যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত, ঘরবাড়ি রুশদের দখলে— ফেরার জায়গা নেই হাজারও ইউক্রেনীয়ের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইউক্রেনের লুহানস্ক অঞ্চল এখন রাশিয়ার দখলে। যুদ্ধের কারণে বহু মানুষকে ছাড়তে হয়েছিল এ অঞ্চল। তাদের ছেড়ে যাওয়া ঘরবাড়ির বড় একটি অংশই দখল করে নিয়েছে রুশরা। ছবি: রয়টার্স

কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ ইউক্রেনের মেলিতোপোলে নিজের হাতে গড়া বাড়িটিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ইহোর ইভাশচুক। যুদ্ধের কারণে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বাড়ির দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন ছোটবেলার এক বন্ধুর হাতে। কিন্তু দুই বছর পর একদিন সেই বন্ধুর ফোনে জানা গেল, সামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তি বাড়িতে এসে মালিকের পরিচয় ও মালিকানার কাগজপত্র দেখতে চেয়েছে। তখনই ইভাশচুক বুঝে যান— বহু বছরের স্মৃতি আর পরিশ্রমে গড়া বাড়িটি সম্ভবত আর তার নেই।

ইহোর ইভাশচুকের এই অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে হাজার হাজার মানুষ একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। যুদ্ধ থেকে বাঁচতে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া বহু ইউক্রেনীয় এখন জানতে পারছেন, তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে বাড়িগুলো ‘মালিকবিহীন’ ঘোষণা করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে। পরে সেসব সম্পত্তি রুশ পাসপোর্টধারী নাগরিকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হচ্ছে অথবা স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

বিবিসি ভেরিফাই ও বিবিসি রাশিয়ান সার্ভিসের যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ হাজার দুইটি আবাসিক সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে অথবা জব্দের তালিকাভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাট, বাড়ি ও অবকাশযাপনের জন্য ব্যবহৃত আবাসন। এগুলো মূলত ইউক্রেনের নাগরিকদের মালিকানাধীন সম্পত্তি।

অনুসন্ধানে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ৫১৬টি ‘মালিকবিহীন সম্পত্তি’র তালিকা বিশ্লেষণ করা হয়। একই ঠিকানা একাধিকবার গণনা না করতে তালিকাগুলো যাচাই-বাছাই করে পুনরাবৃত্তি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং পরে যেসব সম্পত্তির মালিক নিজেদের অধিকার প্রমাণ করতে পেরেছেন, সেগুলোও হিসাব থেকে বাদ রাখা হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল বা অফিসের মতো অ-আবাসিক সম্পত্তি এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অনুসন্ধান বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাড়ির প্রকৃত মালিকদের কোনো ধরনের ব্যক্তিগত নোটিশ দেওয়া হয় না। বরং দখল করা অঞ্চলের সরকারি অনলাইন রেজিস্ট্রিতে প্রকাশিত ‘মালিকবিহীন’ বা ‘সম্ভাব্য মালিকবিহীন’ সম্পত্তির তালিকা ঘেঁটে মানুষকে নিজের বাড়ির খোঁজ নিতে হয়।

পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে— নিজের সম্পত্তির অধিকার ধরে রাখতে চাইলে ইউক্রেনীয় মালিককে রুশ পাসপোর্ট গ্রহণ করতে হবে, ব্যক্তিগতভাবে অধিকৃত এলাকায় ফিরে যেতে হবে এবং মস্কোর শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে কঠোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে হবে— যে প্রক্রিয়ায় অনেকের গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

নিজের হাতে গড়া বাড়ি হারানোর গল্প

ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ইহোর ইভাশচুক ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মেলিতোপোল ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। তার স্ত্রীর চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। তবে এটিই একমাত্র কারণ ছিল না। এর কিছুদিন আগেই রুশ সেনারা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে তার গির্জায় ঢুকে পড়ে। উপাসনা চলাকালেই তারা গির্জার ভেতরে প্রবেশ করে, যা পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করে তোলে। পরিস্থিতি দ্রুত এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, পরিবার নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো নিরাপদ পথ খোলা ছিল না।

ইউক্রেনের রুশ-নিয়ন্ত্রিত এলাকার বাইরে নতুন জীবন শুরু করেন ইভাশচুক। পরবর্তী দুই বছরে ধীরে ধীরে নতুন করে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এরই মধ্যে দখল করা এলাকায় ফেলে আসা ইউক্রেনীয়দের বাড়িঘর বাজেয়াপ্ত করে রুশ নাগরিকদের মধ্যে বণ্টন করার খবর নিয়মিত তার কানে পৌঁছাতে থাকে।

২০২৪ সালের শেষ দিকে ইভাশচুকের আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়। একদিন তার সেই পুরোনো বন্ধু ফোন করে জানান, সামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তি বাড়িতে এসে জানতে চেয়েছে— বাড়িটির মালিক কে এবং মালিকানার কোনো নথি আছে কি না।

(বাঁয়ে) মেলিতাপোল ছেড়ে যাওয়ার আগে চার্চে এক অনুষ্ঠানে কথা বলছেন ইহর ইভাশচুক। (ডানে) ২০২২ সালে সেই চার্চেই এক অনুষ্ঠানে রুশ সেনাদের হস্তক্ষেপ। ছবি: ইভাশচুকের সংগ্রহ থেকে বিবিসি
(বাঁয়ে) মেলিতাপোল ছেড়ে যাওয়ার আগে চার্চে এক অনুষ্ঠানে কথা বলছেন ইহর ইভাশচুক। (ডানে) ২০২২ সালে সেই চার্চেই এক অনুষ্ঠানে রুশ সেনাদের হস্তক্ষেপ। ছবি: ইভাশচুকের সংগ্রহ থেকে বিবিসি

ইভাশচুক বুঝতে পারেন, এটি ছিল সম্পত্তি দখলের প্রক্রিয়ার শুরু। কয়েক মাসের মধ্যেই তার বন্ধুকে বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়। আর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের হাতে সংস্কার ও নির্মাণ করা বাড়িটি আর তার নামে থাকেনি।

ইভাশচুক বলেন, যুদ্ধের সময় বাড়ি হারানোর যন্ত্রণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি মানুষের স্মৃতি, পরিচয় ও জীবনের একটি অংশ হারিয়ে ফেলার সমান। আক্ষেপ আর ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না এখন আমার বাড়িতে কে থাকে। একজন খ্রিষ্টান হিসেবে আমি তাকে ক্ষমা করার চেষ্টা করি। কিন্তু নিজের জীবন ভালো করার জন্য অন্য একজনের সবকিছু কেড়ে নেওয়ার যে মানসিকতা, সেটি আমি অন্যায় ছাড়া আর কিছুই বলতে পারি না। আমার বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি পাপ।’

ইভাশচুকের মতো হাজারও মানুষের গল্প এখন ছড়িয়ে রয়েছে রাশিয়া অধিকৃত ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে। দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়ার দখল করা অংশে নিজেদের প্রশাসন বসিয়েছে মস্কো। এসব প্রশাসনের মাধ্যমেই ধাপে ধাপে ইউক্রেনীয় নাগরিকদের সম্পত্তিকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।

মৃত মায়ের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিও এখন রাষ্ট্রের তালিকায়

ইহোর ইভাশচুকের মতোই নিজের বাড়ি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে মারিউপোলের বাসিন্দা ইভান্নার (ছদ্মনাম)। তার পরিবারের গল্পও এখন অধিকৃত ইউক্রেনের হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি।

ইভান্না জানান, শহরের উপকণ্ঠে তাদের যে বাড়িটি রয়েছে, সেটি তার বাবা প্রায় ১৫ বছর ধরে ধাপে ধাপে নির্মাণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই— ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশে একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তাই বনাঞ্চলের কাছাকাছি জায়গায় তৈরি করা হয় নতুন বাড়ি।

ইভান্না বলেন, ‘চিকিৎসক বলেছিলেন, মারিউপোলের দূষিত বাতাসে মা আর থাকতে পারবেন না। তাই তাকে বনাঞ্চলের কাছাকাছি কোথাও নিয়ে যেতে হবে। অনেক কষ্টে বাড়িটি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু সেখানে ওঠার কিছুদিনের মধ্যেই মা আমাদের ছেড়ে চলে যান। এরপরও বাড়িটি আমাদের পরিবারের স্মৃতির অংশ হয়ে ছিল।’

রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর ২০২২ সালে ইভান্নার পরিবার মারিউপোল ছেড়ে চলে যায়। তবে তার দাদা-দাদি বাড়িটিতে থেকেই যান। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিলে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের কর্মকর্তারা বাড়িতে হাজির হয়ে তাদের জানান, সম্পত্তিটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।

নিরাপত্তার কারণে বিবিসি বাড়িটির ছবি প্রকাশ করেনি। তবে সংবাদমাধ্যমটি বাড়িটির ছবি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করেছে। শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি নিয়ে ইভান্না বলেন, ‘এটি সেই বাড়ি, যা আমার মায়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তিনি সেখানে ছিলেন। এটি আমাদের পরিবারের স্মৃতির জায়গা— আমার শৈশব, আমাদের একসঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি। আমি কল্পনাও করতে পারি না, সেখানে অন্য কেউ বাস করছে।’

ইউক্রেনের মানচিত্রে রাশিয়ার দখল নেওয়া ঘরবাড়ি ও স্থাপনার সংখ্যা। ছবি: বিবিসি
ইউক্রেনের মানচিত্রে রাশিয়ার দখল নেওয়া ঘরবাড়ি ও স্থাপনার সংখ্যা। ছবি: বিবিসি

‘মালিকবিহীন’ ঘোষণা করে বাড়ি দখলের প্রক্রিয়া

ইভান্নার পরিবারের ঘটনা কোনো ব্যতিক্রম নয়। মারিউপোলে একটি বহুতল আবাসিক ভবনের একটি ফ্ল্যাটকে স্থানীয় রাশিয়া-সমর্থিত প্রশাসন ‘মালিকবিহীন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তদন্তে দেখা গেছে, ওই একটি ভবনের ৬১টি ফ্ল্যাট রাষ্ট্রের মালিকানায় নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

শুধু ওই এলাকাতেই ১৭টি আবাসিক ভবনের মোট ৩৯৩টি ফ্ল্যাট একই প্রক্রিয়ায় বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অনলাইনে প্রকাশিত সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের তালিকা এখন শুধু মারিউপোলেই সীমাবদ্ধ নয়। দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়ার রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত এলাকা জুড়েও একই ধরনের হাজার হাজার সম্পত্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

এর মধ্যে অনেক বাড়িই যুদ্ধের সামনের সারির কাছে অবস্থিত। কিছু ভবন গোলাবর্ষণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, আবার কিছু বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। তবু সেগুলোকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

নতুন আইনে আরও বিস্তৃত অভিযান, কী বলছে রাশিয়া

গত বছর বিবিসি প্রথম জানায়, শুধু মারিউপোলেই অন্তত পাঁচ হাজার ৭০০টি বাড়ি বাজেয়াপ্ত করার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি নতুন আইনে সই করেন, যার মাধ্যমে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়ার অধিকৃত অংশ জুড়ে একই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়।

এর ফলে স্থানীয় রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন এখন প্রকাশ্যে সম্পত্তিকে ‘মালিকবিহীন’ ঘোষণা করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে।

লন্ডনে রাশিয়ার দূতাবাসের এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য কারও সম্পত্তি দখল করা নয়। তার দাবি, আইনটি এমন সব আবাসিক সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যেগুলোর মালিককে শনাক্ত করা যাচ্ছে না অথবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

দূতাবাস আরও দাবি করে, পরে প্রকৃত মালিকরা তাদের মালিকানা প্রমাণ করতে পারলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে ইউক্রেনীয় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর অভিযোগ, বাস্তবে তাদের কেউ সম্পত্তি জব্দের আগে কোনো নোটিশ পান না। বরং অনলাইনে প্রকাশিত তালিকায় নিজেদের বাড়ির ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার পরই জানতে পারেন, তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

অধিকৃত ইউক্রেনে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের এই কর্মসূচি শুধু বাড়ি দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে শহরের রাস্তার নাম পরিবর্তন, ইউক্রেনীয় ভাষার ব্যবহার সীমিত করা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বদলে দেওয়ার উদ্যোগও সমান্তরালভাবে চলছে।

চার্চ অব গ্রেস— বাঁয়ের ছবিতে রুশদের দখল করে নেওয়ার আগে, ডানের ছবিতে দখলের পরে। ছবি: ইভাশচুকের সংগ্রহ থেকে বিবিসি
চার্চ অব গ্রেস— বাঁয়ের ছবিতে রুশদের দখল করে নেওয়ার আগে, ডানের ছবিতে দখলের পরে। ছবি: ইভাশচুকের সংগ্রহ থেকে বিবিসি

বদলে যাচ্ছে পরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতি

অধিকৃত ইউক্রেনে বাড়িঘর বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুধু সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে অঞ্চলগুলোর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ চলছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। যে গির্জায় একসময় ধর্মীয় উপাসনা পরিচালনা করতেন ইহোর ইভাশচুক, সেটিও এই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মেলিতোপোলের ‘চার্চ অব গ্রেস’ নামে পরিচিত ওই ইভানজেলিক্যাল গির্জাটি এখন আর ধর্মীয় উপাসনার স্থান নয়। রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন ভবনটিকে রাশিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি কার্যালয়ে রূপান্তর করেছে। ভবনের বাইরের রং পরিবর্তন করা হয়েছে এবং দেয়ালে আঁকা হয়েছে রুশ সেনাদের বিশাল আকারের ম্যুরাল।

একই সময়ে অধিকৃত শহরগুলোর বহু ঐতিহাসিক সড়কের নাম পরিবর্তন করে সোভিয়েত আমলের ব্যক্তিত্বদের নামে রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তে স্কুলগুলোতে ইউক্রেনীয় ভাষার ব্যবহারও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

রাশিয়ার রাজনৈতিক কৌশল, পালটা অভিযোগ

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের গবেষক ড. ইয়ারোস্লাভা বারবিয়েরি মনে করেন, এই পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল। তার ভাষায়, রাশিয়া অধিকৃত অঞ্চলগুলোর ‘জনসংখ্যাগত প্রকৌশল’ (ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং) বাস্তবায়ন করছে।

বারবিয়েরি বলেন, ‘এই কৌশলের লক্ষ্য হচ্ছে অধিকৃত অঞ্চলগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে পরিবর্তন করা, যেন ভবিষ্যতে সেগুলোকে আবার ইউক্রেনের সঙ্গে একীভূত করা রাজনৈতিকভাবেও অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে এবং বাস্তব ক্ষেত্রেও তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।’

চ্যাথাম হাউজের এই গবেষক আরও বলেন, “দেশের ভেতরে এই নীতি ক্রেমলিনের সেই সাম্রাজ্যবাদী রূপেরই প্রতিফলন, যেখানে রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে এসব অঞ্চল যুক্ত হওয়াকে একটি স্থায়ী বাস্তবতা এবং ইতিবাচক অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়। রাশিয়ার সরকারি ভাষায় এগুলোকে এখন ‘নতুন অঞ্চল’ বলা হচ্ছে।”

তবে রাশিয়া এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। লন্ডনে রাশিয়ার দূতাবাসের দাবি, যুদ্ধের মূল কারণ ভিন্ন। দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেন সরকার দীর্ঘদিন ধরে রুশ ভাষাকে পরিকল্পিতভাবে প্রান্তিক করেছে, রুশভাষী জনগোষ্ঠীর অধিকার খর্ব করেছে এবং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।

রাশিয়ার দাবি, সংঘাতের মূল কারণ সেখানেই নিহিত। আর সে কারণেই এখন তারা এসব অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ভাষা-সংস্কৃতির আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুশভাষী জনগোষ্ঠীর ‘অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া’র চেষ্টা করছে।

ইউক্রেনীয়দের ঘরবাড়ি দখল করে নিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সই করা নতুন আইন। ছবি: বিবিসি
ইউক্রেনীয়দের ঘরবাড়ি দখল করে নিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সই করা নতুন আইন। ছবি: বিবিসি

কারা পাবেন নতুন বাড়ি?

ভ্লাদিমির পুতিনের সই করা আইনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে যেসব মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে, তাদের বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবে এই সুযোগ কেবল তাদের জন্যই প্রযোজ্য, যারা রাশিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, নিজ বাড়ি হারানো সব ইউক্রেনীয় এই সুবিধার আওতায় পড়ছেন না।

তবে এই কর্মসূচির সুবিধাভোগী কিছু রুশ নাগরিকও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। মারিউপোলভিত্তিক টেলিগ্রাম গ্রুপগুলোর বিভিন্ন আলোচনায় দেখা গেছে, নতুন ফ্ল্যাট পাওয়া কয়েকজন বাসিন্দা জানতে চাইছেন— তাদের বরাদ্দ দেওয়া অ্যাপার্টমেন্টগুলো সত্যিই মালিকবিহীন ছিল কি না, নাকি সেগুলোর প্রকৃত মালিক এখনো জীবিত আছেন।

ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় হাজারও বাস্তুচ্যুত মানুষ

যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত ও বাড়িঘর হারানো নাগরিকদের জন্য ইউক্রেন সরকারেরও একটি ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি রয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত বা দখল হওয়া সম্পত্তির মালিকেরা সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন।

তবে বিবিসিকে অনেকেই জানিয়েছেন, কয়েক মিলিয়ন বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের চাপের কারণে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। মারিউপোলের বাসিন্দা মিলা (নিরাপত্তার কারণে পূর্ণ নাম প্রকাশ করা হয়নি) যেমন বর্তমানে ইউরোপের একটি দেশে বসবাস করছেন। নিজের ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাটের প্রমাণপত্র ইউক্রেন সরকারের কাছে জমা দিলেও এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সাড়া পাননি।

মিলার ভাষায়, কিছু ধনী ইউক্রেনীয় দাতা আহত সেনাসদস্যদের জন্য আলাদা সহায়তা দিলেও তার পরিবার সেই সহায়তার আওতায় পড়ে না।

মিলা বলেন, ‘আমি এখন প্রায় মেনে নিয়েছি— সম্ভবত কেউ আমাকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না। আমরা গৃহহীন নই। আমরা ইউক্রেনে ফিরে যেতে চাই, দেশটাকে আবার গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু আমাদের ফিরে যাওয়ার মতো আর কোনো বাড়ি নেই।’

ফিরে পাওয়ার আশা ক্ষীণ

ইভান্নাও জানেন না, তাদের বাড়িটির বর্তমান অবস্থা কী। ইউক্রেন থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে তার বিশ্বাস, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়িটি একদিন ফেরত পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

ইভান্না বলেন, ‘যদি তারা বাড়িটি সত্যিই নিয়ে নেয়, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি আর ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’

অন্যদিকে ইহোর ইভাশচুকও জানেন না, তার বহু বছরের পরিশ্রমে গড়া বাড়িটিতে এখন কে বসবাস করছেন। তবু তিনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ঘৃণার বদলে ক্ষমার পথ বেছে নিতে চান। তবে একটি বিষয় তিনি এখনও মেনে নিতে পারেন না।

বাড়ি হারানোর এই হাজারো গল্প শুধু যুদ্ধের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, পরিচয়, শিকড় এবং নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার হারানোর ইতিহাসও। আর যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে— অধিকৃত ইউক্রেনে লড়াই এখন শুধু ভূখণ্ডের নয়, মানুষের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএফকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা রাশিয়ার

২০১৫ সালে ‘অবাঞ্ছিত সংগঠন’ আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে রাশিয়া শত শত বিদেশি সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এই তালিকায় রয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, বিভিন্ন স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।

১১ ঘণ্টা আগে

রাজনৈতিক আশ্রয় ইস্যুর সমাধান, কূটনৈতিক সম্পর্কে ফিরল মেক্সিকো-পেরু

সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পেছনে পেরুর নতুন ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট কেইকো ফুজিমোরির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গত জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তিনি মেক্সিকোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

১১ ঘণ্টা আগে

ওয়াইল্ডবেরিজে ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা, রাশিয়ার ই-কমার্স খাতে বড় ধাক্কা

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, গত ১৮ জুলাই থেকে প্রায় প্রতি রাতেই রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামগুলোতে হামলা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ২০টি গুদাম লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এসব হামলায় বড় অগ্নিকাণ্ড, বিপুল পরিমাণ পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি এবং দেশটির বিস্তৃত সরবরাহ নেটওয়ার্কে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়

১২ ঘণ্টা আগে

চীনা পলিসিলিকনে ১৫ শতাংশ নতুন শুল্ক ট্রাম্পের, বেইজিংয়ের ক্ষোভ

পলিসিলিকন হলো অত্যন্ত বিশুদ্ধ সিলিকনের একটি রূপ, যা সেমিকন্ডাক্টর চিপ, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এবং সৌর প্যানেল তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। বর্তমানে এ খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক চীন।

১৩ ঘণ্টা আগে