বিজ্ঞান

মেসন জারের ইতিকথা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মেসন জার

আমরা অনেকেই হয়তো মেসন জার নামটি শুনিনি। আমাদের দেশে এটি খুব একটা প্রচলিত নয়। তবে পশ্চিমা দেশগুলোতে রান্নাঘরের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এই সাধারণ দেখতে কাঁচের জার। শুধু রান্নাঘরেই নয়, আজকাল ঘর সাজানো, উপহার দেওয়ার প্যাকেজিং, এমনকি পানীয় পরিবেশন করতেও ব্যবহার হচ্ছে মেসন জার। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, এই জারটা প্রথমে রান্নাঘরের জন্য তৈরি হয়নি একেবারেই। একেবারে অন্য উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া এই পাত্রটি কীভাবে হয়ে উঠল আধুনিক রান্নাঘরের নায়ক—সেই গল্পটাই আজ জানব আমরা।

খাবার কেন সংরক্ষণ করতে হয়?

খাবার বানানোর সঙ্গে সঙ্গে তা নষ্ট হওয়া শুরু করে। যেমন ধরুন, এক গ্লাস দুধ রেখে দিলে কিছুক্ষণ পরেই তা টক হয়ে যায়। কারণ, বাতাসে থাকা ব্যাকটেরিয়া খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দেয়। তাই মানুষ বহুদিন ধরেই নানা উপায়ে খাবার সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছে। কখনও লবণ দিয়ে, কখনও শুকিয়ে, আবার কখনও ঠান্ডায় রেখে।

তবে সবচেয়ে কার্যকর একটি পদ্ধতি হচ্ছে "ক্যানিং"—মানে খাবারকে ক্যান বা বোতলে রেখে সংরক্ষণ করা। এতে খাবারের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলা হয় গরম করে এবং পাত্রটি এমনভাবে বন্ধ করা হয় যাতে আর বাতাস ঢুকতে না পারে।

এই ক্যানিং পদ্ধতিতে প্রধানত দুটি উপায় ব্যবহার হয়—

ওয়াটার বাথ পদ্ধতি: খুব গরম পানিতে বোতল বা জার ডুবিয়ে রাখা হয়। এটা সাধারণত ফল, আচার, জ্যাম জাতীয় খাবারের জন্য ব্যবহৃত হয়।

প্রেশার ক্যানিং পদ্ধতি: বেশি তাপ ও চাপ প্রয়োগ করে সংরক্ষণ করা হয় শাকসবজি, মাংস, দুধ ইত্যাদি। এতে প্রায় ২৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপ প্রয়োগ করে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করা হয়।

এই পুরো পদ্ধতির সাথে সবচেয়ে উপযোগী যে পাত্রটি ব্যবহার হয়, সেটিই হলো মেসন জার।

১৮৫৮ সালে আমেরিকার নিউ জার্সির জন ল্যান্ডিস মেসন নামের এক তরুণ (তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর) প্রথম মেসন জার আবিষ্কার করেন। সেই সময় খাবার সংরক্ষণের জন্য নির্ভরযোগ্য কোনো পাত্র ছিল না। তখন এক ফরাসি রাঁধুনি, নিকোলাস অ্যাপার্ট, খাবার সংরক্ষণের উপায় খুঁজতে গিয়ে ব্যবহার করতেন শ্যাম্পেনের বোতল। তিনি বোতলের মুখ আটকে দিতেন পনির আর চুনের মিশ্রণ দিয়ে! ভেবেই দেখুন কী অদ্ভুত!

তবে সেই পদ্ধতিতে পুরোপুরি সুরক্ষা মিলত না। পরে তিনি বোতলের বদলে ব্যবহার করতে শুরু করেন গ্লাস জার, যার মুখে স্ক্রু লাগানো যেত। সেই আইডিয়া থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে জন মেসন তৈরি করেন এমন এক কাঁচের জার যার মুখে স্ক্রু করা ঢাকনা দেওয়া যায় এবং সেটা পুরোপুরি বায়ুরোধী হয়।

জন মেসন এক চমৎকার কাজ করেছিলেন—তিনি জারটি তৈরি করেন স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে। এতে করে বোতলের ভেতরের খাবার বাইরে থেকেই দেখা যেত। ভাবুন তো, বাইরে থেকে একদম স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে রঙিন আচার, জ্যাম বা ফল—এটা যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই ব্যবহারেও সুবিধাজনক।

প্রথম দিকে মেসনের তৈরি জার তৈরি হত অ্যাকুয়া গ্লাস দিয়ে, যেটাকে তখন বলা হতো "ক্রলিটাউন গ্লাস"। কারণ, এই কাঁচ তৈরি হতো নিউ জার্সির ক্রলিটাউন এলাকায়।

জন মেসন তার আবিষ্কারের প্যাটেন্ট নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্যাটেন্ট তিনি নেননি। যেমন—জারের ঢাকনায় রাবারের বলয় যোগ করা। এতে করে তার আবিষ্কারের নকল তৈরি শুরু হয়ে যায়। অনেকে তার ডিজাইন ব্যবহার করে নিজেদের কোম্পানি খুলে ফেলল।

জন মেসন অনেক চেষ্টা করেও তার আবিষ্কারের পুরো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। একসময় মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে এবং নানা ব্যবসায়িক জটিলতায় পড়ে তিনি পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে যান। ১৯০২ সালে তিনি মারা যান নিঃস্ব অবস্থায়।

মেসনের মৃত্যুর এক বছর পর, ১৮৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মেসন জারের উৎপাদন ও বিক্রি নতুন মাত্রা পায় বল ব্রাদার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। পাঁচ ভাই মিলে মাত্র ২০০ ডলার ধার করে একটি ছোট ক্যান তৈরির কোম্পানি কিনে ফেলেন। শুরুতে তারা কাঠ ও টিনের কন্টেইনার তৈরি করলেও পরে তারা কাঁচের জার তৈরিতে মন দেয়।

তারা ইন্ডিয়ানায় কারখানা স্থাপন করেন, কারণ সেখানে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যেত, যা কাঁচ গলানোর কাজে লাগে। বল ব্রাদার্স ধীরে ধীরে এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে তারা হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় মেসন জার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মেসন জারের উত্থান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার চালু করেছিল রেশনিং ব্যবস্থা। যুদ্ধের সময় খাবার সংরক্ষণ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার তখন জনগণকে বলেছিল নিজেদের বাড়ির পাশে ছোট বাগান করতে, যাকে বলা হতো "ভিক্টোরি গার্ডেন"। সেখানে ফল, শাকসবজি উৎপাদন করে মানুষ সেগুলো সংরক্ষণ করত ভবিষ্যতের জন্য।

তখনকার দিনে ফ্রিজ ছিল না বা খুব কম মানুষ ব্যবহার করত। তাই কাঁচের জারই ছিল প্রধান ভরসা। ফলে মেসন জারের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেল। শুধু ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত সময়েই যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০ লক্ষ মেসন জার বিক্রি হয়!

যুদ্ধের পরে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের ব্যবহার বাড়তে থাকে। ফলে মেসন জারের ব্যবহার কিছুটা কমে যায়। কিন্তু এখন আবার এটি ফিরে এসেছে নতুনভাবে। কেউ কেউ এটিকে ব্যবহার করছে পানীয় পরিবেশনে, কেউ ঘরের সাজসজ্জায়, আবার কেউ এটিকে উপহার দেওয়ার প্যাকেজিং হিসেবেও বেছে নিচ্ছেন।

মজার বিষয় হলো, এখন "গ্লাস জার" মানেই অনেকেই বুঝে নেন মেসন জার। একে বলা হয় গ্লাস জার শিল্পের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। আজও বাজারে পাওয়া যায় মেসন জার, আর তার ডিজাইন প্রায় একই রকম রয়ে গেছে সেই ১৮৫৮ সালের মতো।

একজন সাধারণ তরুণ জন ল্যান্ডিস মেসনের আবিষ্কার বদলে দিয়েছে রান্নাঘরের পুরো ধারা। যদিও তিনি তার জীবদ্দশায় সফলতা পাননি, তার তৈরি মেসন জার আজও কোটি কোটি মানুষের জীবনে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইতিহাস কখনও কখনও এমনই—আবিষ্কার বেঁচে থাকে, কিন্তু আবিষ্কারক হারিয়ে যান।

সূত্র: হিস্ট্রি ডট কম

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

জোছনা আর হারিকেন-কুপির আলোয় জমল হারানো পুঁথি পাঠের আসর

বাড়ির উঠোনের এক পাশে খড়ের পালা, অন্য পাশে পুঁথি পাঠের আয়োজন। ভ্যাপসা গরমেও মানুষের আগ্রহে কমতি নেই। আয়োজকরা ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। মাথার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ, আর উঠোনে কুপি ও হারিকেনের আলো— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অন্যরকম এক আবহ।

২৪ দিন আগে

প্রেমের নাটক-সিনেমার নির্মাণ-সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ চেয়ে আইনি নোটিশ

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে বলেছেন, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শন সামাজিক নৈরাজ্য তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। দেশে পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যুবসমাজ ও সাধারণ জনগণকে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা এবং পারি

২৭ আগস্ট ২০২৬

এথিকের ‘হাঁড়ি ফাটিবে’র শততম মঞ্চায়ন ২২ আগস্ট, বিশেষ প্রদর্শনী

এথিকের প্রথম প্রযোজনা ‘হাঁড়ি ফাটিবে’ নতুন আঙ্গিকে নির্দেশনা দিয়েছেন মিন্টু সরদার। নাটকটির শততম মঞ্চায়ন উপলক্ষ্যে মঞ্চ ও নেপথ্যে যুক্ত থাকা ১০০ জন কলাকুশলীকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হবে।

২০ আগস্ট ২০২৬

বাংলা নাটকের রূপকার সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯৪৯ সালের এ দিনে সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব কাস্টমস এবং মা মরহুম ফিরোজা খাতুন।

১৮ আগস্ট ২০২৬
Advertisement