবির সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত ‘অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটির’ স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংস্থা। অ্যামনেস্টি বলেছে, এসআরবির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সেগুলো স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে তদন্ত করতে হবে এবং কোনো আচরণ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলে তা সাধারণ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ও অতীতের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে বাংলাদেশের আইনগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড অনুযায়ী সংস্কার করা উচিত বলে মনে করছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতেও গঠনমূলক ও অর্থবহ আলোচনার আগ্রহের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad