বাবার সঙ্গে সাগরে যাওয়ার পথে নদীতে পড়ে নিখোঁজ, ফিরল মেহেদীর মরদেহ

আহসান হাবিব হাসান, মোংলা
শুক্রবার বিকেলে চিলা খালের গোড়ায় ভেসে ওঠে তার নিথর দেহ। ছবি: রাজনীতি ডটকম
শুক্রবার বিকেলে চিলা খালের গোড়ায় ভেসে ওঠে তার নিথর দেহ। ছবি: রাজনীতি ডটকম

অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে সাগরে যাচ্ছিল ১৯ বছরের মেহেদী হাসান। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে মাছ ধরার কাজে যেত সে। এবারও অন্য জেলেদের সঙ্গে ট্রলারে চড়ে সাগরের পথে রওনা হয়েছিল।

কিন্তু সাগরে আর পৌঁছানো হলো না মেহেদীর। পশুর নদীতে একটি বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় ট্রলার থেকে পড়ে নিখোঁজ হয় মেহেদী। এক দিন পর শুক্রবার বিকেলে চিলা খালের গোড়ায় ভেসে ওঠে তার নিথর দেহ।

মেহেদী বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা ইউনিয়নের এক দরিদ্র জেলে পরিবারের সন্তান। তার বাবা অন্যের নৌকায় মাছ ধরে সংসার চালান। বাবার কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরার কাজে যুক্ত হয়েছিল মেহেদী। পরিবারের হাল ধরার সেই চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল তার প্রাণ।

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে মোংলার চিলা থেকে ‘এফবি মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার ১০ জন জেলেকে নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশে রওনা দেয়। ট্রলারের সবচেয়ে কম বয়সী সদস্য ছিল মেহেদী।

ট্রলারটি পশুর নদীর হাড়বাড়িয়া ও চিলা খালের মোহনার মাঝামাঝি পৌঁছালে ভোরের জোয়ারের তোড়ে প্রচণ্ডভাবে দুলতে থাকে। এ সময় ট্রলারের সামনের দিকে বসে ছিল মেহেদী। হঠাৎ বড় একটি ঢেউয়ের ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে পড়ে যায় সে। অন্য জেলেরা ‘মেহেদী পড়ে গেছে’ বলে চিৎকার দিলেও ততক্ষণে স্রোতের টানে অনেক দূরে চলে যায় সে।

ট্রলারে থাকা মাঝি মালেক বলেন, "ছেলেটা সাঁতার জানতো না ভালো। পড়ার সাথে সাথেই ডুবে গেছে। আমরা জাল ফেলেছি, অনেকক্ষণ ঘুরেছি, কিন্তু পাইনি।"

খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে যায় মোংলা ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। পশুর নদীর ওই এলাকায় টানা ছয় ঘণ্টা তল্লাশি চালিয়েও মেহেদীর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, "পশুর নদীর এই অংশে গভীরতা ৬০ ফুটের বেশি এবং স্রোত অত্যন্ত বেশি। রাতের অন্ধকারে সেখানে অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব।"

এক দিন পর শুক্রবার চিলা খালের গোড়ায় জাল পাততে গিয়ে পানিতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় জেলে রবিউল ইসলাম। তার চিৎকারে আশপাশের জেলেরা ছুটে আসেন। পরে চাঁদপাই ফরেস্ট স্টেশনে খবর দেওয়া হলে বনরক্ষীরা এসে মরদেহ উদ্ধার করেন। সেটি ছিল নিখোঁজ মেহেদীর।

চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) বলেন, "জেলেদের সহায়তায় আমরা লাশটি উদ্ধার করে মোংলা থানায় হস্তান্তর করেছি।"

মেহেদীর বাড়িতে এখন শোকের মাতম। যে ছেলেটি সংসারের অভাব ঘোচাতে বাবার পাশে দাঁড়িয়েছিল, তার এমন মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।

মেহেদীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়টি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোংলা ও রামপাল থেকে সাগরে যাওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ মাছ ধরার ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া কিংবা প্রাথমিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকে না। জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সাগরে যেতে হয় জেলেদের।

জেলে সমিতির এক নেতা বলেন, "একটা লাইফ জ্যাকেটের দাম ১৫০০ টাকা। মহাজনরা সেটাও দেয় না। সরকার থেকেও কোনো নিরাপত্তা সামগ্রী দেওয়া হয় না। এখন মেহেদী মরলো, পরে আরেকজন মরবে।"

পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষে মেহেদীর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে মোংলা কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও বন বিভাগের কর্মীরা উপস্থিত রয়েছেন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad