বিন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, ইতিহাসের বৃহত্তম ক্রিপ্টো চুরির আশঙ্কা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স। ছবি: সংগৃহীত
ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্সে বড় ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদ ঝুঁকিতে পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় আটকে দিতে পেরেছে বিন্যান্স। বাকি ৩৩০ কোটি ডলারের সম্পদের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ঘটনাটি সত্যিকারের চুরি হয়ে থাকলে তা ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা হতে পারে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে আসার পর বিন্যান্স জানায়, প্রাথমিক তদন্তে তাদের একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার সূত্র পাওয়া গেছে। ওই ল্যাপটপের মাধ্যমে হামলাকারী প্রতিষ্ঠানের একটি সিস্টেমে প্রবেশ করে অনুমোদনহীনভাবে অর্থ উত্তোলন করতে সক্ষম হয়। তবে বিন্যান্স জানিয়েছে, তাদের কোনো ওয়ালেটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা প্রাইভেট কি ফাঁস হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পরপরই নিরাপত্তার স্বার্থে সব ধরনের জমা ও উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বিন্যান্সের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে।’ নিরাপত্তা দল ওয়ালেট অবকাঠামো সুরক্ষিত করা, আক্রান্ত সম্পদ শনাক্ত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে কাজ করছে। বিন্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে বলেছেন, ‘হ্যাকিংয়ের কারণে হওয়া সব ক্ষতির দায় বিন্যান্স বহন করবে।’

৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ আটকে দিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান

হামলার পর চুরি হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও আটকে দিতে ক্রিপ্টো খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান বিন্যান্সের সঙ্গে কাজ শুরু করে। স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রা বা স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী টেথার প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ আটকে দিয়েছে। আরেক প্রতিষ্ঠান সার্কেল আটকে দিয়েছে ৮০ কোটির বেশি ডলার।

এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যানশিয়াল তাদের অংশীদার বিটগোর সহায়তায় আক্রান্ত সম্পদ আটকে দেয়। বিন্যান্সের ই হে জানান, এতে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং প্রায় ২০ লাখ ডলারের ওয়ার্ল্ড লিবার্টি টোকেন রয়েছে। ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ আটকে দিয়েছে।

ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসের গবেষণা বিভাগের প্রধান এরিক জার্ডিন জানান, তাদের অনুসন্ধানে অন্তত ৫৯১ কোটি ২০ লাখ ডলারের সম্পদ চুরি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পদ বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, ট্রন, রিপলসহ একাধিক ব্লকচেইনে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে তদন্ত চলমান থাকায় হামলার পুরো কারণ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

ধাক্কা ক্রিপ্টো বাজারেও

নিরাপত্তা লঙ্ঘনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার এশীয় বাজারে ক্রিপ্টোকারেন্সির দামে বড় পতন ঘটে। বিটকয়েনের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে ছয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ইথেরিয়ামের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।

বিন্যান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবির দাম ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৫ শতাংশ কমে ৭১০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ক্রিপ্টো লেনদেন প্রতিষ্ঠান কয়েনবেসের শেয়ার ৪.৮ শতাংশ এবং বিটকয়েনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির শেয়ার প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।

হংকংভিত্তিক হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, ‘এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ আরও কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জে সম্পদ রাখার নিরাপত্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা, আর্থিক সক্ষমতা ও তারল্যঝুঁকি নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করতে পারে।’

ট্রেস ফিন্যান্সের প্রধান নির্বাহী বার্নার্ডো ব্রিটেসের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের কারণে সাইবার হামলা ঠেকানো ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘এআই এখন যত দ্রুত দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারে, তা ঠিক করার আগেই হামলা হয়ে যেতে পারে।’

ব্রিটেসে মনে করেন, বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নেই— এমন ছোট ও মাঝারি এক্সচেঞ্জ থেকে ব্যবহারকারীরা সরে যেতে পারেন।

ক্রিপ্টো নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো উদ্বেগ নতুন করে সামনে

বিন্যান্সের বিশ্ব জুড়ে নিবন্ধিত ব্যবহারকারী প্রায় ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার। ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব সুরক্ষা তহবিলও রয়েছে, যা বিটকয়েনে সংরক্ষিত। এ তহবিলের উদ্দেশ্য নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় সহায়তা করা।

ব্লকচেইন গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আরখামের প্রধান নির্বাহী মিগুয়েল মোরেল বলেন, তাদের তথ্যেও বিন্যান্স থেকে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে হামলাকারীর পরিচয় এখনো নিশ্চিত নয়।

এ ঘটনা ক্রিপ্টো খাতে ধারাবাহিক চুরির উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের হিসাবে, ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০টি পৃথক হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এক্সচেঞ্জ বিটগেটও প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরির কথা জানিয়েছিল।

তবে বিন্যান্সের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পৃথক প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স ইউএস জানিয়েছে, তারা এ ঘটনায় আক্রান্ত হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েনবেসও নিজেদের কার্যক্রম নিরাপদ থাকার কথা জানিয়েছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad