শেখ হাসিনাকে সমর্থন করায় শাস্তির মুখে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। লোগো
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। লোগো

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির মতে, যথাযথ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কয়েক ডজন শিক্ষককে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শত শত শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া কিংবা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত না করে ব্যবস্থা নেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতার অধিকারের লঙ্ঘন। এতে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক মতামত ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণে আগের সরকারগুলোর নেওয়া দমনমূলক পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

সংস্থাটির এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের চর্চা রয়েছে। এ ধরনের আলোচনা নিয়ে শুধু স্বৈরশাসকদের ভয় পাওয়ার কথা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত কোনো সরকারের নয়। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অবস্থান বদল হলেই যেন অতীতের দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, বরং বাংলাদেশকে সেই অধ্যায় পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে চাকরিচ্যুতি, সাময়িক বরখাস্ত এবং পাঠদানে বিধিনিষেধ আরোপ। এসব ব্যবস্থার পেছনে অভিযোগ হিসেবে দেখানো হয়েছে, তারা ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সহিংসতায় সহযোগিতা করেছিলেন, দলটির পক্ষে বিভিন্ন ‘ধ্বংসাত্মক’ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কিংবা ইসলামি পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছিলেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সদস্য ও সমর্থক হিসেবে অভিযুক্ত শত শত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, যা তাদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, এ বিষয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত এক ডজনের বেশি শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিঠিপত্র, টেলিভিশনে প্রচারিত একটি আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও পর্যালোচনা করেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকারেও বহিষ্কার, পরীক্ষার সনদ আটকে রাখা এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

২০২৬ সালের আগস্টে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্য হওয়ায় ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন না দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগে এখন লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্লাস নিতে দেওয়া হচ্ছে না, গবেষণার কাজ করতে পারছি না, কিছুই করতে পারছি না।’

২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হন। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আবার ক্ষমতায় আসে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসন ৪৪ জন শিক্ষককে সব ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়। আরও ২৫ জনের পাঠদানের দায়িত্ব সীমিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ বা বিশ্বাসযোগ্য কোনো শৃঙ্খলাসংক্রান্ত তদন্ত করা হয়নি। পরে একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছয় শিক্ষককে আনুষ্ঠানিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আরও ১৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই ধরনের তদন্ত শুরু হয়েছে।

ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘তদন্ত কমিশন’ গঠনের পর ১২ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আরও ৩৪ জনের পদাবনতি করা হয় অথবা তাদের কার্যক্রম সীমিত করা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনসম্মত শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রক্রিয়া মেনে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়নি।

ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তের পর ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং আরও ১০ জনকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, তদন্তের সময় তাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এতে একাডেমিক শৃঙ্খলাসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া আরও ৮৫ জন শিক্ষককে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সব মিলিয়ে ২০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১২৬ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে এবং তাদের পরীক্ষার সনদ আটকে রাখে। একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটি জানায়, এসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ছবি, ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের আরও ২৭৭ জন শিক্ষার্থী হামলায় জড়িত ছিলেন বলে পুলিশের কাছে করা মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে এসব ২৭৭ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানতে পেরেছে, গ্রেপ্তারের ভয়ে তারা ক্যাম্পাসে আসছেন না। তালিকাভুক্ত অনেক শিক্ষার্থীই সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো সুযোগ দেয়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, শাস্তির মুখে পড়া শিক্ষকদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান। ২০১৭ সাল থেকে তিনি অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি আন্দোলনকে ‘অবৈধ, ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক’ বলে সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও পর্যালোচনা করে এমন কোনো মন্তব্যের প্রমাণ পায়নি।

আরেকটি অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে তিনি ‘গণহত্যায় উসকানি’ দিয়েছিলেন। তবে ওই সভাটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। মশিউর রহমান হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, তার এমন বক্তব্যের কোনো প্রমাণ তাকে দেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন।

২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের সুপারিশ করে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার মূল অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের পক্ষে একটি মিছিলে অংশ নেওয়া। এর পরদিনই শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ওই মিছিলকে ‘সন্ত্রাসী’ মিছিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ফেসবুক পেজে মিছিলের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভিডিওটি বিশ্লেষণ করেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একদল মানুষকে স্লোগান দিয়ে হাঁটতে দেখা যায়। তবে কারও সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের দৃশ্য নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক পূর্বা ইসলামকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই মিছিলে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি ‘ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার নিপীড়ন, নির্যাতন ও গণহত্যার প্রতি সমর্থন’ জানিয়েছেন। তবে বিশ্লেষণ করা ভিডিওতে তাকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকারকেও ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘শেখ হাসিনার গণহত্যার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান’ নিয়েছিলেন।

তবে অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকার জানিয়েছেন, আন্দোলনের পুরো সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন না; পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ছিলেন। হাইকোর্ট তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেছেন। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তিন শিক্ষাবিদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন কারাগারে রয়েছেন। আরেকজনের বিচার এখনো শুরু হয়নি।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, আগের সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে সমর্থন করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা প্রমাণ করবে যে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত এমন জায়গা, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারবেন; যেখানে দিনের সরকারকে সমর্থন করতে কাউকে বাধ্য করা হবে না।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad