কারাগারে নির্যাতন, প্রকাশ করলে গুমের হুমকি— অভিযোগ সাবেক এনসিপি নেতা সালাউদ্দিনের

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
শুক্রবার ডিআরইউতে সংবাদ সম্মেলন করে কারাগারে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সাবেক এনসিপি নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। ছবি: সংগৃহীত
শুক্রবার ডিআরইউতে সংবাদ সম্মেলন করে কারাগারে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সাবেক এনসিপি নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। ছবি: সংগৃহীত

কারাগারে ও রিমান্ডে থাকা অবস্থায় ব্যাপক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। বলেছেন, এসব নির্যাতনের কথা প্রকাশ করলে পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এ অভিযোগ তুলে ধরেন তানভীর। এ সময় কারাগারে চিকিৎসার নামে অজ্ঞাত ওষুধ ও ইনজেকশন দেওয়া, স্ট্রোক করলেও চিকিৎসা না করানোর অভিযোগ করেন তিনি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের কারাগারে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে বলেও অভিযোগ তার।

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে ‘আপত্তিকর’ পোস্ট দেওয়ায় গত ৩১ জুলাই এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি তানভীরকে যুগ্ম সদস্য সচিবের পদ থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেয়। এর সঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে ওই পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনে গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে গত ২ আগস্ট বগুড়া সদর থানায় মামলা করেন একই উপজেলা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফতুন আহমেদ খান রুবেল। ৫ আগস্ট ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ওই দিনই তানভীরকে বগুড়ায় নিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। বগুড়া সদর আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে ১০ আগস্ট তানভীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

কারাগারে তানভীর অসুস্থ হয়ে পড়লে তার জামিন আবেদনের শুনানি এগিয়ে আনার আবেদন করা হয়। বগুড়ার আদালত হয়ে বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ায়। ৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট তাকে এক বছরের জামিন দেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে গাজী তানভীর বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কালো ছায়া এখনো রয়ে গেছে। কারাগারে এর প্রমাণ পেয়েছেন তিনি। জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও বিষয়গুলো জাতির সামনে তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন।

গাজী সালাউদ্দিন জানান, গ্রেপ্তারের পর তাকে বগুড়া কারাগারে একটি ‘চরম অপরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাসহীন’ সেলে রাখা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ ও কোনো ফ্যান ছিল না। কারারক্ষীদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের, তাদের অধিকাংশের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। তারা তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে গালিগালাজ করতেন। আশপাশের কয়েদিদের মধ্যেও আওয়ামী লীগের মামলার আসামিরা ছিলেন এবং তারাও তাকে বিভিন্নভাবে অপমান করতেন।

গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের অভিযোগ, ৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থান দিবসে কারাগারে অন্যদের ভালো খাবার দেওয়া হলেও তাকে দুই দিনের বাসি ও পচা খাবার দেওয়া হয়। পরেও তাকে পচা-বাসি খাবার দেওয়া হতো। একপর্যায়ে তার ডায়রিয়া হয়। চিকিৎসার জন্য তাকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক যে ওষুধ লিখেছিলেন, সেটি তাকে দেওয়া হয়নি। বরং প্যাকেট খুলে অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে।

অন্তত ৭০-৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন গাজী সালাউদ্দিন। বলেন, তারা আমাকে ইনজেকশন দিত। এসব কীসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। একদিন হাত-পা কাঁপতে শুরু করলে একজন চিকিৎসক ইনজেকশন দেন। এরপর ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায়।

শহিদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, গাজী সালাউদ্দিন তানভীর স্ট্রোক করেছিলেন, কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ তার স্ট্রোক করার কথা অস্বীকার করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, হাসপাতালে তার সিটি স্ক্যান করা হলেও তার রিপোর্ট তাকে জানানো হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, রিপোর্টে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। পরে এমআরআই করানোর কথা বলা হয়। কিন্তু হাসপাতালের এমআরআই মেশিন নষ্ট থাকার পরও তাঁকে মেশিনের ভেতরে ঢোকানো হয়।

তানভীর বলেন, ‘আমি ওটার (এমআরআই মেশিন) ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট আওয়াজ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেল। আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্যারালাইজড (অবশ) হয়ে গেল। আমি ১০-১২ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম।’

জ্ঞান ফিরলে গাজী সালাউদ্দিন নিজেকে শহিদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে দেখতে পান বলে জানান। তখন তার শরীরে প্রস্রাব-পায়খানা লেগে ছিল এবং একজন কোনোভাবে তাকে পরিষ্কার করে দেন। এরপর উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। কেরানীগঞ্জেও তাকে ‘খুবই খারাপ’ একটি সেলে রাখা হয়েছিল অভিযোগ করে তিনি বলেন, চিকিৎসার জন্য পিজি হাসপাতালে (বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) নেওয়া হলেও সেখানে তাকে এদিক-সেদিক ঘোরানো হয়েছে।

গাজী সালাউদ্দিনের অভিযোগ, পিজি হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফেরার পর তাকে সেল থেকে বের করে একটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। নির্যাতনের সময় এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং রাকসু নেতা সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করে তাকে বলা হতো, জুলাইয়ের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে এভাবে নির্যাতন করা হবে।

কারাগারে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন গাজী সালাউদ্দিন। তার দাবি, তিনি যে কক্ষে ছিলেন সেখান থেকে আওয়ামী লীগের মামলার আসামিদের অবস্থা দেখা যেত। তারা কারাগারে ‘রাজার হালে’ ছিলেন, ফোনে কথা বলতেন, ভালো খাবার খেতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতেন।

গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়— এটা আমি দেখেছি। এই দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও দলটির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার, মিডিয়া উপকমিটির সদস্য ইয়াসির আরাফাতসহ দলের স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও আইন সেলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement