বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তাসনিম দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন। প্রসিকিউশন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। অন্যদিকে দিশার আইনজীবী ইমাম হোসেন জাবেদ রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন।
সাত কারণ দেখিয়ে রিমান্ড আবেদন
আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এর আগে চার দিনের রিমান্ডে দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়নি। জিজ্ঞাসাবাদে দিশা জানান, ঘটনার আগের দিন ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ সাউরির সঙ্গে উত্তরার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ গিয়েছিলেন। ওই দিন সন্ধ্যায় একাধিকবার ‘সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস’ খেয়েছেন তারা। তাহসিফের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজেও গিয়েছিলেন দিশা।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, “দিশা 'নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট' একত্রিত ছিলেন এবং বিভিন্ন জায়গায় সাউরির সাথে বাইকে ঘোরাঘুরি করেছেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়াও তদন্তে দিশা ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে, যা তদন্তের স্বার্থে গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ আসামি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির হওয়ায় একাধিক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে যায় এবং নীরবতা পালন করে।”
মামলার আরেক আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, দীপ বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন। তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে দিশার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে মামলার ঘটনায় দিশার জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দিশাকে ফের সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পক্ষে সাতটি কারণ দেখিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। সেগুলো হলো—
- ঘটনার দিন উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রুআপ কমপ্লেক্সে ‘সিপি ফাইভ স্টার’ নামের ফাস্ট ফুডের দোকানে তাহসিফ ও দিশার মধ্যে কোনো আবেগপ্রবণ কথাবার্তা বা বাক্বিতণ্ডা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা।
- ঘটনার দিন ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ তাদের মধ্যে কোনো কথাকাটাকাটি বা বাক্বিতণ্ডা হয়েছিল কি না, তা জানা।
- ঘটনার দিন বা তার আগে তাদের সম্পর্কে কোনো টানাপোড়েন চলছিল কি না, তা যাচাই করা।
- মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন।
- অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার।
- ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত উদ্ধার।
- দিশা ও দীপের দেওয়া বক্তব্য মিলিয়ে দেখা।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের লাশ
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন তাহসিফ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নেমে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরদিন দীপ বলেছিলেন, একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি।
তিন দিনেও এ ঘটনায় মামলা না হওয়ায় দীপকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। পরে ৩০ অক্টোবর রাতে তাকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই রাতেই তাহসিফের বাবা হত্যা মামলা করলে দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরদিন আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষে আজ বুধবার দীপের আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। ‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেন দীপ। পরে শুক্রবার তাকে নিয়ে টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে, গত ৩০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার দিন রাতে উত্তরার একটি বারে তাহসিফের সঙ্গে তাকে দেখা গিয়েছিল বলে জানা গেছে। গ্রেপ্তারের পরদিন আদালত দিশার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। সেই রিমান্ড শেষে তদন্ত কর্মকর্তা তাকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করেন।


















