ফিচার

কোন কোন খাবারে বেশি এলার্জি হতে পারে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ২৩: ২৫
প্রতিকী ছবি। ছবি : এআইয়ের তৈরি।

আমরা প্রতিদিন নানা রকম খাবার খাই। ভাত, ডাল, শাক-সবজি থেকে শুরু করে মাছ, মাংস কিংবা নানা রকম ফল-মূল। এই খাবারগুলো সাধারণত আমাদের শরীরের শক্তি জোগায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সুস্থ রাখে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খাবারই হয়ে ওঠে বিপদের কারণ। কারণ নির্দিষ্ট কিছু খাবার খেলে তাদের শরীরে এলার্জির প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কখনো তা হালকা চুলকানি বা হাঁচি-কাশিতে সীমাবদ্ধ থাকে, আবার কখনো শ্বাসকষ্ট কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করে।

খাদ্য-এলার্জি আসলে এক ধরনের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেমের ভুল প্রতিক্রিয়া। আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম সাধারণত জীবাণু বা ভাইরাসের মতো ক্ষতিকর জিনিসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু খাবারের প্রোটিনকেই শরীর শত্রু ভেবে বসে এবং সেটার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু করে। তখনই এলার্জির লক্ষণ দেখা দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে কয়েক কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের খাদ্য-এলার্জিতে ভুগছেন। তবে কিছু খাবার আছে যেগুলোতেই বেশি এলার্জি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই খাবারগুলো বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে।

সবচেয়ে পরিচিত খাদ্য-এলার্জির মধ্যে অন্যতম হলো বাদাম বা নাটস। চিনাবাদাম হোক কিংবা কাঠবাদাম—দুটোই অনেকের জন্য ভয়ানক হতে পারে। অল্প পরিমাণ চিনাবাদাম খাওয়ার পরই কারও কারও শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ বিষয়ে আমেরিকার নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অ্যালার্জি ও ইমিউনোলজি বিভাগের গবেষক ড. লিন্ডা কক্স বলেন—“বাদামের এলার্জি অনেক সময় জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের এলার্জি আক্রান্ত রোগীদের সবসময় সচেতন থাকতে হয়, কারণ খুব সামান্য বাদামও তাদের শরীরে বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।”

বাদামের পাশাপাশি দুধও একটি সাধারণ এলার্জির উৎস। শিশুদের মধ্যে দুধের এলার্জি বেশ বেশি দেখা যায়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে এ থেকে মুক্তি পায়। দুধে থাকা প্রোটিন কেসিন ও হুই অনেকের শরীরে সমস্যা তৈরি করে। কেউ দুধ খাওয়ার পর পেট ব্যথা, ডায়রিয়া কিংবা বমি অনুভব করেন, আবার কারও শরীরে ফুসকুড়িও উঠতে পারে।

ডিমও আরেকটি খাবার যাতে এলার্জির সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে ডিমের সাদা অংশে থাকা প্রোটিন কিছু মানুষের শরীর সহ্য করতে পারে না। ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই এলার্জি বেশি দেখা দিলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই সেরে ওঠে। কিন্তু এলার্জি থাকা অবস্থায় ডিম খেলে তা শরীরে অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

মাছ ও চিংড়ির মতো সামুদ্রিক খাবারেও অনেকের এলার্জি হয়। এসব খাবারে থাকা কিছু প্রোটিন শরীর মেনে নিতে পারে না। চিংড়ি খাওয়ার পর অনেকের চামড়ায় চুলকানি হয়, ঠোঁট বা চোখ ফুলে যায়, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া কখনো মারাত্মকও হতে পারে।

সয়াবিন ও গমের মতো খাবারেও এলার্জির ঝুঁকি আছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে গম থেকে তৈরি খাবার খাওয়ার ফলে অনেকে সমস্যায় পড়েন। গমের মধ্যে থাকা গ্লুটেন নামের প্রোটিন অনেকের শরীরে এলার্জি সৃষ্টি করে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে গ্লুটেন শুধু এলার্জিই নয়, সিলিয়াক ডিজিজ নামের আলাদা এক জটিল রোগও ডেকে আনে।

ফলমূলও সবসময় নিরাপদ নয়। কিছু ফল যেমন কলা, কিউই, স্ট্রবেরি কিংবা কমলালেবু অনেকের শরীরে এলার্জি ঘটাতে পারে। কারও শরীরে ফুসকুড়ি হয়, কারও আবার জিহ্বা ফুলে যায় বা গলা চুলকায়।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের ফুড অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর গিডিয়ন ল্যাক বলেন—“খাদ্য-এলার্জি এমন একটি সমস্যা, যেটি একবার শুরু হলে অনেক সময় সারা জীবন সঙ্গে থাকতে পারে। তবে সব ধরনের এলার্জি সমান মারাত্মক নয়। কিন্তু বাদাম বা সামুদ্রিক খাবারের মতো এলার্জি একেবারেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।”

খাদ্য-এলার্জি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না। সাধারণত ছোটবেলায় যখন শরীরের ইমিউন সিস্টেম গড়ে ওঠে, তখনই কিছু খাবারের প্রতি সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। তবে কারও ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও নতুন করে এলার্জি দেখা দিতে পারে। জিনগত কারণও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। যদি পরিবারের কারও খাদ্য-এলার্জি থাকে, তবে বংশগতভাবে সন্তানদের মধ্যেও তা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

খাদ্য-এলার্জির লক্ষণ হালকা থেকে গুরুতর হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে শুধু চামড়ায় চুলকানি বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়, আবার কারও ক্ষেত্রে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মুখমণ্ডল ফুলে যায় বা রক্তচাপ কমে যায়। গুরুতর প্রতিক্রিয়াকে চিকিৎসা-ভাষায় বলা হয় অ্যানাফাইল্যাক্সিস। এটি দ্রুত চিকিৎসা না করলে প্রাণঘাতী হতে পারে। এজন্য যাদের গুরুতর খাদ্য-এলার্জি আছে তাদের ডাক্তাররা সাধারণত ইপিনেফ্রিন ইনজেকশন বহন করতে বলেন, যাতে জরুরি অবস্থায় ব্যবহার করা যায়।

আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) একটি গবেষণায় জানিয়েছে যে, পৃথিবীতে খাদ্য-এলার্জির বড় অংশের কারণ মাত্র আট ধরনের খাবার—চিনাবাদাম, ট্রি নাটস (যেমন কাঠবাদাম, কাজু, আখরোট), দুধ, ডিম, মাছ, শেলফিশ (চিংড়ি, কাঁকড়া), সয়াবিন এবং গম। এই আটটি খাবারই বিশ্বের বেশির ভাগ খাদ্য-এলার্জির জন্য দায়ী।

খাদ্য-এলার্জি প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোন খাবারে সমস্যা হয় তা বুঝে নিতে হবে এবং সেই খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। খাবার কেনার সময় লেবেল ভালোভাবে পড়া উচিত, কারণ অনেক সময় খাবারের ভেতরে অল্প পরিমাণে হলেও বাদাম বা গমের মতো উপাদান থাকে। বাইরে খাওয়ার সময়ও সতর্ক থাকতে হবে, কারণ রেস্টুরেন্টে রান্নার সময়ও এলার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান মিশে যেতে পারে।

আমেরিকান একাডেমি অব অ্যালার্জি, অ্যাজমা অ্যান্ড ইমিউনোলজির গবেষক ড. স্কট সিশোলার বলেন—“খাদ্য-এলার্জির কোনো স্থায়ী চিকিৎসা এখনো নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে গবেষণা চলছে যাতে ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে এলার্জির খাবার খাওয়ানো হয় এবং শরীরকে সহনশীল করে তোলা হয়। যদিও এই চিকিৎসা এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে।”

খাদ্য-এলার্জি শুধু শারীরিক সমস্যাই নয়, মানসিক চাপও তৈরি করে। কারণ যারা এতে ভোগেন, তাদের প্রতিদিন খাবার বাছাই করতে হয় এবং সবসময় ভয় নিয়ে চলতে হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ তারা স্কুলে বা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে খাওয়ার সময় অসাবধানতাবশত বিপদে পড়তে পারে।

তবে আশার কথা হলো, বিজ্ঞানীরা ক্রমাগত নতুন নতুন গবেষণা করছেন। হয়তো ভবিষ্যতে খাদ্য-এলার্জিরও স্থায়ী সমাধান বের হবে। এরই মধ্যে অনেক দেশে এলার্জি-বান্ধব খাবার তৈরি হচ্ছে। যেমন দুধ বা বাদাম ছাড়া চকলেট, গ্লুটেন-ফ্রি রুটি, সয়াবিন ছাড়া সস ইত্যাদি। এগুলো খাদ্য-এলার্জি আক্রান্ত মানুষের জীবনকে সহজ করছে।

খাবার আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও সবার জন্য তা সমান নিরাপদ নয়। নির্দিষ্ট কিছু খাবার অনেকের শরীরে গুরুতর এলার্জি সৃষ্টি করতে পারে। তাই সচেতন থাকা, সঠিক তথ্য জানা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করাই হলো খাদ্য-এলার্জি থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ad
ad

ফিচার থেকে আরও পড়ুন

লালবাগ কেল্লার ইতিহাস

মোগল আমলে ঢাকা ছিল বাংলার রাজধানী। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তাঁর জামাতা সুবাদার মুজাফফর হোসেন শায়েস্তা খানের পুত্র মুহাম্মদ আজম শাহ ১৬৭৮ সালে এখানে কেল্লার নির্মাণকাজ শুরু করেন। আজম শাহ ছিলেন মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এবং পরবর্তীতে তিনি সম্রাট হয়েছিলেন।

২ দিন আগে

আদার অপকারিতা

আদায় থাকে জিঞ্জারল নামের একটি রাসায়নিক উপাদান। এটি আদার ঝাঁজ এবং গন্ধের জন্য দায়ী। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলেন, এই জিঞ্জারল পরিমাণে নিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের জন্য উপকারী, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত হলে তা শরীরে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

২ দিন আগে

রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা

লুব্ধক হলো ক্যানিস মেজর নক্ষত্রমণ্ডলের প্রধান তারা। একে অনেক সময় “ডগ স্টার” বা “বৃহৎ কুকুর” নক্ষত্রও বলা হয়। পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান তারাগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সূর্যের পর আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু। “সিরিয়াস” শব্দটির উৎস গ্রিক শব্দ Seirios, যার অর্থ ‘জ্বলন্ত’ বা ‘উজ্জ্বল’।

২ দিন আগে

যেসব কারণে বাতের ব্যথা বাড়ে

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা জীবনযাত্রার কিছু কারণে অনেক মানুষ এই ব্যথায় ভোগেন। বাতের ব্যথা মূলত সন্ধি বা জয়েন্টকে ঘিরে থাকে এবং হাঁটা-চলা, দাঁড়ানো, কাজ করা বা এমনকি স্বাভাবিক বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। অনেকে মনে করেন এটি শুধু বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, যে কোনো বয়সেই

৪ দিন আগে