
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের আটকে থাকা সম্পদ নিয়ে দুই পক্ষের পালটাপালটি শর্তে চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও অনিশ্চিত। একই সঙ্গে স্মারকে উল্লেখিত ৬০ দিনের প্রক্রিয়াটি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য, নাকি শত্রুতার স্থায়ী অবসানের পথ তৈরির জন্য— তা নিয়েও রয়ে গেছে ধোঁয়াশা।
শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, এই দুই মাসব্যাপী প্রক্রিয়ায় কোন পদক্ষেপের পর কোনটি আসবে, তা নির্ধারণ করাও এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া চুক্তির খসড়াটির প্রতিটি শব্দ, বাক্যের বিন্যাস এবং একটি বিষয়ের সঙ্গে অন্য বিষয়ের পারস্পরিক সংযোগ এতটাই সংবেদনশীল যে, উভয় পক্ষই প্রতিটি লাইন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকটি মাত্র এক পৃষ্ঠার এবং এতে সংক্ষেপে মাত্র ডজনখানেক পয়েন্ট রয়েছে। তবে বাস্তবে বিষয়টি মোটেও ততটা সরল নয়। গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের এমন একটি কূটনৈতিক সমাধান দরকার যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে যে কোন কোন বিষয়ে তারা আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং প্রক্রিয়াটি ফলপ্রসূ করতে একদম শুরুতেই তারা কতটা ছাড় দিতে রাজি আছে।’
বর্তমান পরিস্থিতি
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গত বৃহস্পতিবার জানানো হয়, চলমান যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপান্তর করতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সম্ভাব্য সমঝোতার পথে এগোচ্ছে। তবে শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেন, যা তেহরানের আপত্তির মুখে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে 'সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ' এবং একটি ‘কৃত্রিম জয়’ দেখানোর চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও বলেছেন, “আমেরিকানরা যেসব বিষয়কে ‘অবশ্যই পালনীয়’ বলে তুলে ধরছে, সেগুলো আসলে তাদের অনুরোধ মাত্র।”
ফলে এটি স্পষ্ট যে, সমঝোতা স্মারকটি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি এবং এটি নিয়ে এখনো কাজ চলছে।

এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গতকাল শনিবার সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’ শীর্ষক আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে জানান যে, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। ট্রাম্প তাকে পুনর্ব্যক্ত করতে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগে একটি ‘দুর্দান্ত চুক্তি’ নিশ্চিত করার জন্য তিনি যথেষ্ট ধৈর্য ধরতে প্রস্তুত।
প্রথম পদক্ষেপ: হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ তিন মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করাকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ‘কোনো রকম শুল্ক ছাড়াই হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উভয়মুখী চলাচলের উদ্দেশ্যে খুলে দিতে হবে।’ একই সঙ্গে এই জলপথ থেকে মাইন অপসারণের দায়িত্ব ইরানকে নিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিনিময়ে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে বলে জানান ট্রাম্প।

সমঝোতা আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরান ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সম্মত হতে পারে। তবে শিপিং খাতের সূত্রগুলো বলছে, ওই রুট দিয়ে পুনরায় জাহাজ পাঠানোর আগে তারা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত হওয়ার জন্য কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করতে চায়।
ট্রাম্প যেখানে সম্পূর্ণ অবাধ ও বাধাহীন নৌ চলাচলের ওপর জোর দিচ্ছেন, সেখানে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে এই আন্তর্জাতিক জলপথের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী অধিকার নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে ইরান। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানকে এক সুতোয় গাঁথাই এখন বড় পরীক্ষা।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালির 'স্মার্ট ব্যবস্থাপনা' নিশ্চিত করতে চায়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা স্থায়ী প্রকৃতির, এটি কোনো সাময়িক বিষয় নয়।’
এদিকে ট্রাম্প পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের মিত্র ওমানকে ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তিতে জড়ানোর বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘ওমানকেও সবার মতো আচরণ করতে হবে, অন্যথায় আমরা তাদের উড়িয়ে দেবো। তারা বিষয়টি বোঝে এবং আশা করি সব ঠিকঠাক থাকবে।’
অন্যদিকে, তেহরানের পক্ষ থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবির সঙ্গে নৌ চলাচল চালুর বিষয়টি কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তাও একটি বড় প্রশ্ন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ মে পর্যন্ত ১১৫টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে ইরানের বন্দরে কোনো ধরনের বাণিজ্য করতে না পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই শনিবার বলেন, ‘নৌ অবরোধ অব্যাহত রেখে এবং আলোচনায় অতিরিক্ত শর্ত জুড়ে দিয়ে ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনি আসলে সমঝোতা চান না, বরং তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, সমঝোতা স্মারকে অবরোধ প্রত্যাহারের পাশাপাশি ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হতে পারে এবং হরমুজ উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতিতে কোনো ‘সামরিক যুদ্ধজাহাজ’ অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। তবে শুক্রবারের বক্তব্যে ট্রাম্প সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা এগোলেও সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় অপেক্ষা করছে পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে। কারণ এই ইস্যুই বহু বছর ধরে তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার কারণ।
সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা চালু হবে। গত বছর এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনাতেও এটিই ছিল প্রধান বিষয়।
উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে বর্তমানে ৪৪০ কেজিরও বেশি (৯৭০ পাউন্ড) উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে।
শুক্রবার ট্রাম্প তার কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘ইরানকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।’ তিনি আরও দাবি করেন, গত জুনে মার্কিন হামলার পর ইরানের ইউরেনিয়ামের যে মজুত লুকিয়ে ফেলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যৌথ অভিযানে তা উদ্ধার করে ধ্বংস করা হবে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ট্রাম্পের এই দাবি দ্রুতই প্রত্যাখ্যান করেছে।
ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, তিনি চান না এই ইউরেনিয়াম রাশিয়া বা চীনে পাঠানো হোক, যদিও রাশিয়া তা গ্রহণে বারবার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে ইরানের তুলনামূলক কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত এই আলোচনার অংশ হবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানি আইনপ্রণেতা আজিজি শুক্রবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো তৃতীয় দেশে হস্তান্তরে রাজি নয়।’
সিএনএন বলছে, প্রাথমিক এই সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত কিছু থাকার সম্ভাবনা কম। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইরান আরও অনেক কম সময়ের জন্য এটি স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।
আটকে থাকা সম্পদ
যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে ছিল এবং যুদ্ধের পর সেখানে বেকারত্ব আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত হওয়া তেহরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোর একটি।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির একটি লিখিত বার্তায় দেশটির পার্লামেন্টকে ‘পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠাকে’ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরান অবিলম্বে বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা তাদের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। তবে গত সপ্তাহে সিএনএনকে এক ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত হওয়ার পরই কেবল ইরানের এই অর্থ অবমুক্ত করা হবে। ট্রাম্পও শুক্রবার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ লেনদেন করা হবে না।’
ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম গত মঙ্গলবার জানিয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটন সমঝোতায় পৌঁছালে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত হতে পারে। চুক্তি ঘোষণার পরপরই এর অর্ধেক অর্থ ছাড় করা হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, একটি চূড়ান্ত চুক্তি হলে ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য শত শত কোটি ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ দেবে না; তহবিলের সিংহভাগ অর্থ আসবে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। গত মাসে ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় তাদের প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা
সমঝোতার আরেকটি বড় জটিলতা হলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময় ও শর্ত নির্ধারণ। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের শর্তের সঙ্গে তেহরানের আর্থিক দাবিগুলোকে মেলাতে ‘নো ডাস্ট, নো ডলারস’ (ইউরেনিয়াম সরানো না হলে ডলার নয়) নীতি ব্যবহার করছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা সিএনএনকে এ-ও জানিয়েছেন, আটকে থাকা সম্পদের মতোই ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো তখনই প্রত্যাহার করা হবে যখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হবে।
ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত। এগুলো এখনই পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে না, বরং তা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, ‘সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পরই বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।’
এদিকে ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান আশা করছে কেবল তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই ৬০ দিনে সরকারের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় হতে পারে।
লেবানন পরিস্থিতি
ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সমর্থনপুষ্ট লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর চলমান সংঘাত এই সমঝোতা স্মারকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে গত সপ্তাহে ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা স্মারক ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ অবসানে’র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
গত কয়েক দিনে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের আরও গভীরে তাদের অনুপ্রবেশ বাড়িয়েছে এবং নতুন করে এলাকা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলে ড্রোন ও রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে।
ওয়াশিংটনের অনুরোধে গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল-লেবাননের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, তা এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের প্রতি তাদের সমর্থন দ্বিগুণ করেছে।

এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টের হুমকি মোকাবিলায় ইসরায়েলের ‘অভিযান পরিচালনার স্বাধীনতা’ বজায় রাখার ইচ্ছাকে তিনি সমর্থন করেন।
শেষ কথা: বিশ্বাস ও যাচাই
দুই পক্ষের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস পুরো আলোচনা প্রক্রিয়ার ওপর বড় ছায়া ফেলছে। ইরানি কর্মকর্তারা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, গত এক বছরে আলোচনা চলাকালীন অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্র দুইবার তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক দর কষাকষিতে জটিলতায় পড়েছে আলোচনা প্রক্রিয়া।
শুক্রবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘আশ্বাস বা মুখের কথায় আমাদের কোনো আস্থা নেই— কেবল কাজই আমাদের কাছে একমাত্র পরিমাপক। অপর পক্ষের পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।’
এখন প্রশ্ন একটাই— পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শর্তের দেয়াল ভেঙে দুই দেশ কি সত্যিই একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে, নাকি সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর ফের নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যে? হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বহুল আলোচিত এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
রাজনীতি/আইআর

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের আটকে থাকা সম্পদ নিয়ে দুই পক্ষের পালটাপালটি শর্তে চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও অনিশ্চিত। একই সঙ্গে স্মারকে উল্লেখিত ৬০ দিনের প্রক্রিয়াটি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য, নাকি শত্রুতার স্থায়ী অবসানের পথ তৈরির জন্য— তা নিয়েও রয়ে গেছে ধোঁয়াশা।
শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, এই দুই মাসব্যাপী প্রক্রিয়ায় কোন পদক্ষেপের পর কোনটি আসবে, তা নির্ধারণ করাও এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া চুক্তির খসড়াটির প্রতিটি শব্দ, বাক্যের বিন্যাস এবং একটি বিষয়ের সঙ্গে অন্য বিষয়ের পারস্পরিক সংযোগ এতটাই সংবেদনশীল যে, উভয় পক্ষই প্রতিটি লাইন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকটি মাত্র এক পৃষ্ঠার এবং এতে সংক্ষেপে মাত্র ডজনখানেক পয়েন্ট রয়েছে। তবে বাস্তবে বিষয়টি মোটেও ততটা সরল নয়। গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের এমন একটি কূটনৈতিক সমাধান দরকার যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে যে কোন কোন বিষয়ে তারা আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং প্রক্রিয়াটি ফলপ্রসূ করতে একদম শুরুতেই তারা কতটা ছাড় দিতে রাজি আছে।’
বর্তমান পরিস্থিতি
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গত বৃহস্পতিবার জানানো হয়, চলমান যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপান্তর করতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সম্ভাব্য সমঝোতার পথে এগোচ্ছে। তবে শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেন, যা তেহরানের আপত্তির মুখে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে 'সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ' এবং একটি ‘কৃত্রিম জয়’ দেখানোর চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও বলেছেন, “আমেরিকানরা যেসব বিষয়কে ‘অবশ্যই পালনীয়’ বলে তুলে ধরছে, সেগুলো আসলে তাদের অনুরোধ মাত্র।”
ফলে এটি স্পষ্ট যে, সমঝোতা স্মারকটি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি এবং এটি নিয়ে এখনো কাজ চলছে।

এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গতকাল শনিবার সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’ শীর্ষক আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে জানান যে, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। ট্রাম্প তাকে পুনর্ব্যক্ত করতে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগে একটি ‘দুর্দান্ত চুক্তি’ নিশ্চিত করার জন্য তিনি যথেষ্ট ধৈর্য ধরতে প্রস্তুত।
প্রথম পদক্ষেপ: হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ তিন মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করাকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ‘কোনো রকম শুল্ক ছাড়াই হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উভয়মুখী চলাচলের উদ্দেশ্যে খুলে দিতে হবে।’ একই সঙ্গে এই জলপথ থেকে মাইন অপসারণের দায়িত্ব ইরানকে নিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিনিময়ে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে বলে জানান ট্রাম্প।

সমঝোতা আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরান ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সম্মত হতে পারে। তবে শিপিং খাতের সূত্রগুলো বলছে, ওই রুট দিয়ে পুনরায় জাহাজ পাঠানোর আগে তারা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত হওয়ার জন্য কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করতে চায়।
ট্রাম্প যেখানে সম্পূর্ণ অবাধ ও বাধাহীন নৌ চলাচলের ওপর জোর দিচ্ছেন, সেখানে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে এই আন্তর্জাতিক জলপথের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী অধিকার নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে ইরান। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানকে এক সুতোয় গাঁথাই এখন বড় পরীক্ষা।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালির 'স্মার্ট ব্যবস্থাপনা' নিশ্চিত করতে চায়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা স্থায়ী প্রকৃতির, এটি কোনো সাময়িক বিষয় নয়।’
এদিকে ট্রাম্প পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের মিত্র ওমানকে ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তিতে জড়ানোর বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘ওমানকেও সবার মতো আচরণ করতে হবে, অন্যথায় আমরা তাদের উড়িয়ে দেবো। তারা বিষয়টি বোঝে এবং আশা করি সব ঠিকঠাক থাকবে।’
অন্যদিকে, তেহরানের পক্ষ থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবির সঙ্গে নৌ চলাচল চালুর বিষয়টি কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তাও একটি বড় প্রশ্ন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ মে পর্যন্ত ১১৫টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে ইরানের বন্দরে কোনো ধরনের বাণিজ্য করতে না পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই শনিবার বলেন, ‘নৌ অবরোধ অব্যাহত রেখে এবং আলোচনায় অতিরিক্ত শর্ত জুড়ে দিয়ে ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনি আসলে সমঝোতা চান না, বরং তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, সমঝোতা স্মারকে অবরোধ প্রত্যাহারের পাশাপাশি ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হতে পারে এবং হরমুজ উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতিতে কোনো ‘সামরিক যুদ্ধজাহাজ’ অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। তবে শুক্রবারের বক্তব্যে ট্রাম্প সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা এগোলেও সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় অপেক্ষা করছে পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে। কারণ এই ইস্যুই বহু বছর ধরে তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার কারণ।
সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা চালু হবে। গত বছর এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনাতেও এটিই ছিল প্রধান বিষয়।
উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে বর্তমানে ৪৪০ কেজিরও বেশি (৯৭০ পাউন্ড) উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে।
শুক্রবার ট্রাম্প তার কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘ইরানকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।’ তিনি আরও দাবি করেন, গত জুনে মার্কিন হামলার পর ইরানের ইউরেনিয়ামের যে মজুত লুকিয়ে ফেলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যৌথ অভিযানে তা উদ্ধার করে ধ্বংস করা হবে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ট্রাম্পের এই দাবি দ্রুতই প্রত্যাখ্যান করেছে।
ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, তিনি চান না এই ইউরেনিয়াম রাশিয়া বা চীনে পাঠানো হোক, যদিও রাশিয়া তা গ্রহণে বারবার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে ইরানের তুলনামূলক কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত এই আলোচনার অংশ হবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানি আইনপ্রণেতা আজিজি শুক্রবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো তৃতীয় দেশে হস্তান্তরে রাজি নয়।’
সিএনএন বলছে, প্রাথমিক এই সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত কিছু থাকার সম্ভাবনা কম। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইরান আরও অনেক কম সময়ের জন্য এটি স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।
আটকে থাকা সম্পদ
যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে ছিল এবং যুদ্ধের পর সেখানে বেকারত্ব আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত হওয়া তেহরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোর একটি।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির একটি লিখিত বার্তায় দেশটির পার্লামেন্টকে ‘পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠাকে’ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরান অবিলম্বে বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা তাদের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। তবে গত সপ্তাহে সিএনএনকে এক ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত হওয়ার পরই কেবল ইরানের এই অর্থ অবমুক্ত করা হবে। ট্রাম্পও শুক্রবার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো অর্থ লেনদেন করা হবে না।’
ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম গত মঙ্গলবার জানিয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটন সমঝোতায় পৌঁছালে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত হতে পারে। চুক্তি ঘোষণার পরপরই এর অর্ধেক অর্থ ছাড় করা হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া, একটি চূড়ান্ত চুক্তি হলে ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য শত শত কোটি ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ দেবে না; তহবিলের সিংহভাগ অর্থ আসবে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। গত মাসে ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় তাদের প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা
সমঝোতার আরেকটি বড় জটিলতা হলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময় ও শর্ত নির্ধারণ। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণের শর্তের সঙ্গে তেহরানের আর্থিক দাবিগুলোকে মেলাতে ‘নো ডাস্ট, নো ডলারস’ (ইউরেনিয়াম সরানো না হলে ডলার নয়) নীতি ব্যবহার করছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা সিএনএনকে এ-ও জানিয়েছেন, আটকে থাকা সম্পদের মতোই ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো তখনই প্রত্যাহার করা হবে যখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হবে।
ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত। এগুলো এখনই পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে না, বরং তা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, ‘সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পরই বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।’
এদিকে ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান আশা করছে কেবল তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই ৬০ দিনে সরকারের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় হতে পারে।
লেবানন পরিস্থিতি
ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সমর্থনপুষ্ট লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর চলমান সংঘাত এই সমঝোতা স্মারকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে গত সপ্তাহে ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা স্মারক ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ অবসানে’র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
গত কয়েক দিনে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের আরও গভীরে তাদের অনুপ্রবেশ বাড়িয়েছে এবং নতুন করে এলাকা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলে ড্রোন ও রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে।
ওয়াশিংটনের অনুরোধে গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল-লেবাননের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, তা এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের প্রতি তাদের সমর্থন দ্বিগুণ করেছে।

এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টের হুমকি মোকাবিলায় ইসরায়েলের ‘অভিযান পরিচালনার স্বাধীনতা’ বজায় রাখার ইচ্ছাকে তিনি সমর্থন করেন।
শেষ কথা: বিশ্বাস ও যাচাই
দুই পক্ষের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস পুরো আলোচনা প্রক্রিয়ার ওপর বড় ছায়া ফেলছে। ইরানি কর্মকর্তারা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, গত এক বছরে আলোচনা চলাকালীন অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্র দুইবার তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক দর কষাকষিতে জটিলতায় পড়েছে আলোচনা প্রক্রিয়া।
শুক্রবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘আশ্বাস বা মুখের কথায় আমাদের কোনো আস্থা নেই— কেবল কাজই আমাদের কাছে একমাত্র পরিমাপক। অপর পক্ষের পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।’
এখন প্রশ্ন একটাই— পারস্পরিক অবিশ্বাস ও শর্তের দেয়াল ভেঙে দুই দেশ কি সত্যিই একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে, নাকি সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর ফের নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যে? হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা সম্পদ অবমুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বহুল আলোচিত এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
রাজনীতি/আইআর

জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেন, ভারতের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী আধুনিক ও বহুমাত্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ সক্ষমতা আরও জোরদার করছে। বর্তমানে যুদ্ধ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও সশস্ত্র বাহিনী উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
১৬ ঘণ্টা আগে
গ্রিন কার্ড বা স্থায়ী আবাসন আবেদনকারীদের আবেদন পর্যালোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যেতে হবে বলে জারি করা নির্দেশনা স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানিয়েছে, স্থায়ী আবাসনের আবেদন পর্যালোনাধীন থাকা অবস্থায় অধিকাংশ আবেদনকারীকেই যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যেতে হবে ন
১৬ ঘণ্টা আগে
জয়সওয়াল বলেন, এই সফর আমাদের দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান শক্তিশালী আধ্যাত্মিক, ঐতিহাসিক ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং চলমান সহযোগিতার গভীরতাকেই প্রতিফলিত করে।
১৭ ঘণ্টা আগে
শনিবার (৩০ মে) বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর এশিয়ার এ নিরাপত্তা মঞ্চে ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান কেমন হবে, তা নিয়ে নানামুখী জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্য সামনে এলো।
২০ ঘণ্টা আগে