ইতিহাস

ষাট গম্বুজ মসজিদের ইতিহাস

অরুণাভ বিশ্বাস
চ্যাটজিপিটির চোখে ষাট গম্বুজ মসজিদ

বাংলাদেশের স্থাপত্য ইতিহাসে যে কটি নিদর্শন সবচেয়ে বেশি গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে খুলনার বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ অন্যতম। এই মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং বাংলার অতীত ইতিহাস, ইসলামি স্থাপত্যশৈলী ও স্থানীয় সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনের দৃষ্টান্ত। ষাট গম্বুজ মসজিদকে কেন্দ্র করে যে কিংবদন্তি ও ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়, তা একদিকে যেমন খান জাহান আলীর জীবনকথা তুলে ধরে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদাকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।

পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে তুর্কি বংশোদ্ভূত এক মহান সেনানায়ক খান জাহান আলী বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আসেন। তিনি শুধু একজন সামরিক নেতা ছিলেন না, ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক ও দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদও। তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা বাগেরহাট শহর, যা পরে খানজাহানাবাদ নামেও পরিচিত হয়। এখানে তিনি শুধু রাস্তা, সেতু ও খাল নির্মাণ করেননি, অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য স্থাপত্যও নির্মাণ করেছিলেন। ষাট গম্বুজ মসজিদ তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি।

ষাট গম্বুজ মসজিদের প্রকৃত নাম হলো “ষাট গম্বুজ মসজিদ” বা “ষাটকল্লা মসজিদ”। তবে অনেক ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন যে, এটির নামকরণের পেছনে কিছু বিভ্রান্তি আছে। কারণ বাস্তবে মসজিদটিতে ষাট নয়, মোট গম্বুজ আছে সাতাত্তরটি। এর মধ্যে মাঝখানে একটি বড় গম্বুজ এবং চার কোণে চারটি গম্বুজ মিলিয়ে পুরো ছাদের ওপর গম্বুজগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে। ষাট সংখ্যাটি বাংলার আঞ্চলিক ভাষায় অনেক সময় অসংখ্য বা বৃহৎ অর্থে ব্যবহৃত হতো। তাই ধারণা করা হয়, স্থানীয় মানুষ এই বিশাল মসজিদকে ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ বলেই ডাকতে শুরু করে এবং নামটি পরবর্তীতে স্থায়ী হয়ে যায়।

মসজিদের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত বিস্ময়কর। মোটা ইটের তৈরি দেওয়াল, ভেতরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ৬০টিরও বেশি পাথরের স্তম্ভ আর প্রতিটি স্তম্ভের ওপর টিকে থাকা গম্বুজ এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করেছে। বিশাল আয়তনের এই মসজিদে একসঙ্গে কয়েক হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারতেন। গবেষকেরা মনে করেন, শুধু নামাজের জন্যই নয়, মসজিদটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

ষাট গম্বুজ মসজিদের দেয়ালগুলো আজও আমাদের সামনে ইতিহাসের কথা বলে। মোটা দেয়াল শুধু স্থাপত্যশৈলীর অংশই নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাও ছিল। সুন্দরবনের কাছে অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলে আর্দ্রতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। তাই মসজিদটিকে টিকিয়ে রাখতে শক্তপোক্ত স্থাপত্য দরকার ছিল।

১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো ষাট গম্বুজ মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের কাছে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। জার্মান গবেষক ড. হান্স ফোগেল তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন—“ষাট গম্বুজ মসজিদ ইসলামি স্থাপত্যকলার সঙ্গে স্থানীয় কৃষ্টি ও নির্মাণ কৌশলের এক বিরল সমন্বয়। এর গঠনপ্রণালী প্রমাণ করে যে, খান জাহান আলী শুধু একজন ধর্মপ্রাণ শাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দুরদর্শী পরিকল্পনাকারীও।”

আবার ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ডেভিড ম্যাককাচেন তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন—“বাংলার প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে ষাট গম্বুজ সবচেয়ে বিস্ময়কর। এখানে স্থাপত্যের যে সরলতা আর দৃঢ়তা রয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোথাও দেখা যায় না। এর নির্মাণকৌশল শুধু ধর্মীয় প্রয়োজন নয়, বরং সামাজিক জীবনের প্রতিফলনও বহন করে।”

ষাট গম্বুজ মসজিদের সঙ্গে খান জাহান আলীর নাম অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। তিনি ছিলেন একাধারে সেনানায়ক, সাধক ও সমাজসংস্কারক। স্থানীয় জনশ্রুতি আছে যে, তিনি সুন্দরবন অঞ্চলের জলাভূমি খাল কেটে বসবাসের উপযোগী করেছিলেন। মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি তিনি অসংখ্য দিঘি খনন করেন, যা আজও তাঁর কীর্তি হিসেবে টিকে আছে। খলিফাতাবাদ বা খানজাহানাবাদ ছিল তাঁর গড়ে তোলা প্রশাসনিক কেন্দ্র, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল এই মসজিদ।

ষাট গম্বুজ মসজিদে প্রবেশ করলে এখনো দর্শকরা বিমোহিত হয়ে যান। ভেতরের বিশাল প্রাঙ্গণ, ছাদের ওপর সারিবদ্ধ গম্বুজ, পাথরের স্তম্ভ আর ঠান্ডা আবহ তৈরি করে এক ভিন্ন পরিবেশ। শুধু স্থাপত্য নয়, এর ভেতরে যে নীরবতা বিরাজ করে, তা দর্শনার্থীদের মনে একধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতি জাগায়।

আজ থেকে প্রায় ছয়শো বছর আগে নির্মিত এই মসজিদ এখনো টিকে আছে, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে এটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের কাজ করে যাচ্ছে। কারণ এটি শুধু মুসলিম স্থাপত্যের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ।

ষাট গম্বুজ মসজিদের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশ কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ নয়, বরং সমৃদ্ধ স্থাপত্য ও সংস্কৃতির দেশও। এই মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং একটি যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক। এখানেই মিশে আছে ইসলামী সভ্যতার মহিমা, বাংলার মানুষের পরিশ্রম এবং খান জাহান আলীর দূরদর্শিতা।

আজকের দিনে ষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের জায়গা নয়, বরং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন এবং এই স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হন।

সবশেষে বলা যায়, ষাট গম্বুজ মসজিদ কেবল একটি পুরনো স্থাপনা নয়, এটি আমাদের জাতির গৌরব, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। যেমনটি জার্মান গবেষক হান্স ফোগেল বলেছিলেন—“এই মসজিদ যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন বাংলার মানুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশ্বকে মুগ্ধ করে যাবে।”

আপনি চাইলে আমি এই ফিচারের সঙ্গে মানানসই একটি পরিচ্ছন্ন ওয়াটারকালার ইলাস্ট্রেশনও তৈরি করে দিতে পারি, যেখানে শুধু মসজিদের সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। চাইবেন কি?

ad
ad

ফিচার থেকে আরও পড়ুন

লালবাগ কেল্লার ইতিহাস

মোগল আমলে ঢাকা ছিল বাংলার রাজধানী। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তাঁর জামাতা সুবাদার মুজাফফর হোসেন শায়েস্তা খানের পুত্র মুহাম্মদ আজম শাহ ১৬৭৮ সালে এখানে কেল্লার নির্মাণকাজ শুরু করেন। আজম শাহ ছিলেন মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী এবং পরবর্তীতে তিনি সম্রাট হয়েছিলেন।

২ দিন আগে

আদার অপকারিতা

আদায় থাকে জিঞ্জারল নামের একটি রাসায়নিক উপাদান। এটি আদার ঝাঁজ এবং গন্ধের জন্য দায়ী। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলেন, এই জিঞ্জারল পরিমাণে নিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের জন্য উপকারী, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত হলে তা শরীরে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

২ দিন আগে

রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা

লুব্ধক হলো ক্যানিস মেজর নক্ষত্রমণ্ডলের প্রধান তারা। একে অনেক সময় “ডগ স্টার” বা “বৃহৎ কুকুর” নক্ষত্রও বলা হয়। পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান তারাগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সূর্যের পর আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু। “সিরিয়াস” শব্দটির উৎস গ্রিক শব্দ Seirios, যার অর্থ ‘জ্বলন্ত’ বা ‘উজ্জ্বল’।

২ দিন আগে

যেসব কারণে বাতের ব্যথা বাড়ে

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা জীবনযাত্রার কিছু কারণে অনেক মানুষ এই ব্যথায় ভোগেন। বাতের ব্যথা মূলত সন্ধি বা জয়েন্টকে ঘিরে থাকে এবং হাঁটা-চলা, দাঁড়ানো, কাজ করা বা এমনকি স্বাভাবিক বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। অনেকে মনে করেন এটি শুধু বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, যে কোনো বয়সেই

৪ দিন আগে