দুবলার চরে শুঁটকির মৌসুম শুরু, ৫ মাস চলবে মহোৎসব

মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২: ৩৩
১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে শুঁটকির মৌসুম, সুন্দরবনের দুবলার চরে চলছে প্রস্তুতি। ছবি: রাজনীতি ডটকম
১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে শুঁটকির মৌসুম, সুন্দরবনের দুবলার চরে চলছে প্রস্তুতি। ছবি: রাজনীতি ডটকম

নীল বঙ্গোপসাগরের ফেনিল জলরাশি যেখানে এসে মিশেছে সুন্দরবনের সবুজ অরণ্যে, ঠিক সেখানেই প্রতিবছর শীতের আগমনে জেগে ওঠে এক ভাসমান মাছের সাম্রাজ্য। বালুর চরে সারি সারি জেলেদের নির্মিত ঘর, হাজার হাজার ফুট চাতাল আর রোদে শুকানো মাছের মৌ মৌ গন্ধ এটাই সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি পল্লি।

১ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে এই পল্লির পাঁচ মাসব্যাপী প্রাণচাঞ্চল্য। চলবে আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। এই ১৫১ দিনের জন্য সাগরপারের নির্জন চর হয়ে উঠবে ৩০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মমুখর এক জনপদ।

মৌসুমের শুরুতেই সাজ সাজ রব জেলেপল্লিতে

মৌসুম শুরুর আগেই জেগে উঠেছে উপকূল। বাগেরহাটের মোংলা, রামপাল, শরণখোলা, খুলনার কয়রা-দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, বরগুনা-পটুয়াখালী থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী পর্যন্ত জেলেপল্লিতে এখন একটাই ব্যস্ততা— দুবলায় মাছের অবকাঠামো নির্মাণ প্রস্তুতি প্রস্তুতি।

দুবলার চরে আগামী পাঁচ মাস ধরে চলবে শুঁটকির মহোৎসব। ছবি: রাজনীতি ডটকম
দুবলার চরে আগামী পাঁচ মাস ধরে চলবে শুঁটকির মহোৎসব। ছবি: রাজনীতি ডটকম

কেউ নৌকায় আলকাতরা দিচ্ছেন, কেউ ছিঁড়ে যাওয়া জাল সেলাই করছেন, কেউবা বাঁশ, কাঠ, গোলপাতা, দা-কুড়াল, চাল-ডাল, পানি ও শুকনো খাবার নৌকায় তুলছেন। মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে জেলেরা ছুটছেন সাগরে ভাগ্য বদলের আশায়।

৫ চরে ৫ হাজার চাতাল

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের অধীনে দুবলার চরের পাঁচটি পয়েন্টে বসে এই অস্থায়ী পল্লি। আলোরকোল, মাঝেরকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, শ্যালার চর ও মেহের আলীর চর এবং টিয়ারচর— এই ছয়টি চরই শুঁটকির রাজধানী।

বন বিভাগের হিসাবে, প্রতিটি চরে গড়ে প্রায় এক হাজার করে চাতাল বসে। প্রতিটি চাতালে ১৫ থেকে ২০ জন জেলে কাজ করেন। ভোর ৪টায় সাগর থেকে মাছ নিয়ে ফেরা, তারপর কাটা-ধোয়া। এরপর চাতালে বিছিয়ে রোদে দেওয়া সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বিরামহীন কর্মযজ্ঞ।

এখানে উৎপাদিত হয় দেশের সবচেয়ে উন্নতমানের অর্গানিক শুঁটকি। কোনো কীটনাশক ছাড়া শুধু সাগরের লোনা বাতাস ও কড়া রোদে শুকানো হয় লইট্যা, ছুরি, চ্যাঁপা, ফাইস্যা, রূপচাঁদা, চিংড়ি ও পোয়া মাছ।

শুঁটকি মৌসুম সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করলেন দুবলার চরের বাসিন্দারা। ছবি: রাজনীতি ডটকম
শুঁটকি মৌসুম সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করলেন দুবলার চরের বাসিন্দারা। ছবি: রাজনীতি ডটকম

সংশ্লিষ্টরা জানান, দুবলার এই শুঁটকি শুধু দেশের চাহিদা মেটায় না, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার শুঁটকি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও জাপানে রপ্তানি হয়। বন বিভাগও এখান থেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় তিন থেকে চার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে।

তবে জীবিকার এই উৎসব যেন সুন্দরবনের জন্য অভিশাপ না হয়, সেজন্য এবার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে বন বিভাগ।

চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস বলেন, জেলেদের নিরাপত্তা আমাদের অগ্রাধিকার। তবে সুন্দরবনের একটা পাতাও কাটা যাবে না। ঘর তৈরির সব উপকরণ বাইরে থেকে আনতে হবে। নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ, হরিণ শিকার, পলিথিন ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। স্মার্ট পেট্রোলিং টিম, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের যৌথ টহল থাকবে।

চাঁদপাই স্টেশনের সহকারী স্টেশন কর্মকর্তা মোস্তাকিম বিল্লাহ বলেন, ১ নভেম্বর থেকে বৈধ পাশ ছাড়া কাউকে চরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। পরিবেশ দূষণ করলে তাৎক্ষণিক পাশ বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা।

দুবলার চর শুধু শুঁটকিপল্লি নয়, উপকূলের হাজারও পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। সাগরের বুকে এই ভাসমান রাজ্যই প্রমাণ করে সুন্দরবনকে বাঁচিয়েই কীভাবে জীবিকা চলে। এখন অপেক্ষা শুধু অপেক্ষা— আবার মুখরিত হবে সাগরপার, বাতাসে ভাসবে শুঁটকির গন্ধ আর জেলেদের হাঁকডাক।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad