একটি স্বপ্নপোড়া বিকেলের গল্প

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
বিধ্বস্ত হওয়া বিমান উদ্ধারে কাজ চলছে। ইনসেটে তৌকির ইসলাম সাগর। ছবি: ফোকাস বাংলা
বিধ্বস্ত হওয়া বিমান উদ্ধারে কাজ চলছে। ইনসেটে তৌকির ইসলাম সাগর। ছবি: ফোকাস বাংলা

সকালটা ছিল অন্যরকম। রাজশাহীর উপশহর ৩ নম্বর সেক্টরের একটি ছোট্ট ভাড়া বাড়ির ঘরে তখন উৎসবের আবহ। সাগর যে আজ একা উড়বে আকাশে!

সাগর। পুরো নাম ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম, আজই প্রথমবারের মতো একা চালাতে যাচ্ছিলেন প্রশিক্ষণ বিমান। ছোটবেলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে যে ছেলেটা বলত, ‘আমি আকাশে উড়ব’, সেই সাগরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছিল। তাই সকাল থেকেই রাজশাহীর এ পরিবার থেকে তাই ফোনে ফোনে খবর যাচ্ছিল আত্মীয়স্বজনদের কাছে, ‘সাগর আজ একা উড়বে!’

কিন্তু দুপুর গড়াতেই সবকিছু বদলে গেল। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবরে কেঁপে উঠল মা-বাবার বুক। নিশ্চিত হওয়া গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই— সেই বিমানেই ছিলেন তৌকির। উচ্ছ্বাসের সুর থেমে কান্নার রোল উঠল সেই বাড়িতে।

বিকেলে আশ্রয় ভবনের সামনে দাঁড়ালে বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছিল কান্নার শব্দ। প্রতিবেশীদের চোখেও জল, মুখে শুধু একটাই কথা— ‘সাগর তো ওড়ার আগেই হারিয়ে গেল।’

তৌকিরের বাবা তহুরুল ইসলাম একজন ব্যবসায়ী। সারা জীবন ছেলের স্বপ্নকে বাস্তব করতে পরিশ্রম করেছেন। মা সালেহা খাতুন ছিলেন ছায়া হয়ে পাশে। বড় হয়ে যখন জানাল উড়োজাহাজ চালাতে চায়, মা বলেছিলেন— ‘ভয় লাগে, কিন্তু গর্বও হয়।’

সাগরের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট এলাকায়। বোন বৃষ্টি আর ভগ্নিপতিও থাকেন একই বাড়িতে। আজ সবাই বাকরুদ্ধ, পাথরের মতো নিস্তব্ধ।

তৌকিরের ডাকনাম ছিল ‘সাগর’। সেই নামের মতোই গভীর ছিল তার স্বপ্ন আর ভালোবাসা— আকাশের প্রতি, দেশের প্রতি।

সেই স্বপ্ন নিয়ে দুপুর ১টা ৬ মিনিটে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে আকাশে উড়েছিলেন সাগর। তার সেই উড়ান স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১২ মিনিট। যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ে দুপুর ১টা ১৮ মিনিটের মাথায় উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনের ওপর বিমান নিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন সাগর।

মেজো চাচা মতিউর রহমান জানালেন, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পরই তারা মেনে নিয়েছিলেন, সাগরকে আর তাদের মধ্যে ফিরে পাবেন না। তাদের সে আশঙ্কা সত্যি হয় বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ। বিমান বাহিনী থেকে জানানো হয় সাগরের মৃত্যুর খবর।

পরে বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে একটি হেলিকপ্টারও পাঠানো হয় সাগরের বাড়িতে। বাবা তোহরুল ইসলাম, মা সালেহা খাতুন ও ছোট বোন বৃষ্টিকে সেই হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নেওয়া হয়।

সাগরের চালানো সে বিমান বিধ্বস্তে এখন পর্যন্ত ২০ জন নিহতের খবর নিশ্চিত করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। আহত হয়েছেন ১৭১ জন।

তবে এত হতাহতের খবরের মধ্যেও আজ রাজশাহী উপশহরের ৩ নম্বর সেক্টরের ছোট্ট ভাড়া ঘরে বড় খবর একটাই— সাগর আর কোনোদিন উড়বে না।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement