বিন্যান্সের ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরি, অভিযোগের তির উ.কোরিয়ার দিকে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স। ছবি: সংগৃহীত
ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের (৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার) ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশ্লেষকরা। এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকারদের হাত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, হ্যাকিংয়ের শিকার সম্পদ উদ্ধারে ইতিমধ্যে তৎপরতা শুরু করেছে বিন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করতে পেরেছে। বাকি ৩৩০ কোটি ডলারের বিষয়ে অবশ্য নতুন কোনো তথ্য দেয়নি তারা। তবে বিন্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে বলেছেন, হ্যাকিংয়ের কারণে হওয়া সব ক্ষতির দায়ই প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকাররা এ হামলা চালিয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি হ্যাকিংয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার পুরোনো ইতিহাস রয়েছে। গত বছর টোকিওভিত্তিক একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ভার্চ্যুয়াল সম্পদ চুরিতেও দেশটির হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। সেটিই ছিল এত দিন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরির ঘটনা।

ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ‘নিশ্চিতভাবেই’ এ হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার অভিজাত হ্যাকার দল ‘ট্রেডারট্রেইটার’কে দায়ী করছে। আরেক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসও একই হ্যাকার দলের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছে।

এদিকে বিন্যান্স এখনো সরাসরি স্বীকার করেনি যে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্থ চুরি হয়েছে। তবে টিআরএম ও চেইনঅ্যানালাইসিসের দাবি, ৬০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিন্যান্স শুধু জানিয়েছে, সমস্যা সমাধানে তাদের কর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মধ্য দিয়ে এ ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। এর মাধ্যমে হামলাকারী বিন্যান্সের একটি সিস্টেমে প্রবেশের সুযোগ পায় এবং অনুমতি ছাড়াই অর্থ উত্তোলন করতে সক্ষম হয়।

ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচা ও লেনদেনের সুযোগ দেওয়া বিন্যান্সের বিশ্ব জুড়ে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় তাদের হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার।

বিন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং বলেন, ‘মূল কথা হলো, আপনাদের অর্থ নিরাপদ আছে। আমরা সব ধরনের ক্ষতি পুষিয়ে দেবো।’

এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সব ধরনের অর্থ জমা ও উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা দলগুলো সিস্টেম পরীক্ষা, ডিজিটাল ওয়ালেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করার কাজ করছে। এ কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সহায়তা করছে।

শুক্রবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর পরপরই এ ঘটনার প্রভাব পড়ে। সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে নেমে আসে। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবালের শেয়ারের দাম কমে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। আর বিটকয়েনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেনের সময় প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।

২০১৭ সালে চ্যাংপেং ঝাও বিন্যান্স প্রতিষ্ঠা করেন। প্ল্যাটফর্মে অর্থ পাচার ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি গুরুতর অপরাধে দোষ স্বীকার করেন তিনি। এরপর প্রধান নির্বাহীর পদ ছাড়েন। ২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে ক্ষমা পান তিনি।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ঝাও বলেন, ‘ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ আছে!’ তবে ঘটনাটি বিন্যান্সে হ্যাকিংয়ের ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ঝাও আরও বলেন, এখন আর তিনি বিন্যান্স পরিচালনার দায়িত্বে নেই। তবে একজন শেয়ারহোল্ডার হিসেবে তিনি আশা করেন, ব্যবহারকারীদের সব অর্থের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

চেইনঅ্যানালাইসিসসহ ক্রিপ্টো খাতের বিভিন্ন বিশ্লেষকের মতে, চুরির ঘটনা নিশ্চিত হলে এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা। বড় ক্রিপ্টো মার্কেট মেকার প্রতিষ্ঠান জিএসআরের ওটিসি ব্যবসার প্রধান আরবিন্দ শ্রীনিবাসন বলেন, ‘এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিং।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ সম্পদ হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি এ নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা পুরো ক্রিপ্টো খাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় চাপের মধ্যে রয়েছে এ বাজার।

হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ আরও কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জগুলোতে রাখা সম্পদের নিরাপত্তা, লেনদেনের অপর পক্ষের ঝুঁকি, আর্থিক সক্ষমতা ও তারল্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।

বিন্যান্সের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে। ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ নামে এ তহবিলের অর্থ পুরোপুরি বিটকয়েনে রাখা হয়। নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় এ তহবিল গঠন করা হয়েছে।

পেমেন্ট ও স্টেবলকয়েন অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান ট্রেস ফাইন্যান্সের প্রধান নির্বাহী বার্নার্দো ব্রিটেস বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে হ্যাকাররা এখন নিরাপত্তার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারছেন অনেক দ্রুত। ফলে হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠছে।

ব্রিটেসের মতে, ছোট ও মাঝারি আকারের এক্সচেঞ্জ থেকে ব্যবহারকারীরা সরে যেতে পারেন। কারণ, বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নেই, এমন প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এদিকে স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ তারা জব্দ করেছে। আরেক প্রতিষ্ঠান সার্কেল জব্দ করেছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল বৃহস্পতিবার জানায়, বিন্যান্সে হ্যাকিংয়ের ঘটনায় চুরি হওয়া অর্থ জব্দ করতে তারা ক্রিপ্টো সম্পদ সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান বিটগোর সঙ্গে কাজ করেছে।

বিন্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে জানিয়েছেন, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং ওয়ার্ল্ড লিবার্টির প্রায় ২০ লাখ ডলারের টোকেন জব্দ করা হয়েছে।

ক্রিপ্টো খাতে একের পর এক চুরির ঘটনার মধ্যে সর্বশেষ এ হামলার ঘটনা ঘটল। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বিটগেট জানিয়েছিল, তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি হয়েছে। এসব ঘটনা এ খাতের নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।

প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ সরিয়ে নিতে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো ক্রমেই ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছে বলে সতর্ক করেছে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ।

বিন্যান্সের পৃথক প্রতিষ্ঠান বিন্যান্স ডট ইউএস জানিয়েছে, এ নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় তাদের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। একইভাবে কয়েনবেসও জানিয়েছে, তাদের প্ল্যাটফর্ম এ ঘটনায় আক্রান্ত হয়নি। তবে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad