স্বাস্থ্য

দাঁতে পাথর কেন হয়

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
প্রতিকী ছবি। ছবি : এআইয়ের তৈরি।

মানুষের দাঁত শুধু খাবার চিবোবার জন্য নয়, সুন্দর হাসি আর আত্মবিশ্বাসেরও প্রতীক। কিন্তু দাঁতের যত্নে সামান্য অবহেলা বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর মধ্যেই অন্যতম হলো দাঁতে পাথর জমা। দাঁতের ওপর যে শক্ত আবরণ দেখা যায়, সেটিই হলো পাথর বা ডেন্টাল ক্যালকুলাস। এটি সাধারণত প্লাক বা নরম ময়লা জমে শক্ত হয়ে গেলে তৈরি হয়। দাঁতে পাথর জমলে শুধু সৌন্দর্য নষ্ট হয় না, বরং দাঁত ও মাড়ির মারাত্মক রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। কেন দাঁতে এই পাথর হয়, তার পেছনে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা রয়েছে, আবার মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসের ভূমিকাও কম নয়।

প্রথমেই জানা দরকার দাঁতে পাথর আসলে কীভাবে তৈরি হয়। আমাদের মুখে সবসময়ই ব্যাকটেরিয়া থাকে। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো খাবারের শর্করা বা চিনি খেয়ে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং দাঁতের গায়ে আঠালো একটি স্তর তৈরি করে। এই স্তরকেই বলে প্লাক। যদি প্লাক নিয়মিত ব্রাশ ও ফ্লস দিয়ে পরিষ্কার না করা হয়, তবে মুখের লালায় থাকা খনিজ পদার্থের সঙ্গে মিশে ধীরে ধীরে এটি শক্ত হয়ে যায়। তখনই তৈরি হয় দাঁতের পাথর। অর্থাৎ, দাঁতে পাথর জমার মূল কারণ হলো মুখগহ্বরে থাকা প্লাকের শক্ত হয়ে যাওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় অ্যাট শিকাগোর ডেন্টাল কলেজের অধ্যাপক ড. ওয়েন্ডি রবার্টস বলেন, “দাঁতে প্লাক জমা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সময়মতো যদি তা সরানো না হয়, তখনই এটি কঠিন স্তরে পরিণত হয়, যাকে পাথর বলা হয়। একবার পাথর তৈরি হলে তা শুধু দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং মাড়িকেও সংক্রমিত করতে পারে।” তাঁর মতে, নিয়মিত মুখ পরিষ্কার করলেই দাঁতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

শুধু মুখের পরিচ্ছন্নতা নয়, খাবারের ধরনও দাঁতে পাথর হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. জন ম্যাকার্থি বলেন, “যেসব মানুষ বেশি পরিমাণে মিষ্টি বা আঠালো খাবার খান, তাঁদের দাঁতে প্লাক দ্রুত জমে। আবার ধূমপান বা অতিরিক্ত কফি-চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে দাঁতে প্লাক আরও দ্রুত শক্ত হয়ে পাথরে রূপ নেয়।” তাই দাঁতের যত্নে শুধু ব্রাশ করলেই হবে না, খাবারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

এ ছাড়া জিনগত কারণকেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। অনেকের লালায় ক্যালসিয়াম ও ফসফেটের মাত্রা বেশি থাকে। এতে প্লাক দ্রুত শক্ত হয়ে যায়। ফলে একই রকমভাবে দাঁতের যত্ন নেওয়া হলেও কারও দাঁতে সহজে পাথর জমে, কারও আবার কম জমে। যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের ডেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. হেলেন উইলসন বলেন, “মুখের লালার রাসায়নিক গঠন ভেদে দাঁতে পাথর জমার প্রবণতা আলাদা হতে পারে। কেউ হয়তো নিয়মিত ব্রাশ করেন, তবু তাঁর দাঁতে পাথর তৈরি হয়। আবার কেউ তুলনামূলক কম যত্ন নিলেও পাথর তত দ্রুত হয় না।”

দাঁতে পাথর জমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সঠিকভাবে ব্রাশ না করা। অনেকেই ব্রাশ করেন, কিন্তু সময় দেন না বা সঠিক কৌশল ব্যবহার করেন না। দাঁতের ভেতরের দিক, দাঁতের গোড়া বা মাড়ির সংযোগস্থল পরিষ্কার না করলে সেখানেই বেশি পাথর জমে। মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেন্টাল অ্যান্ড ক্র্যানিওফেসিয়াল রিসার্চের বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল জনসন বলেন, “প্লাক জমতে শুরু করে মাড়ির ঠিক কিনারায়। যদি এই জায়গায় ব্রাশ ঠিকভাবে না পৌঁছায়, তবে প্লাক শক্ত হয়ে পাথর তৈরি করে এবং সেখান থেকেই মাড়ির রোগের সূচনা হয়।”

মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা লালা কম তৈরি হলেও দাঁতে পাথর জমার প্রবণতা বাড়ে। যাঁদের ডায়াবেটিস আছে, তাঁরা প্রায়ই মুখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন। আবার যারা কম পানি পান করেন, তাঁদের লালার স্রোতও কম থাকে। এতে দাঁতের প্লাক সহজে পরিষ্কার হয় না, বরং শক্ত হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড স্কুল অব ডেন্টালের গবেষক ড. মারিয়া গোমেজ এ বিষয়ে বলেন, “মুখ শুকিয়ে গেলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বাড়তে থাকে। এর ফলে প্লাক জমা শুধু বেশি হয় না, বরং দ্রুত শক্ত হয়ে দাঁতে পাথরে পরিণত হয়।”

দাঁতে পাথর জমার প্রভাব শুধু সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। একবার পাথর জমে গেলে তা মাড়িতে প্রদাহ সৃষ্টি করে। মাড়ি লাল হয়ে যায়, ফোলা দেখা দেয়, এমনকি রক্তপাতও হতে পারে। একে বলে জিনজিভাইটিস। যদি এ অবস্থায় চিকিৎসা না করা হয়, তবে তা আরও গুরুতর পেরিওডন্টাইটিসে রূপ নিতে পারে, যেখানে দাঁতের গোড়ার হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে দাঁত নড়ে যেতে পারে বা পড়ে যেতে পারে।

তাহলে দাঁতে পাথর থেকে বাঁচার উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিয়মিত ও সঠিকভাবে ব্রাশ করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। দিনে অন্তত দুইবার দাঁত ব্রাশ করতে হবে। শুধু তাই নয়, ব্রাশের পাশাপাশি ফ্লস ব্যবহার করাও জরুরি, কারণ দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা প্লাক শুধু ফ্লস দিয়েই ভালোভাবে সরে। প্রতি ছয় মাস অন্তর দাঁতের ডাক্তার দেখানো এবং প্রয়োজনে পেশাদার দাঁত পরিষ্কার করানোও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু দাঁতের যত্ন নেওয়া শুধু চিকিৎসাবিদ্যার বিষয় নয়, এটা একধরনের অভ্যাসও। অনেকেই রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, দাঁত ব্রাশ না করেই। আবার কেউ কেউ মনে করেন সকালে ব্রাশ করাই যথেষ্ট। অথচ রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত না মাজলে দাঁতের গায়ে খাবারের অংশ ও ব্যাকটেরিয়া জমে দীর্ঘ সময় থাকে, যা সহজেই প্লাক ও পাথরে রূপ নেয়।

সবশেষে বলা যায়, দাঁতে পাথর হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া হলেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্পূর্ণ সম্ভব। নিয়মিত মুখ পরিষ্কার, সঠিক খাবারের অভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান আর ছয় মাস অন্তর দাঁতের ডাক্তার দেখানো—এই সাধারণ নিয়মগুলো মানলেই দাঁতকে অনেক সুস্থ রাখা যায়। আর দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে শুধু হাসি নয়, শরীরের সামগ্রিক সুস্থতাও বজায় থাকে। কারণ, আধুনিক গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে দাঁত ও মাড়ির রোগের সঙ্গে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এমনকি শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগের যোগসূত্র রয়েছে। তাই দাঁতে পাথরকে হালকা সমস্যা ভেবে অবহেলা করলে চলবে না। দাঁতের যত্ন নেওয়া মানে আসলে পুরো শরীরের যত্ন নেওয়া।

আমি চাইলে এই লেখাটিকে আরও সম্প্রসারণ করে ১২০০–১৫০০ শব্দ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারি, যেখানে দাঁতে পাথর পরিষ্কারের চিকিৎসা, লেজার বা আলট্রাসনিক স্কেলিং পদ্ধতি, এবং শিশু-বয়স্কদের দাঁতে পার্থক্যগুলোও যুক্ত করা যায়। আপনি কি চান আমি সেটা আরও বিস্তারিত করি?

ad
ad

ফিচার থেকে আরও পড়ুন

কোন কোন খাবারে এলার্জি হয় না?

লার্জি একেবারে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারও জন্য নিরাপদ খাবার অন্যের ক্ষেত্রে অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।

২ দিন আগে

‘অবিশ্বাস্য অর্জন, আর একরাশ প্রশংসা'

স্ত্রীর এমন সাফল্যের প্রশংসা করে গত সোমবার বিকেলে মিথিলার ফেসবুক পোস্টটি নিজের পেজে শেয়ার করেন সৃজিত। তার ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘‘অবিশ্বাস্য অর্জন, আর একরাশ প্রশংসা!’’

৩ দিন আগে

সহজেই ডিলিট করুন মোবাইল ফোনের ক্যাশ মেমোরি

ফোন ধীর হয়ে গেলে আমরা অনেক সময় ভাবি ফোন হয়তো পুরনো হয়ে গেছে। আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যা হয় জমে থাকা ক্যাশ ফাইলের জন্য। এগুলো মুছে ফেললে ফোন আবার অনেকটা দ্রুত হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এতে ফোনের স্টোরেজও কিছুটা খালি হয়, ফলে নতুন অ্যাপ বা ছবি রাখার জায়গা পাওয়া যায়।

৩ দিন আগে

সোমপুর বিহারের ইতিহাস

সোমপুর বিহারের মূল স্থাপনাটি আয়তাকার, যার মাঝখানে আছে একটি বিশাল স্তূপ। চারপাশে ঘিরে রয়েছে ১৭৭টি কক্ষ, যেগুলোতে ভিক্ষুরা থাকতেন। অনেকেই এটিকে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এখানে শুধু ধর্মগ্রন্থ পাঠ নয়, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, গণিত ও শিল্পকলার শিক্ষা হতো। অর্থাৎ এটি ছিল এক ধরনের

৪ দিন আগে