৬৩০ কোটি ডলার হ্যাকিং: বিন্যান্স থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়ার হিড়িক

৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ঘটনার পর গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বিন্যান্স। উত্তোলনসেবা পুনরায় চালু করার পর প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা।
বিন্যান্সের হিসাবে, রোববার (১ নভেম্বর) প্রথম সাড়ে ৯ ঘণ্টায় ৪৬৫ কোটি ডলারের উত্তোলনের বিপরীতে জমা পড়েছে মাত্র ১০১ কোটি ডলার। ফলে নিট অর্থপ্রবাহ বাইরে গেছে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ডিফাইএল্যামার হিসাবে, ২৪ ঘণ্টায় নিট অর্থপ্রবাহের পরিমাণ ৪০৫ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বড় ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের পর গ্রাহকদের এই অর্থ সরিয়ে নেওয়াকে বিন্যান্সের প্রতি আস্থার বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত ২৯ অক্টোবর বিন্যান্সের অনলাইন লেনদেনে ব্যবহৃত হট ওয়ালেটে অননুমোদিত প্রবেশের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক হিসাব, এতে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের বিভিন্ন টোকেন চুরি হয়েছে।
বিন্যান্সের ভাষ্য, হামলাকারীরা একাধিক নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ওয়ালেটের অর্থ সরিয়ে নেয়। প্রথমে একজন ডেভঅপস প্রকৌশলীর ল্যাপটপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও পরবর্তী তদন্তে আরও কয়েকটি প্রবেশপথের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে ওয়ালেটের ব্যক্তিগত চাবি ফাঁস হওয়ার প্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
হামলার পর বিন্যান্স সাময়িকভাবে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। পরে নিরাপত্তা যাচাই ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা জোরদার করে রোববার ধাপে ধাপে উত্তোলনসেবা চালু করা হয়। প্রথম ধাপে বিটকয়েন, ইথার, বিএনবি, সোলানা, এক্সআরপি, ডজকয়েনসহ ১৫টি ক্রিপ্টো সম্পদের উত্তোলন চালু হয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদের ৯৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ তারা নিজস্ব তহবিল থেকে পূরণ করেছে। বাকি পাঁচ শতাংশ তুলনামূলক কম লেনদেন হওয়া টোকেন, প্রয়োজনীয় পরিমাণ সংগ্রহে আরও সময় লাগতে পারে।
বিন্যান্সের দাবি, গ্রাহকদের ক্ষতি প্রতিষ্ঠান নিজেই বহন করবে। সাফু বা সেফ অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস এবং করপোরেট তহবিল থেকে অর্থের ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ব্লকচেইন বিশ্লেষক ও টোকেন ইস্যুকারীদের সঙ্গে কাজ করে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ ব্লকচেইনে আটকে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এই চুরির জন্য উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সাইবার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটার’কে দায়ী করেছে। এফবিআইয়ের ভাষ্য, হামলাকারীরা চুরি করা সম্পদের বড় অংশ ইথেরিয়ামে রূপান্তর করেছে এবং পরে বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন ও তাৎক্ষণিক বিনিময় সেবার মাধ্যমে অর্থ পাচারের চেষ্টা করতে পারে।
উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সাইবার হামলা ও অর্থ চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়া রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিন্যান্স জানিয়েছে, উত্তোলনের শুরুতে গ্রাহকদের অর্থ সরানোর প্রবণতা বেড়েছিল, তবে পরে তা কমতে শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের তুলনায় এই নিট উত্তোলন প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ। তবু এত বড় অঙ্কের অর্থ একসঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ায় ক্রিপ্টো বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
হ্যাকিংয়ের খবরের পর বিটকয়েন, ইথার ও বিএনবির দামেও বড় পতন দেখা যায়। বিন্যান্স এখন নতুন প্রুফ-অব-রিজার্ভস প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ— এ দাবি প্রমাণ করা এবং আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
















