ইরান যুদ্ধ: নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে উপসাগরীয় দেশগুলো

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১৮: ১৬
ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বড় অংশের লক্ষ্যই ছিল উপসাগরীয় দেশগুলো। প্রতীকী ছবি

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে। এরই মধ্যে এসব দেশ নতুন করে নিরাপত্তা কৌশল সাজানোর উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনীতি পুনর্গঠন, ইরানের বাড়তি প্রভাব ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে তারা নতুন নিরাপত্তা অংশীদারও খুঁজছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা ও তাদের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে থাকবে। কারণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তাদের ভূখণ্ডে থাকায় এসব দেশ সরাসরি ইরানের পালটা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম হরমুজ প্রণালি। উপসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্যের বড় অংশই নির্ভর করে এই নৌ রুটের ওপর। এবারের যুদ্ধের শুরু থেকেই রুটটি বন্ধ রেখেছিল ইরান। এখন যখন যুদ্ধবিরতি চলছে, তখনো ইরান এ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার শর্ত দিয়েছে। এ শর্ত কার্যকর থাকলে তা উপসাগরীয় অর্থনীতিকে যেকোনো সময় চাপে ফেলতে পারবে ইরান। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্ভাব্য আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যু হতে যাচ্ছে।

ছয় সপ্তাহের সংঘাতে ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বড় অংশের লক্ষ্যই ছিল উপসাগরীয় দেশগুলো। এসব হামলার বেশির ভাগই প্রতিহত করা গেছে বলে দাবি করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তবে এরপরও তারা বুঝতে পারছে, এককভাবে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।

ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন তুলনামূলক কঠোর অবস্থানে থাকলেও অন্য কিছু দেশ ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফেরানোর পক্ষে।

যুদ্ধবিরতি চালু হলেও এ অঞ্চলের উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করেছে, লাভান দ্বীপে তাদের তেল স্থাপনায় হামলার পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা থাকতে পারে, যদিও এ বিষয়ে আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। অন্যদিকে সংঘাত শুরুর পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ফোনে কথা বলে উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প নিরাপত্তা জোট গড়ে তুলতে চাইছে। কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বাদার আল-সাইফের মতে, তুরস্কসহ মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারি বাড়ানো জরুরি, যেন অঞ্চলটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে।

এরই মধ্যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো সামরিকভাবে সক্ষম দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ছে বলে ইঙ্গিত মিলছে। যুদ্ধের আগেই পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি আরব, ভারতের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলে আমিরাত। সংঘাত চলাকালে ইউক্রেনের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি করে সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার, যেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় ড্রোন হুমকি মোকাবিলায়।

এর বাইরে ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনা থাকলেও সেটি বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্চে সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর ও পাকিস্তানকে নিয়ে ‘স্টেপ’ নামে নতুন একটি জোটের উদ্যোগ দেখা গেছে। তবে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও লক্ষ্য নিয়ে অস্পষ্টতা এ উদ্যোগকে দুর্বল করে তুলছে।

এদিকে যুদ্ধ চলাকালে উপসাগরীয় আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা করা যুক্তরাজ্যও ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। জেদ্দায় সফরকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, ‘গত ৪০ বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য আরব দেশের জন্য এক নম্বর গণশত্রুতে পরিণত হয়েছে ইরান। এ ধরনের কোনো শত্রু থাকলে আপনাকে সপ্তাহের প্রতিটি দিন ২৪ ঘণ্টা করেই সতর্ক থাকতে হবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙছে না, তবে আস্থা কিছুটা কমেছে। অনেক উপসাগরীয় নেতার কাছে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘ব্যয়বহুল কিন্তু অনিশ্চিত’ নিরাপত্তা অংশীদারে পরিণত হয়েছে, যেখানে তাদের বড় মূল্য দিতে হলেও পালটা হামলার ঝুঁকি থেকে মুক্তি মেলে না।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জও উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এসেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গালফ প্রজেক্ট ডিরেক্টর ইয়াসমিন ফারুকের মতে, সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হতে পারে। লোহিত সাগর তীরবর্তী পাইপলাইন ও বন্দর, বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকা এবং তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামোর কারণে রিয়াদ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে পুনর্গঠনের ব্যয় দেশটির ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনীতি বহুমুখীকরণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করতে পারে।

ফলে ভবিষ্যতে তারা ইউরোপসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে একাধিক নিরাপত্তা স্তর গড়ে তোলার মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করতে পারে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, বন্দর সুরক্ষা, লবণাক্ত পানি শোধনাগার ও বিকল্প রপ্তানি পথ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো উপসাগরে একমাত্র বড় সামরিক কাঠামো বজায় রাখা শক্তি। তবে তাদের ঘাঁটিগুলো এখন অনেকের কাছে সুরক্ষা নয়, বরং সম্ভাব্য সংঘাতের ‘ট্রিগার পয়েন্ট’ হিসেবেই বেশি দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে— একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর সম্ভব নয়; বরং বহুমাত্রিক জোট, কৌশলগত ভারসাম্য এবং আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দিকেই এগোতে হবে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল তেলের দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৭৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুড তেলের দামও ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।

৬ ঘণ্টা আগে

৬ সপ্তাহ আটকে আছেন পারস্য উপসাগরে, মানসিক শক্তির শেষ সীমায় নাবিকরা

আটকে থাকা জাহাজগুলোর নাবিকদের মানসিক অবস্থার অবনতি নতুন করে দাবি তুলেছে— জাহাজ মালিকদের উচিত তাদের বদলে নতুন ক্রু পাঠানো। আন্তর্জাতিক নৌবিধি অনুযায়ী, বিপজ্জনক এলাকায় নাবিকদের জোর করে কাজ করানো যায় না। তবে এমন অনেকেই আছেন, যারা বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিতে পারেন।

৭ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠক স্থগিত করল ইরান

আব্বাস আসলানি জানান, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকা অবস্থায় কোনো ধরনের সংলাপে বসতে রাজি নয় ইরান। তিনি বলেন, "ইরানি প্রতিনিধি দল এখনো তেহরান থেকে রওনা দেয়নি। তাদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যতক্ষণ লেবাননে হামলা চলবে, ততক্ষণ ইসলামাবাদে কোনো আলোচনা হবে না।"

৭ ঘণ্টা আগে

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা— কারা থাকছেন, কী এজেন্ডা, বাধা কোথায়

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের ঠিক ছয় সপ্তাহ পর এই আলোচনা হতে যাচ্ছে। এ আলোচনা থেকে সারা বিশ্বের মানুষের প্রত্যাশা— দুই সপ্তাহের জন্য যে যুদ্ধবিরতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে, সেটি যুদ্ধে বন্ধের স্থায়ী রূপ পাবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলবে তেলবাহী জাহাজ; ছয় সপ্তাহ ধরে বৈশ্বিক যে জ্বালানি সংকট

৯ ঘণ্টা আগে