সুপেয় পানির সংকট: শ্যামনগরে ২টি শোধনাগার স্থাপন আবুল খায়ের গ্রুপের

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২: ৫৯
খাগড়াঘাট ও কৈখালি গ্রামে স্থাপিত শোধনাগার দুটি শনিবার উদ্বোধন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
খাগড়াঘাট ও কৈখালি গ্রামে স্থাপিত শোধনাগার দুটি শনিবার উদ্বোধন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় দুটি পানি শোধনাগার স্থাপন করেছে আবুল খায়ের গ্রুপ। সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার খাগড়াঘাট ও কৈখালি গ্রামে স্থাপিত শোধনাগার দুটি আজ শনিবার উদ্বোধন করা হয়। রিভার্স অসমোসিস (আরও) প্রযুক্তির এসব শোধনাগারের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শোধনাগার দুটি উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ। এর একটি খাগড়াঘাটে নূরউদ্দীনের বাড়ির সামনে এবং অন্যটি কৈখালিতে আলাউদ্দিন মল্লিকের বাড়ির সামনে স্থাপন করা হয়েছে। আবুল খায়ের গ্রুপের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানির কারণে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নিরাপদ পানির জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের দূরের নলকূপ ও পুকুরের ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে কয়েক মাস চললেও বছরের বাকি সময় পানি সংগ্রহে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এতে নারী ও শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। পানি আনতে গিয়ে অনেক শিশুর পড়াশোনাও ব্যাহত হয়। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর এলাকার মাটি ও পুকুরের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

খাগড়াঘাটের গৃহবধূ রহিমা বেগম (৪৫) বলেন, “এখন কল টিপলেই মিষ্টি পানি বের হয়। এই প্রযুক্তি আমাদের জীবন বাঁচিয়ে দিল।”

তিনি জানান, বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে চলা গেলেও বছরের বাকি সময় লবণাক্ত পানি পান করতে হতো। এতে পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে শিশুরা, প্রায়ই পেটের সমস্যায় ভুগত।

কৈখালির ষাটোর্ধ্ব আমেনা খাতুন বলেন, আগে এক কলস সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে তাকে দুই থেকে তিন মাইল হাঁটতে হতো। তিনি বলেন, “এখন বাড়ির কাছে কল বসায় আমাদের পুনর্জন্ম হয়েছে।”

পানি সংগ্রহের ভোগান্তি কমায় মেয়েশিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগও বাড়ছে বলে জানান রহিমা বেগম। তিনি বলেন, “আগে মেয়েশিশুরা স্কুল বাদ দিয়ে পানি আনতে যেত। এখন পানি আনার ঝামেলা নেই, তাই তারা স্কুলে যেতে পারছে।”

আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের পানির সংকট তাদের গভীরভাবে ভাবিয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি স্থায়ী সমাধান চেয়েছিলাম, যা সরাসরি মানুষের জীবন বাঁচাবে, শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করবে।”

শোধনাগার স্থাপনের পর পানির মানেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরীক্ষাগারে করা পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, কৈখালির সাধারণ নলকূপের পানিতে টিডিএসের মাত্রা ছিল ৮ হাজার ২১৭ মিলিগ্রাম। শোধনের পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ মিলিগ্রামে। খাগড়াঘাটে আগে এই মাত্রা ছিল ৪ হাজার ৮১ মিলিগ্রাম, যা শোধনের পর নেমে এসেছে ৯২ মিলিগ্রামে। পানিতে দ্রবীভূত লবণ ও অন্যান্য পদার্থের পরিমাণ বোঝাতে টিডিএস ব্যবহার করা হয়।

পরীক্ষায় কৈখালির পানিতে আয়রনের মাত্রাও কমে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। আগে এর পরিমাণ ছিল ১ মিলিগ্রাম, শোধনের পর তা কমে হয়েছে ০.০১ মিলিগ্রাম।

শ্যামনগরের চিকিৎসক ডা. আমজাদ হোসেন জানান, পানিতে অতিরিক্ত আয়রন থাকলে তা লালচে দেখায়, স্বাদ তেতো লাগে এবং পেটের সমস্যা ও দাঁতের ক্ষতি হতে পারে। শোধনাগারের পানি ব্যবহারে আগের মতো লালচে ভাব ও তেতো স্বাদ থাকছে না বলে জানান তিনি।

পানি বিতরণে শোধনাগার দুটিতে ডিজিটাল কার্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রতিটি গ্রাহককে একটি করে কার্ড দেওয়া হয়েছে। কলের সামনে কার্ড ধরলে পানি বের হয়, আর কার্ড সরিয়ে নিলে পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায়। এতে পানির অপচয় কমানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রতিটি শোধনাগারে বসানো হয়েছে ১০টি করে সৌর প্যানেল। এসব প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতে পাম্প পরিচালিত হয়। ফলে প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা ও বিদ্যুৎ বিলের চাপ কমানোর পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সময়ও পানি সরবরাহ সচল রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় তরুণেরাও। শ্যামনগর এলাকার তরুণদের সংগঠন শরুব ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যরা শোধনাগার দুটি পরিচালনা করছেন। পানি বিতরণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে তাদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের দক্ষতা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

আবুল খায়ের গ্রুপের এ উদ্যোগের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ পানি সংগ্রহের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি নারী ও শিশুদের সময় সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভরতা কমলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতেও তা সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে পানি সংগ্রহের কাজে নারীদের সময় ও শ্রম ব্যয় কমলে পরিবার ও অন্যান্য কাজে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement