সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের সুপারিশ

সারের ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব, অর্থ লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বিশেষ করে লালমনিরহাট, বরগুনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, নওগাঁ ও যশোরে ডিলার নিয়োগের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার কথা বলেছে কমিটি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠকে সারের আমদানি, মজুত ও বিতরণ পরিস্থিতির পাশাপাশি ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্য এসব তথ্য জানিয়েছেন। বৈঠকে বলা হয়, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং বিতরণে কোনো সমস্যা নেই।
কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে সদস্য শহিদুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, রোকন উদ্দীন বাবুল, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সাবিরা সুলতানা ও গোলাম রছুল উপস্থিত ছিলেন। সভাপতির আমন্ত্রণে বৈঠকে যোগ দেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
বৈঠক শেষে কৃষিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, সারা দেশে সাড়ে চার হাজারের বেশি সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডিলারশিপের শর্ত অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারশিপ পরিবর্তন করা যাবে।
দলীয় পরিচয় ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন বিএনপির সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ও সাবিরা সুলতানা এবং জামায়াতের সংসদ সদস্য গোলাম রছুল। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সমর্থকদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। গোলাম রছুলের অভিযোগ, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার চেয়ে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন তাঁদের মতামত না নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মতামতের ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, বৈঠকে কেউ কেউ সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।
গোলাম রছুল বলেন, প্রকৃত ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের উপেক্ষা করে দলীয় পরিচয় ও অর্থের বিনিময়ে অনেককে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে মামলার আসামি, মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তি এবং আওয়ামী লীগের লোকজনও ডিলারশিপ পেয়েছেন।
তিনি বলেন, আট থেকে ১২ বছর ধরে সারসহ অন্যান্য ব্যবসায় যুক্ত ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়া হলে বিতরণব্যবস্থায় অনিয়ম কমতে পারে। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার বদলে দলীয় পরিচয় এবং অর্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যোগ্য ব্যবসায়ীদের নাম বিবেচনার জন্য কৃষিমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েও সাড়া পাননি বলে দাবি করেন গোলাম রছুল। তিনি জানান, ডিলার নিয়োগে অনিয়ম তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত আবেদন করবেন এবং অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন নথিপত্রও জমা দেবেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান তিনি।
বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ
বৈঠকে সার বিতরণে অনিয়ম এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠে আসে। নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে যমুনা সেতুর পর চেকপোস্ট বসিয়ে সারের গাড়ি তদারকির প্রস্তাব দিয়েছেন কমিটির এক সদস্য।
কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম বৈঠক শেষে বলেন, যেসব এলাকায় ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেসব ক্ষেত্রে নিয়োগ স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় তিন মাসের মধ্যে অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বাদ দেওয়া হবে।
শাহাদাত হোসেন সেলিম আরও বলেন, মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিলার নিয়োগে তারা অনেকটা ‘পোস্ট অফিসের’ ভূমিকা পালন করেছে। মূলত জেলা প্রশাসকেরা (ডিসি) নিয়োগ দিয়েছেন। এ বিষয়ে কমিটির প্রশ্ন, মন্ত্রণালয় যদি যথাযথ যাচাই-বাছাই না-ই করে থাকে, তাহলে এই দায়িত্বে থাকার প্রয়োজন কী ছিল; নিয়োগের দায়িত্ব সরাসরি ডিসিদের দিলেই হতো।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগ ওঠা এলাকাগুলোয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। যেসব ক্ষেত্রে এখনো ডিলারশিপের চুক্তি হয়নি, অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেসব চুক্তি স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। আর যেসব ক্ষেত্রে চুক্তি হয়ে গেছে, সেসব অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে লালমনিরহাট, বরগুনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, নওগাঁ ও যশোরের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সারের ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনায় তিন সদস্যের কমিটি
বৈঠকে সারের বিতরণ, মজুত ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং অবৈধ মজুত, বিপণনসহ অন্যান্য অনিয়ম সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে এই কমিটিকে।
কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের প্রস্তাবে তাঁকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। অন্য দুই সদস্য হলেন রোকন উদ্দীন বাবুল ও সাবিরা সুলতানা। তবে এই কমিটিতে বিরোধী দলের কোনো সদস্যকে রাখা হয়নি।







-d09f4f-256x144.webp)





